কী বলল?
বলল, আমি সোহাগের জন্য এসেছি।
যাঃ। ও তো শুধু চি হি হি করে ডাকল!
তুমি কিছু জান না। আমি ঘোড়ার কথা বুঝতে পারি।
আমাকে ওর কী দরকার?
তা কী জানি! তোমার ঘোড়া তুমি এসে দেখো।
এ কথা শুনে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েই সোহাগ দেখল সে উঠোনে ঘোড়াটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ঘোড়াটা পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, উঠে পড়ো, উঠে পড়ো। সময় নেই…
সোহাগ কখন উঠল কে জানে, হঠাৎ দেখল সে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে আর ঘোড়াটা টগবগ টগবগ করে চলেছে।
কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে বল তো!
ঘোড়াটা জবাব দিল না। চলল আর চলল। টগবগ টগবগ।
সামনেই একটা গভীর সবুজ জঙ্গল। এত সবুজ যে মনে হয় সদ্য কেউ সবুজ রঙে চারদিককে চুবিয়ে গেছে। আর এরকম অদ্ভুত গাছপালা সে কখনও দেখেছে কি? দেখেছে, তবে ছবিতে। গাছপালা একটাও তার চেনা নয়। বিশাল বড় বড় পাতা, খুব বড় বড় সব গোল ফল চারদিকে ফলে আছে। আর দেখল মণ্ড আকাশের আধখানা জুড়ে কী বিশাল চাঁদ উঠছে। চাঁদ কি এত বড় হয়? কে জানে বাবা, হয়তো হয়।
চারদিকে আলো আর আলো। আর গাছপালা। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ফর্সা আলোয় ঘুরে বেড়াচ্ছে খরগোশ, হরিণ, ময়ূর, টিয়ার ঝাঁক, জেব্রা,, নীল গাই।
বড্ড ভাল তো জায়গাটা। এখানে একটা চড়ুইভাতি করলে কেমন হয়?
ঝুমঝুম করে একটা ঝুমঝুমির শব্দ হচ্ছিল। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা লোক দৌড়পায়ে আসছে। তার কাছাকাছি এসে লোকটা হাত তুলে বলল, এই যে! আপনার একটা চিঠি আছে।
লোকটার পোশাক দেখে ভারী মজা পেল সোহাগ। পরনে একটা খাকি হাফ প্যান্ট আর গায়ে সান্ডো গেঞ্জি।
আপনি বুঝি ডাক হরকরা?
হ্যাঁ। অনেক চিঠি বিলোতে হবে। যাই।
খামের চিঠিটা হাতে নিয়ে সে দেখল খামের মুখটা খোলা। চিঠিটা বের করে দেখল নীল কাগজে কে যেন অনেক অসভ্য কথা লিখেছে ভুল ইংরিজিতে। সে রেগে গিয়ে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিল।
ও মা! পান্না!
পান্না অভিমানভরে বলে, সেই কখন থেকে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। এত দেরি করলে যে!
কী করব, ঘোড়াটাই যে দেরি করে গেল আমাকে আনতে।
এবার নামো। দেখছ কেমন সুন্দর জায়গা।
এই জায়গায় আমরা পিকনিক করব, তাই না পান্না?
হ্যাঁ। এখন চলো, কাজ আছে।
জঙ্গলে আবার কী কাজ?
বাঃ, মনে নেই? সেই যে
কী বল তো!
এসো আমার সঙ্গে, দেখবে।
পান্নার পিছু পিছু হেঁটে সোহাগ গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌঁছে দেখতে পেল, ঘাসের ওপর একটা কম্পিউটার। তার সামনে একজন লোক বসে আছে। সে কাছে যেতেই লোকটা মুখ ফেরাল। আর বড্ড চমকে উঠল সোহাগ। বুকটা ধকধক করছে। লোকটা হেসে বলল, তুমি ইন্টারনেট খুঁজছিলে খুকি? এই তো ইন্টারনেট। অ্যান্ড ইউ হ্যাভ এ মেসেজ।
লোকটা বিজু।
.
৩০.
