গনগনে পুরুষের মতো দুপুর, নির্জন বাড়ি, আর অন্যরকম এক দামাল হাওয়া। আজ তার খুব ‘সে’র কথা মনে হচ্ছে। এই ফাঁকা বাড়িতে পান্না এখন একা, এ সময়ে যদি সে এসে সামনে দাঁড়ায়। মাগো, ভাবতেই গা সিরসির করে, রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায়। কেমন হবে সে? আজও স্পষ্ট কোনও চেহারা মনে পড়ল না পান্নার। না বাবা, কার্তিক ঠাকুরটার মতো সুন্দর চেহারা চাই না। তবে পুরুষমানুষের মতো। একটু অগোছালো, একটু আনমনা, ভুলো মন, একটু পাগলাটে হোক না তাতেও ক্ষতি নেই। খুব সুন্দর ঝকঝকে মসৃণ দাঁত আর হাসিটা হবে খুব সুন্দর। হাসলে যেন মাড়ি না বেরিয়ে পড়ে বাবা। পান্নাকে খুব ভালবাসবে, কিন্তু বউ-মুখো যেন না হয়।
বউ-মুখো একদম দেখতে পারে না পান্না। শেফালী বউদি তো বরকে নিয়ে ওইজন্যই ভাজা-ভাজা হল। বরুণদা যা মাগী-মার্কা পুরুষ, বউয়ের মাথা টিপে দেয়, কুটনো কুটে দেয়। গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঘোরে। শেফালী বউদি মাঝে মাঝে ধৈর্য হারিয়ে বলেই ফেলে, ও বাবা, এ যেন একটা মেয়েমানুষকেই বিয়ে করেছি রে!
পান্না বলে, তা কেন বউদি, বরুণদা তোমাকে কত ভালবাসে, মাথা টিপে দেয় জ্বর হলে।
দেয় কেন? মাথা টিপে না দিলে কি মরে যাব?
অত ভালবাসা তোমার বুঝি সয় না?
তোরও সইবে না। পুরুষমানুষ যদি সবসময়ে গায়ে গায়ে লেগে থাকে মেনি বেড়ালের মতো, যদি সংসারের সব ব্যাপারে নাক গলায় তা হলে কি ভাল লাগে বল? ঘেন্নায় মরে যাই ভাই, কী সুন্দর রিপু করতে পারে, উল বুনতে পারে, কুরুশকাঠিতেও দিব্যি হাত।
বলে হেসে গড়িয়ে পড়ে শেফালী বউদি।
আর মনে মনে পান্না বলে, হে ঠাকুর, আমার পুরুষমানুষটা যেন কিছুতেই বরুণদার মতো না হয়।
নয়না শিবেনদার সঙ্গে ছুঁকছুঁক করছে, পায়েল তার মাস্টারমশাই জিতু সমাদ্দারের সঙ্গে লাইন দিচ্ছে, শুধু পান্নারই গাল উঠল না। এ নয়, ও নয়, সে নয়। তার ‘সে’ এদের কারও মতো নয়। অন্যরকম। এই অন্যরকমটা রোজ রোজ বদলে যায়।
হীরা বলে, অত খুঁতখুঁত হলে তোর কেউ জুটবে না শেষ অবধি, দেখিস। তোর জন্য কি বর কলে তৈরি হবে? মেড টু অর্ডার?
