খুব দুষ্টু হবি নাকি তুই? দামাল, দস্যি, পাজি? দুষ্টু দুষ্টু চোখে তাকাবি, মিষ্টি মিষ্টি হাসবি আর দৌড়ে বেড়াবি বাড়িময়? আর আমি তোকে ধরতে ছুটে ছুটে হয়রান হব?
হোক, তার তিন নম্বরটা একটু দুষ্ট হোক, দামাল হোক, ডাকাবুকো থোক। বড় দুজন শান্ত, সভ্য, সুন্দর। তাদের নিয়ে কোনও ঝামেলা পোয়াতে হয়নি তাকে। তিন নম্বরটা হোক অন্যরকম।
মধ্যরাতে নিজের নির্ভজ পেটে হাত রেখে মৃদু মৃদু হাসছিল পারুল। এখনও অনেক দেরি। অত দেরি যেন সইছে না পারুলের।
কী সুন্দর যে ভোর হল আজ! আকাশে একটা অন্যরকম ময়ূরকণ্ঠী আলো পেখম মেলে দিল। কুয়াশা মাখানো সেই আলো-আঁধারিতে পারুল খুব ধীর পায়ে বাগানে পায়চারি করছিল। ভাল ঘুম হয়নি রাতে। শরীর দুর্বল, মাথায় ঝিমঝিম। কিন্তু মনটা বড্ড ভাল লাগছে তার।
একা নই, আর আমি একা নই। এখন নয় মাস তুই আর আমি সবসময়ে একসঙ্গে। সবসময়।
পারুল!
পারুল একটু চমকে উঠল।
কে?
ফটকের পাশেই শিউলি গাছ। তার আড়াল থেকে আবছা আলোয় মেয়েটা এগিয়ে এল।
আমি সোহাগ।
হঠাৎ এই সুন্দর ভোরবেলার ময়ূরকণ্ঠী অপরূপ আবছায়া যেন ছাইবর্ণ হয়ে গেল পারুলের কাছে। বিস্বাদে ভরে গেল মন। শরীরে যেন অশুচিতার স্পর্শ। যেন গু মাড়িয়েছে এমনভাবে থমকে গেল পারুল।
কণ্ঠস্বর আপনা থেকেই কঠিন হয়ে গেল, তুমি! কী চাও বলো তো!
সোহাগ ভারী অবাক হয়ে বলে, কিছু চাই না তো!
মুখ ফিরিয়ে নিল পারুল, বিরাগে। বলল, ও, এত সকালে?
মাঝে মাঝে আমি খুব ভোরে উঠে পড়ি, তখন ঘরে থাকতে একটুও ভাল লাগে না। বেরিয়ে পড়ি।
সোহাগকে যে কেন এত অপছন্দ করে? একটাই কারণ। এ মেয়েটা জানে, আজ থেকে কুড়ি বছর আগে ওর বাবার সঙ্গে তার দেহগত সম্পর্ক হয়েছিল। হতে পারে সেটা জবরদস্তি, হতে পারে অবলার ওপর প্রবলের অত্যাচার, তবু হয়েছিল। আর সে কথা মনে পড়লেই সমস্ত শরীরে যেন এক অপবিত্রতার স্পর্শদোষ ঘটে যায়। যতই সোহাগ তাকে গডেস বলুক, ওকে দেখলেই তার ভিতরটা কুঁকড়ে যেতে চায়। মেয়েটা জানে, সব জানে বলেই পারুলের বড় ছোট মনে হয় নিজেকে।
অথচ সে জানে, সোহাগ ভাল মেয়ে। বলাকা ওর প্রশংসা করে, পান্না করে। মেয়েটা একটু পাগলাটে হলেও ব্যক্তিত্ব আছে, খারাপ নয়। তবু ওর একটাই অপরাধ, ও জানে। ও পারুলের গোপন পাপস্পর্শের কথা জানে।
ময়ূরকণ্ঠী থেকে ছাইরঙা হয়ে যাওয়া এই ভোরে আচমকা পারুলের বড় ভয় হল। কুড়ি বছর আগের শরীরী অপবিত্রতা কি তার আতু বা শুভকেও স্পর্শ করবে? স্পর্শ করবে তার পেটে সদ্য অঙ্কুরিত দুষ্টুটাকে?
