গৌরহরি যদি হৈমকে মন থেকে অপছন্দ করত তা হলে সমস্যা হত না। কিন্তু মেয়েটির প্রতি গৌরহরিরও একটু আকর্ষণ ছিল। শুধু চেহারাই নয়, হৈমর একটা ভারী সুন্দর, সরল স্বভাব ছিল। কোনও উগ্রতা ছিল না। বয়সে গৌরহরির কাছাকাছি। খুব অল্প বয়স থেকেই তাদের মধ্যে একটা মনের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিন্তু তখন তো হুট করে কেউ সামাজিক সম্পর্ক ভেঙে ফেলত না।
হৈম বলত, আমি সেই কোন ছেলেবেলা থেকে তোমাকে ভালবাসি। তোমাকে মনে করেই এতকাল শিবের মাথায় জল ঢেলেছি। আমার কী অপরাধ বলো।
গৌরহরি বলত, শুধু ভালবাসা সম্বল করে যদি পালিয়ে যাই তা হলে দেখবে ভবিষ্যতে কষ্টে পড়লে ভালবাসাটাও থাকবে না।
তাই কি হয়? আমি চিরকাল তোমাকে ভালবাসব।
ভালবাসাবাসিতে যেরকম সব কথা হয় তেমনই হত তাদের মধ্যেও। গৌরহরির বিয়ের জন্য যখন পাত্রী দেখা হচ্ছে তখন একদিন হৈম এসে কেঁদে পড়ল, তা হলে আমার কী হবে? আমি কী করে বাঁচব?
গৌরহরি বলল, হৈম, তোমাকে যদি বিয়ে করি তা হলে এমন একটা বিশ্রী পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে যে শেষে আমাদের পরিণতি ভাল হবে না।
গৌরহরির হাত ধরে অনেক সাধাসাধি করেছিল হৈম, অনেক কেঁদেছিল, শেষে এরকম অসম্ভব প্রস্তাবও করে বসেছিল, তা হলে আমাকে অন্তত একটা সন্তান দাও, তাকে নিয়ে বেঁচে থাকব।
গৌরহরি বলেছিল, দুনিয়ায় কি পাপের অভাব আছে হৈম? আমরা সেটা আর বাড়াব কেন?
বলাকা তখন নিতান্তই বালিকা। কানাঘুষো কিছু কানে এলেও ব্যাপারটা ভেবে দেখার মতো মনই তৈরি হয়নি তার। বিয়ের পর হৈম তার কাছে আসত প্রায়ই। হাঁ করে তাকে দেখত, কাছ ঘেঁষে বসে তার মুখে হাত বুলিয়ে দিত। বড় অস্বস্তি হত বলাকার। তারপর একদিন তাকে বলল, হ্যাঁরে, ভাগ করে নিবি?
কী ভাগ করে নেব?
কেন, তোর বরকে?
বলাকা ভারী অবাক হয়ে যেত। বালিকা হলেও এবং কথাটার নিহিত অর্থ না বুঝলেও তার প্রস্তাবটা মোটেই ভাল লাগত না। সে আড়ালে কেঁদে ফেলেছিল। এবং রাতে গৌরহরিকে বলেও দিয়েছিল।
গৌরহরি তাকে বলল, ভয় পেয়ো না। ও দুঃখী মেয়ে। এর জন্য আমাদের কিছু করার নেই।
ও আবার এলে আমি কী করব?
আমার মায়ের কাছে গিয়ে বসে থেকো।
ধীরে ধীরে হৈমর ভিতরে একটা পরিবর্তন আসছিল। ছোট হলেও বলাকা সেটা বুঝতে পারত। বিধবা হলেও হৈম চওড়া পাড়ের শাড়ি পরত, মুখে পাউডার দিত, কপালে টিপ পরত। গাঁয়ে নিন্দে হলেও গ্রাহ্য করত না। কিন্তু ধীরে ধীরে সাজগোজ কমে যেতে লাগল। চুল আঁচড়াত না। আর বলাকার কাছে এসে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এক কথা, আয় না রে, ভাগ করে নিই। আমি অর্ধেক, তুই অর্ধেক!
