আর ডাকল না বটে, কিন্তু সারাদিন নানা কাজকর্ম ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে ওই স্মৃতি এসে বারবার হানা দেয়। আর কোমল এক আলোয় ভরে যায় পারুলের অভ্যন্তর। নরম হয়ে আসে মন, শরীর। কেউ কি তার শরীরে ভর করে কোল জুড়ে আসতে চায়? কোনও নিরাশ্রয় অনিকেত আত্মা?
ওই চিন্তা ভূতের মতো পেয়ে বসল তাকে। বারবার নিজের বয়সের হিসেব করল। শরীরের কথা ভাবল। রিস্ক ফ্যাকটরের কথা ভাবল। তার দুটি ছেলেমেয়েই নরমাল ডেলিভারি। শরীরে কাঁটাছেঁড়া হয়নি কখনও। গড়ানে বয়সে যদি একটু কাটাকুটি হয় তো হোক না।
দ্বিধা ছিল, বাধা ছিল, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ছিল। তবু সব যেন ভেসে যেতে লাগল। একটা অচেনা কচি গলার একটা মাত্র ডাক তাকে উন্মনা করে দিল বড়। পাগল করল। বেহিসেবি করে দিল।
ওই ডাকটার কথা সে কাউকেই বলেনি। শুনলে সবাই হাসবে। জ্যোতিপ্রকাশ গম্ভীর কাজের মানুষ, সব ব্যাপারটাকেই খুব সিরিয়াসলি নেয়, কিছুই উড়িয়ে দেয় না। তবু তাকেও বলল না পারুল। তার মনে হয়েছিল, তার ভাবী সন্তান শুধু তাকেই ডেকেছে, আর কাউকে তো নয়। ওই গোপন তীব্র আকাঙ্ক্ষার ডাকটিকে সে পাঁচ কানে ছড়াবে কেন?
তবু বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পর অবশেষে সে তার স্বামীকে বলল। লজ্জা, দ্বিধা তো ছিলই, ভয়ও কি ছিল না একটু? এই বয়সে সন্তান হতে গিয়ে সে যদি মরেটরে যায় তাহলে তার বাচ্চা দুটোর কী হবে? জ্যোতিপ্রকাশও কি ভেঙে পড়বে না!
কিন্তু যে আসতে চায় তার পথ অবারিত না করেও যে পারুলের উপায় ছিল না! কী করবে পারুল তাকে না এনে? পাপ হবে না? অপরাধ হবে না?
.
আজকাল বলাকার রাতে ভাল ঘুম হয় না। শরীরে ঘুমের প্রয়োজনটাই তৈরি হয় না বোধহয়। একটু আধটু চটকামতো আসে, বিনা কারণেই ভেঙে যায়। তখন কেবল এপাশ ওপাশ। ঘুম ছিল কম বয়সে। কী ঘুম বাবা! বিছানা যেন চুম্বকের মতো টানত। বিছানা না হলেও চলত তখন। বিয়ের পর সেই বালিকা বয়সে স্বামীর গায়ে পা তুলে কি কম দিয়েছে ঘুমের ঘোরে? সকালে উঠে অবশ্য প্রণাম করত রোজ।
আজ রাতে পাতলা ঘুমের মধ্যে দরদালানে বমি করার শব্দ পেয়ে চটকাটা ভাঙল বলাকার। দিন দুই হল লক্ষণটা শুরু হয়েছে। এ বয়সে কেন যে আবার ছেলেপুলে হচ্ছে তা বুঝতে পারে না বলাকা। এ যুগের রেওয়াজ তো এটা নয়। আজকাল তো একটা করেই হয় বেশির ভাগ।
বলাকা উঠে মশারি তুলে বাইরে এল। রাতে প্রায় কিছুই খায়নি মেয়েটা। এক পিস মাছ আর একখানা রুটি। একটু দুধ সাধাসাধি করেছিল বলাকা, খায়নি। ওই সামান্য খাবারটাও পেটে থাকল না। তাহলে প্রসবের ধাক্কা সামলাবে কী করে? রক্ত হবে না শরীরে। আগের দুবারও একই অবস্থা হয়েছিল। বলাকা ভেবে মরে। তবু যা হোক, বয়স কম ছিল তখন, কিন্তু এখন তো তা নয়।
দরদালানে পা দিয়ে বলাকা দেখল, বেসিনের কাছে তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে পারুল।
কী রে? আরও হবে?
