আই অ্যাম সরি।
দোষ আমার বড় কম নয় মোনা। তবে আমি এখন এমন একটা মেন্টাল স্টেটে আছি যে এসব আমাকে তেমন স্পর্শ করে না। তোমাকে সত্যিই বলছি, পারুল ভাল মেয়ে। তার দোষ ছিল না। সে আমাকে বিয়ে না করে তার প্রতিবাদও জানিয়েছে। আমি যেমনই হই, পারুলকে খারাপ বলতে পারি না।
মোনা কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল, আজ আমি তোমার কাছে অন্য কিছুর জন্য এসেছিলাম। পারুলের কথাটা না তুললেই হত না?
অমল ম্লান হেসে বলে, কেন এসেছ মোনা?
মোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আজ থাক। কাল সকালে তাহলে আমরা কলকাতা যাচ্ছি?
হ্যাঁ যাচ্ছি। পাক্কা।
তোমার মেয়েও কি যাবে?
তা তো জানি না। ও কি থাকতে চাইছে?
আমার সঙ্গে কথা হয়নি।
তুমি কী বলো? ওকে রেখে যাবে?
না। এখানে ওর পড়াশুনো হবে না। ব্যায়াম হবে না। মিউজিক ক্লাস বা কম্পিউটার তেমন কিছুই হবে না। ও কেন থাকতে চাইছে এখানে জানো?
না।
ও বাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারবে। যেমন খুশি চলবে, যা খুশি করবে। এবাড়ির লোকদেরও তো দেখছি। ভীষণ আনকালচার্ড।
তাহলে জোর করে নিয়ে চলো।
বিস্মিত মোনা বলে, তুমি জোর করতে বলছ?
বলছি। আর কি কোনও উপায় আছে?
জোর করারই বা উপায় কী? চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাবে?
অমল নিভে গিয়ে বলল, ভায়োলেন্সের কথা বলিনি।
ও যেতে চাইবে না, আমি জানি। বকে ঝকে বুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কোনওভাবেই রাজি করাতে পারিনি। ও তো আমাকে শত্রু বলে ভাবে।
অমল দুর্বল গলায় বলে, তাহলে কী উপায়?
আমি বুঝতে পারছি না।
অমল চুপ করে বসে রইল। তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, যেতে যখন চাইছে না তখন থাক। কিন্তু এর আগে একবার কথাটা বলে ফল ভাল হয়নি। তাই বলল না।
তুমিই জোর করার কথা বলছিলে। জোর কীভাবে করবে?
যদি বুঝিয়ে বলা যায়?
বুঝিয়ে বলা আর জোর করা এক ব্যাপার নয়। বুঝিয়ে বললে ও রাজি হবে না। তখন কী করবে?
অমলের মাথা কাজ করে না আজকাল। তবু হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সে বলল, কয়েকদিন আগে বুডঢা আমাকে বলছিল, দিদির ই-মেল-এ অদ্ভুত অদ্ভুত মেসেজ আসছে। তার কোনও কোনওটা নাকি খুব অশ্লীল জাঙ্ক মেল।
আমাকে বলেনি তো বুডঢা।
বুডঢাকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে। ওর কথা শুনে আমিও সোহাগের ই-মেল চেক করেছি। কথাটা মিথ্যে নয়।
কোথা থেকে আসছে? আমেরিকা?
মোস্টলি।
খুব খারাপ কথা?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অমল বলে, খুব খারাপ। লেসবিয়ান সম্পর্কের কথাও আছে। সেগুলো আমি ডেস্ট্রয় করে দিয়েছি। কিন্তু মনে হয় এরকম আসতেই থাকবে।
জাঙ্ক মেল তো আমারও আসে, তোমারও আসে।
হ্যাঁ, সেগুলো কারা পাঠায় তা আমরা জানি না। কিন্তু সোহাগের কাছে যারা পাঠায় তারা সবাই ওর অচেনা নাও হতে পারে।
ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল মোনা। তারপর বলল, কিন্তু জাঙ্ক মেল-কে ভয় পেলে তো আমাদের চলবে না। ওটা কোনও বড় ফ্যাক্টরও নয়। তার চেয়ে ওর কলকাতায় যাওয়াটা অনেক জরুরি।
হ্যাঁ, আমিও তো তাই বলছি।
তাহলে এখন কী করব?
