কী জানি। আমার মনের মধ্যে সময় বলে কিছু যেন কাজ করে না। পুরনো কথা ভাবতে গেলে সব যেন সাঁই সাঁই করে কাছে চলে আসে। যেন মনে হয় এই তো সেদিনের কথা!
ও তো স্মৃতি মা।
জানি বাবা, জানি। কিন্তু সময় জিনিসটা তো মানুষের কল্পনা।
পারুল একটু ভেবে বলে, তা ঠিক। কল্পনা মানে তো মিথ্যে নয়।
মিথ্যেই।
কেন বলছ?
মনে হয় বলে বলছি।
সূর্য উঠছে, সূর্য ডুবছে, দিন যাচ্ছে, মাস যাচ্ছে, বছর ঘুরছে, আমরা বুড়ো হচ্ছি, এটাই তো সময়।
এমন কিছু নেই যেখানে সব থেমে আছে, বাড়ছে না, বুড়ো হচ্ছে না, ওই ছবিগুলোর মতো!
পারুল হেসে ফেলে, ছবির তো প্রাণ নেই মা।
কথার মাঝখানে কখন নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে মেঝেতে বলাকার কাছ ঘেঁষে বসেছিল দুখুরি। চাপা গলায় বলল, ওই আবার এসেছে গো!
কে আবার এলি।
কে আবার! বাবা। আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল।
তা গেলি না একটু বাবার কাছে?
ইস। গায়ে যা ঘেমো গন্ধ, তার ওপর খইনির ঝাঁঝ। মুখ ভেঙিয়ে পালিয়ে এসেছি।
ছিঃ, বাবাকে মুখ ভেঙাতে হয়?
৩১-৩৫. সন্তানের আগমনবার্তা
৩১.
কথা ছিল না। তবু হয়ে গেল। পারুলের শরীর জুড়ে তৃতীয় সন্তানের আগমনবার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। শরীরের মধ্যে আর একটা শরীর ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। গর্ভের অঙ্কুর। পারুলের শরীরে নানা অসোয়াস্তির সঞ্চার ঘটছে। মধ্যরাতে উঠে বেসিনে বমি করার পর হাফ ধরা গলায় সে তার পেটে হাত রেখে মায়াভরে বলে, দুষ্টু ছেলে, মাকে বুঝি এরকম কষ্ট দিতে হয়?
ছেলে! মেয়েদের অন্ধ সংস্কারবশে সেও ছেলেই চায় নাকি? না বাবা, না। মেয়ে হোক, পারুলের একটুও আপত্তি নেই। পেটে হাত রেখে সে ফিস ফিস করে বলে, মেয়ে নাকি তুই! লক্ষ্মী হয়ে থাক।
এখনও আকার নেয়নি, চোখ মুখ কিছু তৈরি হয়নি, গর্ভের অন্ধকারে একটি রক্তাক্ত পিণ্ড মাত্র, তবু কত মায়ায় যে ভরে ওঠে বুক!
কথা ছিল না, তবু হল। কিন্তু তৃতীয় সন্তান মোটেই অ্যাকসিডেন্ট নয়। বললে লোকের অদ্ভুত লাগবে, এই সন্তান চেয়েছিল পারুল নিজেই। চল্লিশের কাছাকাছি বিপজ্জনক এই বয়সে কেউ কি মা হতে চায়? ডাক্তারও ভ্রূ কুঁচকেছিল। কিন্তু পারুল চেয়েছিল ঠিকই। চিন্তিত জ্যোতিপ্রকাশ বলেছিল, পারুল, ব্যাপারটা সেফ হবে কি? এক ছেলে এক মেয়ে তো আছেই আমাদের, আর কী দরকার?
দরকার কথাটার নানারকম ব্যাখ্যা হতে পারে। হিসেবি মানুষের দরকার একরকম, বেহিসেবির অন্যরকম। পারুল হেসে বলেছিল, সেই পুতুলখেলার বয়স থেকে আমার শখ ঘরভরা ছেলেপুলের।
জ্যোতিপ্রকাশ শান্ত হেসে বলেছিল, আশ্চর্য! আজকাল কেউ ওরকম ভাবে না।
আমার শখ যে! কী করব বলো!