না মা। ঠিক আছে।
চোখে মুখে একটু জল দে। দিয়েছি।
পেট তো খালি হয়ে গেল, রাত কাটবে কী করে তোর? একটু দুধ গরম করে দিই, খা।
না মা, গা গুলোচ্ছে এখনও।
কী যে করি তোকে নিয়ে! আয়, আমার খাটে এসে শুয়ে থাক।
মা, তোমার যেটুকু ঘুম হয় আমি শুলে সেটুকুও হবে না। তুমি শুয়ে পড় গে, আমি এখন ঠিক আছি।
তোর ঠিক আমার ধাত! চারটে ছেলেমেয়ের প্রত্যেকটা হতে গিয়ে আমি অর্ধেক হয়ে গেছি। মনে আছে গাদাল পাতা খুব ভাল লাগত। তোকেও কাল গাদালের ঝোল করে দেবোখন।
মৃদু লাজুক হাসি হেসে ঘাড় নাড়ল পারুল, দিও।
আজকাল একটু লজ্জা হয়েছে পারুলের। তার যে আবার ছেলেপুলে হবে এটা বোধহয় কারও কাছেই প্রত্যাশিত ছিল না। সব চেয়ে বড় লজ্জা ছেলেমেয়ের কাছে। আতু অর্থাৎ তার মেয়ে কালও জিজ্ঞেস করেছিল, মা, তোমার কী হয়েছে?
পারুল বলেছিল, অম্বল।
কিন্তু রোজ তো আর অম্বল বললে হবে না। তবু যা হোক মেয়ের কাছে ব্যাপারটা কবুল করা যাবে। কিন্তু শুভ? তার কাছে যে ভারী লজ্জায় পড়তে হবে পারুলকে। বড্ড অবাক হবে যে ছেলেটা! ভারী অস্বস্তি তাই পারুলের।
পারুল আর জ্যোতিপ্রকাশ কারওরই তেমন অবসর নেই বলে আতু আর শুভ বড় হয়েছে আয়া আর ঝি-এর হেফাজতে। ভালই থাকত তারা, কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু অন্য সমস্যা না হলেও মা বাবার সঙ্গে খুব সামান্য একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে তাদের–এটা খুব টের পায় পারুল। সে বা জ্যোতিপ্রকাশ কখনও হামলে দামলে ওদের আদর করেনি, বুকে নিয়ে শোয়ওনি বড় একটা। নজর রেখেছে, রক্ষণাবেক্ষণ করেছে, কিন্তু সময় দিতে পারেনি। সময়ের ওই টানাটানিই তাদের একটু তফাতে রেখেছে আজও। এই ফাঁকটুকু অতিক্রম করা আজ বড় কঠিন।
তিন নম্বরের বেলায় সেটা পুষিয়ে নেবে পারুল। কক্ষনো ঝি বা আয়ার হাতে ছেড়ে দেবে না। বুকে বেঁধে নিজের হাতে সেটাকে নাওয়াবে খাওয়াবে ছোঁচাবে। এর সঙ্গে দূরত্ব থাকবে না তার।
বলাকা বলে, এখন রাত দুটো। সারা রাত খালি পেটে কাটাবি কী করে? খালি পেটে আবার বায়ু অম্বল হবে।
কিছু খেতে পারব না মা। মুখে রুচি নেই।
শুকনো আমলকী খাবি? সন্ধ্যা বেশ বানায়। নানারকম নুন-টুন দিয়ে। খুব সোয়াদ। এক প্যাকেট দিয়ে গিয়েছিল। আয়, দুটো মুখে দিয়ে দেখ দেখি।
সন্ধ্যার আমলকী মুখে দিয়ে পারুল নিজের ঘরে এল। পাশের ঘরে আতু আর শুভ ঘুমে ঢলাঢল। একা কিছুক্ষণ বসে থাকে পারুল। শরীরটা ঝিমঝিম করছে বটে, কিন্তু তার ভিতরটা আলোয় ভরে আছে। সে যেন মৃদু গোলাপি একটা আলো। মায়ায়, ভালবাসায় ভরে আছে মন। খুব মৃদু একটা আঙুলে কে যেন তার শরীরে সেতারের ঝংকার তুলছে।