তাও বটে।
কিন্তু এই নির্জন দুপুরে সেই আবছা পুরুষের কথা খুব মনে আসে পান্নার। তার বান্ধবীরা খুব সেক্স নিয়ে কথা বলে। পান্নার ও ব্যাপারটা ভাবতে ভাল লাগে না। শরীরের গ্যাদগ্যাদে ব্যাপারটা তো আছেই বাবা। কিন্তু ওটাই সব নয়। সে চায় ভাবের পুরুষ, শরীরের পুরুষ নয়।
ইলাবতী আর সোমেশ্বর প্রেমে পড়েছিল। ইলাবতীর পনেরো, সোমেশ্বরের কুড়ি। জানাজানি হওয়ার পর ইলাবতীকে তার মা বাবা খুব মেরেধরে বেঁধে রাখল ঘরে আর সোমেশ্বর রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরতে লাগল। তারপর একদিন ফাঁক পেয়ে দুজনেই পালাল। শ্মশানের ধারে দুজনকে পাওয়া গেল পরদিন। জড়াজড়ি করে মরে পড়ে আছে।
কী যে কেঁদেছিল পান্না। হ্যাঁ, ভালবাসা হবে ওইরকম। কেমন মরে গেল দুজনে। আর তারপর দুজনেই তুচ্ছ শরীর ছেড়ে ফেলে হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াত মনের আনন্দে। কত লোক তাদের দেখেছে। নদীর ধারে বা হাট মুকুন্দপুরের জঙ্গলে, নিশুত রাতে অলকেশ স্মৃতি সংঘের ফুটবল খেলার মাঠে। পান্না দেখেনি, কিন্তু পান্না তাদের ফিসফাস মধ্যরাতে কতদিন শুনেছে। স্বর নেই, শুধু শ্বাসের শব্দে কথা। গায়ে কাঁটা দেয়।
হ্যালো! এনিবডি হিয়ার।
ঝিমঝিম দুপুরে তন্দ্রাচ্ছন্ন তন্তুজাল ছিঁড়ে সপাটে উঠে বসল পান্না। বুকটা ধক ধক করছে। মেয়ে গলায় ইংরিজি বলছে কে? এরকম তো হওয়ার কথা নয়! কণ্ঠা পর্যন্ত আতঙ্ক উঠে এল তার।
উঠোনের জানালাটা দিয়ে উঁকি দিতেই সে সোহাগকে দেখতে পেল। অমল রায়ের মেয়ে। খুব দেমাক, ইংরিজি ছাড়া কথাই বলে না। সন্ধ্যাদি আরও বলেছে, কলকাতায় নাকি কেলেঙ্কারি করে এসেছে। সন্ধ্যাদি পান্নাকে খুব ধরেছিল, যা না, গিয়ে ওদের ইংরিজিতে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়ে আয়। বুঝবে আমরাও মুখ্যু নই। পান্না রাজি হয়নি। সে ইংরিজি বলবে কি, ভয়েই মরে যাবে। কথাই ফুটবে না।
অবাক হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল পান্না, কিছু বলছ?
মেয়েটার তেমন সাজগোজ নেই, পরনে একটা লম্বা ঝুলের ফ্ৰকমতো ম্যাদাটে পোশাক, চুল উড়োখুড়ো। তার দিকে চেয়ে বলল, সরি, আমি ভুল করে তোমাদের কোর্ট ইয়ার্ডে ঢুকে পড়েছি বোধহয়। এখানে কোনটা রাস্তা আর কোনটা নয় তা বোঝা মুশকিল। এখান দিয়ে কি রাস্তায় যাওয়া যাবে?
যাবে। তুমি কোথায় যাচ্ছ?
মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, এনি হোয়ার। নাথিং ম্যাটারস।
তুমি তো সোহাগ। অমল রায়ের মেয়ে।
হ্যাঁ। আর তুমি?
আমি পান্না চট্টোপাধ্যায়। আমাদের বাড়িতে একটু বসবে?
মেয়েটা ঠোঁট উলটে বলল, বসতে পারি, ইফ ইউ আর নট ডিস্টার্বড।
পান্না মাথা নেড়ে বলল, না না, ডিস্টার্বড হব কেন? এসো। মে
য়েটা বারান্দায় উঠে এসে পেতে রাখা কাঠের চেয়ারে বসল।
খুব সাহস হয়ে যাচ্ছে পান্নার। এই ইংরিজি বলা বিলেত ফেরত মেয়েটার সঙ্গে টক্কর দেওয়া তার কর্ম নয়। তবু কী জানি সুন্দর মেয়েটার এমন মলিন চেহারা দেখে তার মায়া হচ্ছিল।
কোথায় যাচ্ছিলে ভাই?
কোথাও না। বাড়ির বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করছিল।
এক গেলাস জল দেব? খাবে?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, জল খাব কেন? আমার তেষ্টা পায়নি তো!