একটা চারকোনা কাগজের মধ্যে থেমে আছে সময়, থেমে আছে ইতিহাস। গৌরহরি দাঁড়িয়ে আছে একটা মৃত বাঘের পেটের ওপর এক পা রেখে। হাতে বন্দুক। মাথায় শোলার হ্যাট। পরনে খাকি প্যান্ট আর সাদা হাফশার্ট। দুখানা চোখ ছবিতেও জ্বলজ্বল করছে। পিছনে জঙ্গলের সিনারি।
হেসে কুটিপাটি হচ্ছিল পারুল, আচ্ছা, বাবা আবার কবে বাঘ মারল বলো তো! জীবনে কখনও শিকার-টিকার করেছে বলে তো শুনিনি!
বলাকা মুগ্ধ চোখে চেয়ে ছিল। ছবিটা মিথ্যে এবং সাজানো। গৌরহরি কখনও বাঘ মারেনি। মনোরঞ্জন সাহা ছিল গৌরহরির মক্কেল। তার স্টুডিওতে শখ করে ছবিটা তুলে দিয়েছিল। তোক মিথ্যে, তবু কী পৌরুষদীপ্ত দেখাচ্ছে মানুষটাকে! বাঘ মারতে চাইলে গৌরহরি কি মারতে পারত না? পারত। তার স্বামীর পক্ষে অসম্ভব কিছুই ছিল বলে বলাকার কখনও মনে হয় না।
বলাকা মৃদু হেসে বলে, এ ছবিটা তুই দেখিসনি, না?
না তো!
এক মক্কেল তুলে দিয়েছিল। তার স্টুডিওতে ট্যাক্সিডার্মি করা বাঘ-ভালুক ছিল বলে শুনেছি। ছবিটা অনেকদিন খুঁজে পাইনি। এই সেদিন আলমারি হাঁটকাতে গিয়ে কাগজপত্রের মধ্যে পেলুম। সুন্দর না?
সুন্দর। আমার বাবা তো সুন্দরই ছিল। কিন্তু ছবিটা বড্ড নাটুকে। বাঘশিকারি বীর সাজার কী দরকার ছিল বাবার?
দরকারটা তোর বাবার ছিল না, ছিল মক্কেলের। শুনেছি, ছবিটা সে স্টুডিওর শো-কেসে সাজিয়ে রেখেছিল। লোকে ভাবত কোনও সাহেবের ছবি।
তাই বলো! তার মানে এটা হল মডেল হিসেবে বাবার পোজ দেওয়া।
তাই হবে বোধহয়। ছবিটা আমার বেশ লাগে। বাঘ না মারলেও ডাকাবুকো তো ছিল।
তা সত্যি। আমার বাবার মতো সাহসী মানুষ আমি অন্তত দেখিনি। সেই ডাকাতের গল্পটা বলল না মা! সেই যে হরিপুরের দাদুর বাড়িতে
বলাকার শরীর এতকাল পরেও শিউরে উঠল। কতকাল আগেকার কথা, তবু যেন মনে হয় এই সেদিন–না, কত নয়–মনে হয়, গতকালকের কথা। না, আরও টাটকা। যেন আজকের ঘটনা, যেন এখনই ঘটছে।
হরিপুরের খুড়শ্বশুর ছিলেন দিলদরিয়া মানুষ। বাগানের শখ ছিল খুব। বাগানের শাকসবজি, আম কাঁঠাল নিয়ে মাঝে মাঝে চলে আসতেন। জমিয়ে গল্প করতেন। খাওয়া-দাওয়ারও খুব শখ ছিল। সেই মানুষটার সেবার এখন তখন অবস্থা। মরার সময় ঘনিয়ে এলে মানুষ সূক্ষ্মভাবে ঠিক টের পায়, আর তখন আত্মীয়স্বজনকে দেখার জন্য আকুলিব্যাকুলি হতে থাকে। হরিপুর থেকে খবর এল, খুড়শ্বশুর তাদের দেখতে চান।
একটু বৈষয়িক দরকারও ছিল। খুড়শ্বশুরের বড় ছেলে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছিল বলে তাকে আগেই ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করেছিলেন। এখন উইল করে সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করার জন্য পাকা ব্যবস্থা করতেও গৌরহরিকে ডাকা।
