আপনাদের এই জায়গাটা বেশ।
তোমার ভাল লাগে আমাদের গ্রাম?
শুনেছি এটা আমারও গ্রাম। আমাদের রুটস এইখানে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। শুধু আমাদের নয়, এটা তোমাদেরও গ্রাম।
সেটা আমি আগে ফিল করতাম না।
এখন কর?
একটু একটু।
পারুল মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
আচ্ছা পারুল, আমি যদি আপনার কাছে থাকি?
অবাক পারুল চোখ বড় বড় করে বলল, আমার কাছে? ও মা? কেন বল তো!
আমার মায়ের সঙ্গে তো আপনার ভাব আছে!
পারুল এই ছেলেমানুষি প্রস্তাবে হেসে ফেলে বলে, তা একটু আছে। দু দিনের তো আলাপ।
আপনি মাকে বলুন না, সোহাগ আমার কাছে কয়েকদিন থাক।
যাঃ। তোমার মা সে কথা শুনবেন কেন?
আপনি বললে হয়তো শুনবে।
কেন, আমার কথা উনি কেন শুনবেন?
আমি জানি মা আপনাকে অন্য চোখে দেখে।
কী চোখে বল তো!
শি ওলসো অ্যাডোরস ইউ।
ওসব তোমার ভুল ধারণা। আমার মধ্যে কিছু নেই সোহাগ। আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে।
বলুন না একবার মাকে।
সেটা খুব খারাপ দেখাবে সোহাগ। তা কি হয়? আর আমার কাছেই কেন থাকবে তুমি?
আমি জানি আপনি আমাকে একটুও পছন্দ করেন না। কিন্তু আপনাকে যে আমার কী ভাল লাগে!
শুধু চেহারাটা ছাড়া আমার কী আছে বল তো!
ইউ আর এ গডেস। আমার মনে হয়, আপনি হঠাৎ একদিন আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে যেতে ঝুপ করে এখানে নেমে পড়েছেন।
পারুল প্রমাদ গুণে বলল, সাধে কি তোমাকে লোকে পাগল বলে? আমার কি পাখা আছে যে উড়ব! মাথা ঠান্ডা করো, মা-বাবার সঙ্গে কলকাতায় যাও।
ইজ ইট এ সারমন?
না সোহাগ, আমার সম্পর্কে ওটা তোমার ভুল ধারণা। ধারণাটা এবার পালটে ফেল।
আমার আপনাকে আরও কাছে থেকে দেখতে ইচ্ছে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনার দিকে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।
যাঃ।
ইফ ইউ আর নট এ গডেস, আই শ্যাল ক্রিয়েট ওয়ান ইন ইউ।
তাই কি হয়? কাছ থেকে দেখলে তোমার ধারণা দু দিনেই ভেঙে যাবে।
মানুষ তো চিরকাল এভাবেই তার ভাগবানকে তৈরি করে নিয়েছে তাই না?
তাই বুঝি?
আমার তো তাই মনে হয়। আজ ভোরবেলা আমি কোথায় যাচ্ছিলাম জানেন?
কোথায়?
পালিয়ে যাচ্ছিলাম।
সে কী?
আপনাকে হঠাৎ দেখে দাঁড়িয়ে না পড়লে এখন আমি কোথায় যে চলে যেতাম তার ঠিক নেই।
কেন সোহাগ, পালিয়ে যাচ্ছিলে কেন?
আমি মা-বাবার সঙ্গে কলকাতায় যেতে চাই না যে!
পারুল ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল। তারপর হঠাৎ ভোরের মতো একটু হেসে বলল, তুমি আমাকে গডেস বলে মনে কর তো?
করিই তো।
গডেসের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয় জান?
জানি না।
গডেস যা বলে তা শুনতে হয়।
সোহাগ একটু হেসে বলল, আমি জানি আপনি আমাকে কলকাতায় যেতে বলবেন, তাই না?
শুনবে না তো!
শুনব।
শুনবে?