সমস্যা কী জানো? এ বয়সে মেয়েদের শরীরে স্টিফনেস দেখা দেয়। কোনও কমপ্লিকেশন হলে কী হবে?
কিছু হবে না। অত ভেবো না।
তাদের ছেলেমেয়ে দুটিই খুব ভাল। তারা কেউ দুষ্ট নয়, দুজনেই মেধাবী, শান্ত, বাধ্য। দুজনের চোখের দৃষ্টিই স্নিগ্ধ। দেখতেও তারা সুন্দর। বিয়ের পর তারা দীর্ঘ দিন সন্তানের কথা ভাবেনি। তখন জ্যোতিপ্রকাশ আর পারুল লড়াই করছে ব্যবসা নিয়ে। ব্যবসা তখনও অস্থিরতায় ভুগছে। পারুলের বয়স তখন নিতান্তই কম। আঠেরো পূর্ণ হয়নি। বিয়ের ছয় বছর বাদে তাদের সময় হয়েছিল। ছক কষেই তারা এনেছিল প্রথম সন্তান। ঠিক তিন বছর বাদে দ্বিতীয় এল। সব কিছুই প্ল্যানমাফিক করা উচিত এটা তারা দুজনেই বিশ্বাস করত। আত্রেয়ীর বয়স এখন পনেরো, শুভমের বারো।
সবই ঠিকঠাক ছিল। সংসার বেঁধে নিয়েছিল নিজেদের ছকে। গত বছরই ঘটল একটা ঘটনা। সেটাও শীতেরই এক রাত। জামশেদপুরে সাংঘাতিক শীত পড়েছিল সেই রাতে। একটা বা দেড়টা হবে বোধহয়। পারুল লেপের গরমের ভিতরে গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে জেগে উঠল। কে ‘মা’ বলে ডাল হঠাৎ? খুব কচি গলার ডাক। কিন্তু তার ঘুমের মধ্যে সেই ডাক যেন তার শরীরে ঝংকার দিয়ে গেল।
দুরুদুরু বুকে লেপ সরিয়ে উঠে বসল সে। আত্রেয়ী বা শুভম ডাকছে না তো! কিন্তু ওরা তো অত ছোট নয়! তবু আলো জ্বেলে সে গিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দেখল, দুটো সিংগল খাটে ভাইবোন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবে ডাকল কে?
শব্দটা বাইরে থেকেও আসার কথা নয়। কাছাকাছি বাড়ি নেই এবং এই নির্জন পাড়ায় নিশুত রাতে মা ডাকার মতো কেউ থাকবে–এটাও ভাবা যায় না। তবু নিঃশব্দে টর্চ জ্বেলে জ্বেলে বাড়ির ভিতরটা ভাল করে দেখে নিল পারুল। তারপর চুপচাপ বসে খানিকক্ষণ ভাবল। ভেবে ভেবে তার মনে হল, বাইরে থেকে নয়, এ ডাক এসেছে তার ভিতর থেকে। ভিতর থেকেই। কিন্তু তাও কি হয়? তার ভিতর থেকে কে তাকে মা বলে ডাকবে?
নিশ্চিত হওয়ার জন্য সকালে সে তার ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করল, রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখে তারা কেউ মাকে ডেকেছিল কিনা।
তারা দুজনেই অবাক হয়ে বলল, না তো!
অথচ পারুল শুনেছে, স্পষ্ট শুনেছে, খুব কচি গলায় কে যেন আর্তরবে ডেকেছিল মা! সেই ডাক তার সমস্ত শরীরে ঝংকার দিয়ে গেছে। ঘুমের মধ্যে সে শিউরে কেঁপে উঠেছিল।
পারুল ভাবের মানুষ নয়। স্বামীর ব্যবসায় তাকে মাথা খাটাতে হয়, সংসার সামলাতে হয়, ছেলেমেয়ের দিকে নজর দিতে হয়। অলস সময় বলতে তার কিছু নেই। তবু ওই নিশুত রাতের একটা ডাক তাকে নিশির মতো পেয়ে বসল। প্রতিদিন ঘুমোবার আগে তার মনে হত, আজও যদি ডাকে! ইস, আর একবার যদি ডাকে!