আমি যদি এখন একটু একা থাকতে চাই, তাহলে কি তুমি কিছু মনে করবে?
গালে থাপ্পড় মারার মতোই অপমান। কিন্তু সোহাগ মৃদু হেসে বলল, না না, কিছু মনে করব না। আই অ্যাম লিভিং।
ফটকের দিকে যখন পা বাড়িয়েছে মেয়েটা তখন হঠাৎ পারুলের একটু মায়া হল। মেয়েটার মুখ এই ভোরের আবছা আলোতেও বড় করুণ দেখাচ্ছিল।
সোহাগ।
বলুন।
আসলে কী জানো, কাল রাত থেকে আমার শরীরটা ভাল নেই। তাই কিছু ভাল লাগছে না। কিছু মনে করনি তো!
মেয়েটা একটুও রাগ প্রকাশ করল না। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে খুব নরম গলায় বলল, কী হয়েছে আপনার?
তেমন কিছু নয়। হয়তো বদহজম।
বদহজম মানে স্টমাক আপসেট?
অনেকটা তাই।
কিন্তু আপনাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।
তাই?
নট সিকলি।
কিছু বলবে আমাকে?
না তো! আমি এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আপনাকে দেখে এত ভাল লাগল।
আমাকে দেখে কেন যে তোমার এত ভাল লাগে, বুঝি না বাবা।
আমি তো তা জানি না। আপনাকে দেখেই আমার মন ভাল হয়ে গেল। ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটুক্ষণ থাকি। কিন্তু আপনি তো আমাকে পছন্দ করেন না।
লজ্জা পেয়ে পারুল হেসে ফেলে, কে বলল পছন্দ করি না?
আমি জানি।
তুমি ভুল জান। তোমাকে অপছন্দ করব কেন? তুমি তো একটা ভাল মেয়ে।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, সবাই কেবল ভাল আর খারাপ নিয়ে কথা বলে। ভাল না খারাপ তা যে কী করে বোঝা যায় সেটাই আমি বুঝতে পারি না। আমাকে আমার মা বলে খারাপ, বাবা বলে খারাপ। আমি খুব ভাবি আমি কেন খারাপ। কিন্তু কিছু বুঝতে পারি না।
তুমি খারাপ নও তো।
তাহলে আমাকে অপছন্দ করেন কেন? অথচ আমি আপনাকে কী ভীষণ অ্যাডোর করি! ভাবি আমি পারুলের মেয়ে হয়ে কেন যে জন্মাইনি!
কথাটা সে আগেও শুনেছে। শুনে আহ্লাদিত হয়নি একটুও। কিন্তু এখন একটু মায়া হল। বলল, এসো, দুজনে পায়চারি করি একটু।
আপনার খারাপ লাগবে না তো! একা থাকতে চাইছিলেন।
না, খারাপ লাগবে না।
আজ আমার মন ভাল নেই।
কেন বল তো! আজই মা বাবা কলকাতায় ফিরে যাবে। আমাকেও যাওয়ার জন্য ইনসিস্ট করছে।
তুমি কলকাতায় যেতে চাও না?
না। ওমা! কেন? এই গাঁ-গঞ্জে ভাল লাগে বুঝি তোমার? ওঃ, তোমার তো বোধহয় একটা পলিউশন অ্যালার্জি আছে, তাই না?
হ্যাঁ আছে। এমনিতেও শহর আমার ভাল লাগে না।
কিন্তু পড়াশুনো?
সেটাই প্রবলেম। কলকাতায় ফিরে গিয়েই আমাকে ক্লাসে যেতে হবে, মিউজিক লেসন নিতে হবে, কম্পিউটার, ব্যায়াম এসব নিয়ে এনগেজড থাকতে হবে। কোয়াইট সাফোকেটিং। আমি কি একটু বেশি কথা বলছি?
না তো!
আপনি একা থাকতে চাইছিলেন। এসব কথায় হয়তো আপনি বিরক্ত হচ্ছেন।
না। বিরক্ত হচ্ছি না।
দুজনে নীরবে পাশাপাশি ধীর পায়ে খানিকক্ষণ হাঁটল।
