গৌরহরি অক্ষত ছিল না। সড়কি লেগেছিল হাতে। লাঠির ঘায়ে কান ঘেঁচে গিয়েছিল। বেশ রক্তপাত হয়েছিল। বলাকা যখন তাকে দুহাতে আঁকড়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছিল তখন গৌরহরি বলল, কাঁদো বলেই তো লোকে পেয়ে বসে।
তোমাকে যদি মেরে ফেলত?
আচ্ছা বলাই, আমাকে মেরে ফেলত বলেই তুমি শুধু ভয় পেয়ে কাঠ হয়ে থাকবে? বরং এক আধটা ঢ্যালা তুলে ছুঁড়ে মারতেও তো পারতে। পুজোর সময় মা দুর্গাকে তো খুব প্রণাম করো, অঞ্জলি দাও, মা দুর্গার লড়াইটা নিতে পারো না?
বলাকা কথাটা আজও ভুলতে পারে না। খুব শিক্ষা দিয়েছিল তাকে গৌরহরি। উপদেশ দিলে মানুষ শেখে না, কিন্তু পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যখন উপদেশ উঠে আসে তখন মানুষ সহজেই শেখে।
খুড়শ্বশুরের বাড়িতে ঢুকবার আগে গৌরহরি বলেছিল, ঘটনাটা কাউকে বলার দরকার নেই। হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়েছিলাম বলে চোট হয়েছে, এটা বলাই ভাল।
আশ্চর্যের বিষয় নিজের এই বীরত্বের কাহিনী কখনও গৌরহরিকে কারও কাছে বলতে শোনেনি বলাকা। যেন কিছুই ঘটেনি, এমনই নির্লিপ্ত থেকেছে মানুষটা।
গল্পটা পারুলের কাছে বলতে বলতে সেই সন্ধেটা যেন ঘিরে ধরল চারিদিকে। যেন পাশেই রয়েছে গৌরহরি। বাঘের মতো চোখ জ্বলছে, দুই সবল হাতে লাঠি চালাচ্ছে প্রবল বিক্রমে।
শুনতে শুনতে চোখ ছলছল করছিল পারুলের।
আচ্ছা মা, সেদিন যদি বাবা ডাকাতের হাতে মারা যেত তা হলে আমাদের তো জন্মই হত না, তাই?
তাই তো মা।
আর তুমি বোধহয় পাগল হয়ে যেতে।
না মা, আমি মরেই যেতাম। হার্টফেল হত।
খুব হাসল পারুল, সবাই বলে বাবার প্রতি তোমার যেমন ভালবাসা তেমনটা আর দেখা যায় না। নিঃশব্দে নীরবে তুমি বাবার জন্য সব কর্তব্য করেছ।
তারা ভুল বলে মা।
ভুল বলে?
বলাকা হাসলেন, একদম ভুল। কর্তব্য হিসেবে আমি তার জন্য কখনও কিছু করিনি।
কী যে বলো মা! আমরা তো জানি বাবা কেমন মেজাজি আর খেয়ালি ছিল। সময়-অসময়ে কত অন্যায় বায়না করত, তুমি কখনও রাগ করোনি। সব বায়না সামলেছ, তোমার জন্য আমাদের কষ্ট হত, বাবার ওপর রাগও হত, ভয়ে কিছু বলতাম না। সময় অসময়ে বাবা কতদিন অতিথি এনে হাজির করেছে, মনে নেই? অসময়ে তোমাকে ফের উনুন ধরিয়ে রাঁধতে হত। রান্নার লোক তো রাখা হয়েছে অনেক পরে।
সব মনে আছে মা। মনই তো এখন আমার বন্ধু। মন খুলে বসে সেসব দিনকে ফের কাছে নিয়ে আসি, চোখ ভরে সব দেখি। কিন্তু তুই যা বললি তা তোর নিজের মতো করে বিচার। আমি তো ওভাবে দেখি না। আমার কখনও কোনও কষ্ট হয়নি যে!
হয়নি?
