সেটা মাঘ মাস ছিল, মনে আছে বলাকার। দুপুরে তারা বাসে চেপেছিল। ঘরের বার বেশি হত না বলেই সেই সামান্য সামান্য ভ্রমণগুলোই অসামান্য লাগত বলাকার কাছে। জানলার ধারে বসে ঠান্ডা বাতাস উপেক্ষা করে বাইরের জগতটা দেখছিল সে।
তখন এক গা গয়না পরে থাকতে হত বলাকাকে। শ্বশুরমশাই এবং শাশুড়ি ঠাকরুন দুজনেই পছন্দ করতেন তাঁদের বড়বউ সবসময়ে গয়না পরে থাকুক। পথেঘাটে তখন এত বিপদ-আপদ ছিল না বলেই গয়নাগুলো খুলেও রেখে যায়নি বলাকা। ষোলো-সতেরো বছর বয়সে অত হিসেবনিকেশ করে চলার বুদ্ধিও তো হয়নি।
বাসে একটা লোক গৌরহরির সঙ্গে বেশ গায়ে পড়ে আলাপ জমিয়ে ফেলল। কোথায় যাচ্ছেন, কী করা হয়, কোথা থেকে আগমন–এইসব অকারণ কৌতূহল।
তারা যেখানে নামল লোকটাও সেখানেই নামল। বাসরাস্তা থেকে হরিপুর মাইল দুই হাঁটা পথ। গোরুর গাড়ি যায় বটে, কিন্তু রাস্তা খারাপ বলে সময় বেশি লাগে। তাই তারা হেঁটেই যাচ্ছিল। লোকটাও তাদের সঙ্গে কিছু দূর এল। তারপর, এবার আমি গাঁয়ের রাস্তায় যাব বলে হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল।
বলাকা দেখল, গৌরহরির মুখটা একটু গম্ভীর। তখন স্বামীর মুখ গম্ভীর দেখলেই বলাকার মন খারাপ হত।
সে বলল, কী ভাবছ গো! কাকার জন্য মনখারাপ?
গৌরহরি বলল, হুঁ।
কয়েক কদম গিয়ে গৌরহরি দাঁড়িয়ে ডাইনে বাঁয়ে দেখে নিল একটু। দেখার অবশ্য কিছু ছিল না। নির্জন মাঠঘাট, ঝোপঝাড়, বাঁশবন।
কী হল গো?
গৌরহরি মৃদু হেসে বলল, গয়নাগুলো পরে এসে ভুল করেছ বলাই। কিন্তু কী আর করা যাবে।
বলাকা ভয় পেয়ে বলে, হঠাৎ গয়নার কথা বলছ কেন?
এমনি বললাম। ভয় পেও না।
না, তুমি মোটেই এমনি বলোনি। কিছু হবে নাকি গো?
আরে না। আর হলেই বা কী! চলো।
খানাখন্দে ভরা রাস্তায় চলতে চলতেই শীতের বেলা ফুরিয়ে আসছিল। কে যেন আলোর বিছানো চাদরটা টেনে নিচ্ছে দ্রুত। চারদিকে ঝুঝকো আঁধারের জাল নেমে আসছিল। বলাকার বুক ঢিপঢিপ করছিল।
হ্যাঁ গো, ওই লোকটা তোমাকে কিছু বলেছে?
না তো!
তাহলে তুমি চিন্তা করছ কেন?
গৌরহরি মৃদু হেসে বলল, লোকটা মুখে কিছু বলেনি। তবে চোখ দিয়ে বলেছে।
তার মানে কী গো! চোখ দিয়ে কী বলল?
উকিল মানুষ তো, ক্রিমিন্যাল চিনতে পারি।
কিন্তু লোকটা তো চলে গেল।
হ্যাঁ।
বলাকা রাগ করে বলল, তুমি কিছু খুলে বলছ না।
ভয়ের কী! আমি তো সঙ্গে আছি।
আমার ভয়-ভয় করছে যে!
ভয় পেও না। ভয় পেলে বুদ্ধিনাশ হয়। আর বুদ্ধিনাশ হলেই বিপদ।
আমাদের কি কোনও বিপদ হবে?
মনে হয় না। তবু ভালর জন্য যে কটা গয়না পার খুলে ফেল গা থেকে।
গয়না খুলব?