বলাকা সবসময়ে শাশুড়ির ঘরে পালিয়ে যেতে পারত না। শাশুড়িরও কাজকর্ম, পুজো-আচ্চা সংসার আছে। খুব মন খারাপ হত তার। বলত, ওসব কথা বলতে নেই।
কেন রে। তুই তো একটুখানি এক ফোঁটা মেয়ে। বরের কথা তুই কী বুঝিস?
নানা অসভ্য কথাও জিজ্ঞেস করত হৈম। বলাকার খুব রাগ হত। কিন্তু রাগ করে তো কিছু করার ছিল না। তার চেয়ে অন্তত তেরো চোদ্দো বছরের বড় ছিল হৈম, কাজেই বকেও দিতে পারত না।
তবে এটাও ঠিক, বরের মহিমা সে নিজেও বুঝত না তখন। শুধু বুঝত, এ লোকটা আমার সম্পত্তি। তার বেশি কিছু নয়।
আমাকে কি তোর হিংসে হয়?
হিংসে হবে কেন?
জানিস, তোর বরকে আমি নিয়ে পালিয়ে যেতে পারতাম।
কেন?
ও তো আমারই ছিল। তুই কেড়ে নিলি।
বাঃ রে, কেড়ে নেব কেন? আমাদের তো বিয়ে হয়েছে।
ওঃ ভারী তো বিয়ে! ও বিয়ে আমি মানিই না।
কান্না আসত বলাকার।
একদিন হৈম বলল, তোর বরকে বলবি আমাকে একটা ছেলে দিতে!
বলাকা হাঁ।
বল না রে। আমি বললে শোনে না। তুই বললে ঠিক শুনবে। এটুকু তো পারে। বল না রে।
একথাটাও গৌরহরিকে বলে দিয়েছিল বলাকা।
গৌরহরি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, পাগলামির লক্ষণ।
ও তোমাকে কেড়ে নিতে চায় কেন?
একটু বড় হলে সব বুঝিয়ে দেব। মন খারাপ কোরো না।
আমার ওকে ভীষণ ভয় করে।
করারই কথা।
সন্তানের ইচ্ছেটাই বোধহয় শেষ অবধি প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠেছিল হৈমর। সেইসময়ে এসে আর স্বামীর ভাগ চাইত না। শুধু বলত, একটা ছেলে হলেই আমার হয়, আর কিছু চাই না। বল না একটু ওকে।
কথাটার মধ্যে অসভ্যতা আছে তা বোঝার মতো মনের অবস্থা বলাকার তখন হচ্ছিল। সে রাগ করত।
হৈম শেষ অবধি যে পন্থা নিয়েছিল তা পাগল না হলে নেওয়া যায় না। বলাকার বিয়ের এক বছরের মাথায় সে গর্ভবতী হয়ে পড়ল। সে যুগে গাঁয়ের চূড়ান্ত কেলেঙ্কারি। তবু এরকম ঘটনা ঘটতও অনেক। হৈম কার সঙ্গে মিশেছিল, কার কাছে নষ্ট করেছিল নিজেকে তা প্রকাশ পায়নি। ভোগী, লোভী পুরুষের অভাব তো নেই।
বলাকার বিয়ের দেড় বছরের মাথায় গর্ভপাত করাতে গিয়ে হৈম মারা যায়। অনেকে বলে, মাধবানন্দ রায়ই নাকি তাকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিল। রহস্যের মীমাংসা হয়নি।
কিন্তু এই ঘটনা থেকে গৌরহরির যে ছবিটা ভেসে ওঠে তা এক অমলিন পুরুষের ছবি। হৃদয় দৌর্বল্যকে সে প্রশ্রয় দেয় না। অধিকার সীমাবদ্ধ রাখে। চৌকাঠ ডিঙোয় না। বলাকার মতো আর কে তাকে জানবে?
বাবা এক অদ্ভুত মানুষ, না মা?
হ্যাঁ মা, লোকটার থাই পেলাম না।
ছবির পর ছবি দেখে যাচ্ছে তারা। নির্জন দুপুর। বাইরে ঘুঘু ডাকছে।
হ্যাঁ রে, সময় বলে কি কিছু সত্যিই আছে?
পারুল অবাক হয়ে বলে, কেন থাকবে না মা? সময় তো একটা সত্যিকারের জিনিস।