তৈরি হও।
আমি তৈরিই আছি। তোমার মেয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওকে ঘুম থেকে তুলে কাল কলকাতায় যাওয়ার কথা বলা ঠিক হবে কি?
তা কেন? ঘুমোচ্ছ ঘুমোক। কাল সকালেই বলে দেখো।
রাজি না হলে?
তখন ভাবা যাবে।
ভাবার সময় হবে কি?
আমরা কাল সকালে না গিয়ে দুপুরে বা আফটারনুনেও যেতে পারি। সময় পাওয়া যাবে।
সকালে একটা ভাল ট্রেন ছিল।
বর্ধমান থেকে কলকাতায় যাওয়ার কি ট্রেনের অভাব মোনা? দুপুরে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসও তো আছে।
মেয়েকে কী বলবে তা তৈরি করে রেখো।
আচ্ছা।
আমি যাচ্ছি।
অমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে, যাবে?
উঠে দাঁড়িয়েও বসে পড়ল মোনা, থাকতে বলছ?
ভাগ্যক্রমে দেহমিলনের জন্য ভালবাসার দরকার হয় না এবং কাম প্রেমের দাস নয়। এবং বেশির ভাগ দম্পতিই বিয়ের বহু বহু বছর পরে প্রেমহীন চুম্বন, ভালবাসাহীন মিলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
গভীর রাতে ক্লান্ত দুই নরনারী বিভিন্ন হল।
আমি ও-ঘরে যাচ্ছি।
যাও।
উঠে দরজাটা বন্ধ করে দাও।
ভেজিয়ে রেখে যাও, কিছু হবে না।
সামনে সমস্যাসংকুল এক সকাল আসছে। কী হবে কে জানে। মনে দুশ্চিন্তা নিয়েও ঘুমিয়ে পড়ল অমল।
.
একটা রোগা সাদা ছোট্ট ঘোড়া এসে নীচের উঠোনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। একেবারে চুপ। নড়ছে, চড়ছে না। মাঝে মাঝে শুধু ঝামরে উঠছে লেজ।
ওপর থেকে দেখছিল সোহাগ। এত রোগা যে দেখলে মায়া হয়। হাড় জিরজিরে শরীর, বড় ছোটোখাটো।
একটা কালোমতো ফ্রক-পরা মেয়ে কোথা থেকে খানিকটা ঘাস ছিঁড়ে এনে মুখের কাছে ধরল। ঘোড়াটা খেল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। সেই মেয়েটাই গিয়ে ঝপাং করে কুয়ো থেকে এক বালতি জল এনে ধরল মুখের সামনে। ঘোড়াটা জলও খেল না।
মেয়েটা ওপর দিকে চেয়ে বলল, ও সোহাগদিদি!
কী রে?
ঘোড়াটা কিছু খাচ্ছে না যে!
ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে।
ও বাবা, যদি কামড়ে দেয়?
ঘোড়া কি বাঘ যে কামড়াবে?
কামড়ায় গো। আমার মামাকে কামড়েছিল যে!
দে না একটু হাত বুলিয়ে।
তার চেয়ে বরং তাড়িয়ে দিই।
আহা, তাড়াস না। বড্ড রোগা যে!
মেয়েটা খুব ভয়ে ভয়ে ঘোড়ার মাথায় একটু হাত দিতেই ঘোড়াটা হঠাৎ সামনের দু পা তুলে প্রবল গর্জন করে উঠল, চি হি হি…
মেয়েটা লাফ দিয়ে সরে এসে হিহি করে হাসল।
হাসছিস কেন?
কী বলল শুনলে না?