না, কখনও হয়নি। যদি কর্তব্য হিসেবে করতাম তা হলে হত। আমি যা করেছি তা ওই মানুষটাকে ভালবেসে করেছি। কর্তব্যের মধ্যে কষ্ট থাকে, অনিচ্ছে থাকে, নিজের ওপর জোর খাটাতে হয়, শ্রদ্ধা থাকে না। ভালবাসায় ওসব নেই। ভালবাসলে সব করা যায়।
তোমার মতো ভালবাসা কিন্তু এ যুগে অচল। আরও পঞ্চাশ বছর পর জন্মালে তুমি পারতে না।
আরও দুশো বছর পরে জন্মেও যদি তোর বাবার সঙ্গে আমার বিয়ে হয় তাহলেও ঠিক একই রকম আমাকে দেখবি তোরা। ভালবাসা তো মুখের কথা নয় মা, ভসভসে আবেগও নয়, ভালবাসার মধ্যে তার জন্য করাটাও আছে। খুব ভালবাসি, কিন্তু তার জন্য কিছু করতে ইচ্ছেও করে না, সে ভালবাসা হচ্ছে সোনার পাথরবাটি।
পারুল হাসছিল, ইউ আর ইমপসিবল। বাবার ব্যাপারে তোমাকে কখনও টলতে দেখলাম না। হ্যাঁ, মা, একটা কথা বলবে?
বড্ড পেছনে লাগছিস আজ। আবার কী কথা?
বলছি ধরো বাবা যদি এত হ্যান্ডসাম না হত, এত পারসোনালিটি বা সাকসেস না থাকত তা হলে কি এত ভালবাসতে পারতে?
তা তো জানি না। তাকে যেমনটি পেয়েছি তেমনটিই পেয়েছি। আমার তো নালিশ নেই। রূপের আকর্ষণ তো বেশি দিন থাকে না। থাকে অন্য কিছু।
যাই বলল, আমার বাবা ওরকম না হলে কিন্তু তুমি কিছুতেই
দুর পাগলি! এই যে বললি তোর বাবা খামখেয়ালি ছিল, আমার ওপর অন্যায় অত্যাচার করত। আরও অনেকে অনেক কথা বলে। আমার শাশুড়ি তো বুড়ো বয়সে আমাকে প্রায়ই বলত, ও বউমা, ওকে অত আসকারা দাও কেন বলল তো! তোমাকে ভাজা ভাজা করে খেল যে! কখনও-সখনও একটু মুখনাড়া দিও মা, নইলে পুরুষমানুষ নৃসিংহ অবতার হয়ে ওঠে কি না।
বলত বুঝি?
শাশুড়ি বলত, দেওর ননদরা বলত।
তুমি মানতে না?
মানব কি, শুনে তো আমার ওর জন্য কষ্টই হত। মনে হত বেচারার আমি ছাড়া তো বন্ধু নেই।
ওঃ, এ যে দারুণ ডায়ালগ।
পেছনে লাগছিস তো!
না মা, বাবার গল্প শুনতে আমার ভাল লাগে। এক গল্প কতবার শুনি, তবু পুরনো হয় না। তুমি বলো।
হৈমর গল্প তো শুনেছিস?
শুনিনি আবার! মুখস্থ। তবু বলল।
রায়বাড়ির হৈমর কথা ভাবলে আজও বলাকার মনটা মেদুর হয়ে যায়। ফর্সা টুকটুকে পুতুল-পুতুল চেহারা ছিল হৈমর। হাত পায়ের ডৌল কী সুন্দর। রক্তমাংসের মানুষ বলে মনেই হয় না। রায়েদের ছিল বংশানুক্রমিক বন্ধকী কারবার। বিস্তর পয়সা। হৈমর বাবা মাধবানন্দ রায়ের আমলে ব্যবসা যেন আরও ঠেলে উঠেছিল। তখনও বিয়ে হয়নি গৌরহরির। এম এ পাশ করে ল পড়ছে। ছুটিছাটায় বাড়ি এলে হৈম গিয়ে গৌরহরিকে বলত, তোমার আমার তো সামাজিক বিয়ে হওয়ার নয়, চলো পালিয়ে যাই। হৈমর রাখঢাক ছিল না, স্পষ্টাস্পষ্টি কথা।
গৌরহরি তাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিরস্ত করার চেষ্টা করত। সমস্যা হল হৈমরা বৈদ্য। আরও সমস্যা হল হৈম বালবিধবা।