হ্যাঁ। সব খোলার দরকার নেই। যেগুলো সহজে খোলা যায় শুধু সেগুলো। খুলে আমার হাতে দাও।
বলাকা খুব তাড়াতাড়ি নেকলেস, বালা, দুল, আংটি খুলে ফেলতে পেরেছিল। পৌরহরি সেগুলো রুমালে জড়িয়ে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে দিল। ডান হাতে চামড়ার স্যুটকেস আর বাঁ হাতে বলাকার হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিরুদ্বেগ গলায় বলল, ছুটছাট ঝামেলা বিপদ তো জীবনে ঘটেই থাকে। শুধু বলে রাখি বিপদ ঘটলে দৌড়ে পালাতে যেও না। মাটিতে উবু হয়ে বসে পেপাড়ো।
কথা শুনে বলাকার বুকে কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল। সে প্রাণপণে আঁকড়ে ধরল গৌরহরির হাত।
তখনও আলো সম্পূর্ণ মরে যায়নি। হরিপুরের গাছপালা দেখা যাচ্ছিল দূর থেকে। দু-চারটে আলোও জ্বলে উঠছিল। হঠাৎ বাঁ ধারের মাঠ বরাবর সাত-আটজন লোককে দৌড়ে আসতে দেখা গেল। হাতে লাঠি, সড়কি, দা।
ও ওরা কারা আসছে গো? অ্যাঁ! ওরা কারা?
আমার পিছনে আড়াল হও বলাই।
ওরা কি ডাকাত?
শান্ত স্বরে গৌরহরি বলেছিল, এরা ছ্যাঁচড়া ডাকাত। ভয় নেই।
গৌরহরি লোকগুলোকে দেখে ঘাবড়াল না, পালাল না। বলাকাকে উবু হয়ে বসতে বলে শান্তভাবে তাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে রইল। বলবান শরীরটা ছাড়া তার কোনও অস্ত্র ছিল না। না ছিল, চরিত্র ছিল, দুর্জয় সাহস ছিল। সেগুলোও কি মানুষের অস্ত্র নয়?
লোকগুলো এত তাড়াতাড়ি চলে এল কাছে যে, বলাকা কিছু ভাববারও সময় পেল না। চোখের পলকে ঘিরে ধরল তাদের। লম্বা চওড়া একটা লোক গৌরহরির বুকে বল্লম ঠেকিয়ে বলল, দিয়ে দে, দিয়ে দে। প্রাণে মারব না। দিয়ে দে।
কী চাও?
গয়নাগুলো দে। তাড়াতাড়ি…তাড়াতাড়ি…অ্যাই, ওই যে মেয়েটা ঘাপটি মেরে বসে আছে, খুলে নে তো গা থেকে…
একটা লোক এগিয়ে এসে বলাকাকে হ্যাঁচকা টানে দাঁড় করিয়ে দিল।
বোধহয় ওইটেই ভুল করেছিল ডাকাতেরা। বলাকার গায়ে হাত না দিলে গৌরহরি হয়তো গয়নাগুলো দিয়ে দিত, ঝামেলা করত না।
হাতের স্যুটকেসটা একবার দুলিয়ে গৌরহরি প্রথম মারল সর্দার লোকটাকে। সে ছিটকে যেতেই কার হাত থেকে একটা লাঠি হ্যাঁচকা টানে কেড়ে নিয়ে গৌরহরি যেন দশটা গৌরহরি হয়ে গেল।
কাঁপতে কাঁপতে কাঁদতে কাঁদতে দৃশ্যটা দেখছিল বলাকা। আবার ওই ভয় উত্তেজনা উদ্বেগে ভাল করে দেখেওনি কিছু। শুধু দেখল, লোকগুলো কেমন দিশেহারা হয়ে গেল। দু-চারজন মার খেয়ে এবং বাকিরা ভড়কে গিয়ে তফাত হচ্ছিল যেন। বলাকা চোখ বুজে ফেলেছিল এরপর।
লোকগুলো তেমন উঁচুদরের ডাকাত নয়। হয়তো চাষি-বাসি। মাঝেমধ্যে শৌখিন ডাকাতি করে। গৌরহরির রুদ্রমূর্তি আর রাগ দেখে তারা পালিয়ে গেল। দুটো লোক পড়েছিল মাঠে।
টর্চ জ্বেলে গৌরহরি দুজনের মুখ দেখে নিল। তারপর বলল, চলো বলাই, আর ভয় নেই।