হ্যাঁ।
তাহলে চলো আমরা রাস্তায় গিয়ে একটু হাঁটি। তারপর আলো ভাল করে ফুটলে তোমাকে আমি নিজে গিয়ে তোমাদের বাড়িতে রেখে আসব।
সোহাগ খুব সরলভাবে হেসে বলল, ইন এক্সচেঞ্জ অফ হোয়াট?
পাকা মেয়ে, গডেসের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাও বুঝি?
তাহলে বলুন, আমাকে আর অপছন্দ করবেন না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পারুল বলে, তোমাকে আমার অপছন্দ হচ্ছে না তো! শুধু একটা জিনিস একটু অপছন্দ।
কী সেটা?
আমাকে তুমি নাম ধরে পারুল বলে ডাক কেন?
তাহলে কী বলে ডাকব?
পিসি মাসি যাই হোক।
এঃমা, তাহলে যে আমার গডেস পিসি মাসিই হয়ে যাবে। গডেস আর গডেস থাকবে না।
পারুল হেসে ফেলল। তারপর বলল, আচ্ছা থাক বাবা। পারুল বলেই ডেকো। আমার বোধহয় আর খারাপ লাগবে না।
.
৩২.
টাইম শ্যাফটের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন বৈজ্ঞানিক। কুঞ্চিত, দুশ্চিন্তার বলিরেখা কপালে, পিছনে জড়ো করা দুটি হাত বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে এবং খুলে যাচ্ছে। কাঁচতন্তুর সুড়ঙ্গপথটির দিকে চেয়ে আছেন তিনি। চোখে অনিশ্চয়তা, ভয়, সম্ভাব্য ব্যর্থতার গ্লানি। গত কয়েক বছর চুল কাটেননি, দাড়ি কাটেননি। তাঁর চেহারা হয়েছে পাগলের মতো। নিয়মিত আহার করেননি বলে শরীর রুণ ও দুর্বল। তার গবেষণা শেষ হয়েছে, শুধু ফলাফলের অপেক্ষা। দিনের পর দিন তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন। সময়ের সরণি বেয়ে আজ অবধি কেউ আসেনি অতীত বা ভবিষ্যৎ থেকে। হয়তো আর আসবেও না। হয়তো টাইম-ট্র্যাভেল বাস্তবিকই অলীক কল্পনা। সময়কে কি অতিক্রম করা যায়?
বৈজ্ঞানিক অবশ্য মনে করেন সময় এক অবাস্তব ধারণা। সময় বলেই কিছু নেই। আছে গতি, আছে অবস্থানগত পরিবর্তন, আর মানুষ তাই থেকেই সময়কে কল্পনা করে নিয়েছে। যেখানে পরিবর্তন নেই, গতি নেই বা বস্তু নেই, বস্তুর জন্ম ও বিনাশ নেই সেখানে সময়ের ধারণাও অসম্ভব। গতি এবং পরিবর্তনই সময় নামক তৃতীয় ধারণার জন্ম দিয়েছে। একটি শিশু জন্মাল, বড় হল, বুড়ো হল, মরে গেল, এ সবই হল সেই শিশুটির গতি ও পরিবর্তন মাত্র। শরীরের হ্রাস, বৃদ্ধি, ক্ষয়। বৈজ্ঞানিকের দৃঢ় বিশ্বাস অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আসলে একই সঙ্গে বিরাজমান। চলন্ত ট্রেন থেকে যেমন বাইরের দৃশ্য প্রতীয়মান হয় তেমনই। বাইরের দৃশ্যগুলি ফলিত হয়েই আছে, চলন্ত ট্রেন থেকে শুধু পর্যায়ক্রমে তাদের দেখা যায়। সুতরাং ভবিষ্যৎও বর্তমান, অতীতও বর্তমান শুধু একটু টিউনিং-এর প্রয়োজন। তা হলেই ভবিষ্যৎও বর্তমানের মতোই প্রতীয়মান হবে। অতীতও তাই।
কিন্তু সময়-সুড়ঙ্গে এখনও কেউ আবির্ভূত হল না। অতীত বা ভবিষ্যতের কোনও কল্পনা না, কোনও সাড়া না।
