কেন যে কলকাতায় যাওয়ার জন্য হুড়ো দিচ্ছ! কলকাতাতেই কি আমি ভাল থাকি?
সে জন্য নয়।
তাহলে?
পারুল এখন গাঁয়ে আছে। পুজোর পর চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুনছি তার নাকি আবার ছেলেপুলে হবে। সবে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। কিছুদিন থাকবে এখন। ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দিচ্ছে জামশেদপুরে। ব্যাপারটা বুঝেছ?
না তো! পারুল গাঁয়ে থাকবে বলেই কি আমাকে কলকাতায় তাড়াতে চাইছ?
এই তো বুঝেছ!
তার মানে কি পারুল আর আমার এক গাঁয়ে থাকাতেও তোমাদের আপত্তি?
আমার আপত্তি নয় ভাই। মনে হয় মোনা এটাকে ভাল চোখে দেখছে না।
তোমাকে তাই বলেছে বুঝি?
বলা নয়, তবে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে।
সন্দেহটা অমূলক ঠাকরোন, তবু তোমার কথা আমি মানব।
কবে যাবে?
কাল সকালেই।
যেও। তোমাকে যেতে বলছি বলে রাগ করলে না তো ভাই?
না। তুমি তো ভাল ভেবেই বলেছ, রাগ করব কেন?
আর যা বললাম তা মনে রেখো। চল্লিশের ওপর বয়স হল তোমার। এই বয়স থেকেই কিন্তু পুরুষদের বউকে খুব দরকার হয়।
তাই নাকি?
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি ভাই। যত বয়স বাড়ে ততই বউকে বেশি বেশি দরকার হয়। পুরুষদের উড়নচণ্ডী, বারমুখো ভাবটা তো বয়স হলে কমে যেতে থাকে। তখন একটু আসকারা চায় বউয়ের কাছে। তুমি টের পাও না?
না তো!
ও কেমন কথা!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমল বলে, এখন আমার কাউকেই দরকার হয় না তেমন। অফিস থেকে ফিরে নেশা করি। তার পর ঘুমোই।
ওটা কি একটা কথা হল? নেশা করে পড়ে থাকলে কি সমস্যার সমাধান হয়?
তুমি মোনার উকিল হয়েছ, ভাল কথা। কিন্তু আমি যে মোকদ্দমায় হেরেই বসে আছি ঠাকরোন, আমার জন্য আর কারও কিছু করার নেই।
তুমি যে কেমন হয়ে গেলে ভাই। বড্ড কষ্ট হয় তোমার জন্য। কত রোখাচোখা চালাক-চতুর ছিলে! এখন কেমন ভ্যাবলার মতো চুপচাপ বসে থাক! কী হয়েছে তোমার? একটু ডাক্তার দেখাও না।
ঠিক আছে, তাই না হয় দেখাব।
তুমি হাসছ! তার মানে ডাক্তার দেখাবে না।
তুমি তো একটা প্রেসক্রিপশন দিয়েছ। সেটাই ফলো করে দেখি।
দেখো গো দেখো। তাতে ভালই হবে।
প্রেসক্রিপশন কাজে লাগানোর কোনও ইচ্ছেই ছিল না অমলের। বউদি চলে যাওয়ার পর সে তার ডায়েরি টেনে নিয়ে বসল। কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। আজকাল নানা উদ্ভট কথা বা আইডিয়া তার মাথায় আসে। এগুলো কারও কোনও কাজে লাগার কথা নয়। অমল তবু লিখে রাখে, নিজের মনের একটা চিত্র রেকর্ড হয়ে থাকে। সে যদি অনেকদিন বেঁচে থাকে- যদি তাকে বেঁচে থাকতেই হয় তাহলে বুড়ো বয়সে সে ডায়েরির পাতা উলটে এই অচেনা অমলকে খুঁজে বের করবে, বিচার করবে, বিশ্লেষণ করবে। সিরিয়াস কিছু নয়, একটা খেলা বলেই ধরে নেওয়া যাক। লিখতে লিখতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল।
রাতে খেয়ে এসে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফের লিখছিল সে। একটু বেশি রাতের দিকে দরজায় মৃদু টোকার শব্দ হল।
চমকে উঠে অমল বলল, কে?
আমি। দরজাটা খোলো।
মোনা কাছাকাছি এলেই আজকাল সে ভয় পায়। মনে মনে নানা ব্যারিকেড রচনা করতে থাকে। কোন কথার কোন জবাব দেবে বা কতটা নীরব থাকবে। শেষ অবধি ব্যারিকেড কাজে লাগে না। আজকাল নীরবতাই তার একমাত্র ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে দরজা খুলে দেখল, মোনা এই শীতেও একটা হলুদ রঙের নাইটি পরে দাঁড়িয়ে।
কিছু বলবে?
মোনা তার গা ঘেঁষে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর মুখোমুখি হয়ে বলল, শুনলাম কাল কলকাতায় ফিরতে রাজি হয়েছ!
হ্যাঁ, আরও দুদিন ছুটি ছিল। ভাবছি ফিরেই যাই।
হঠাৎ সুমতি হল কেন?
সুমতি কুমতি নয় মোনা। ফিরে গেলেও হয়।
জিনিসপত্র সব গুছিয়ে ফেলেছ?
বিস্মিত অমল বলে, তুমি তো জানোই আমার জিনিসপত্র বলতে ওই অ্যাটাচিকেসটা। এ-ঘরে তো আর কিছু নেই।
কী করছিলে? ডায়েরি লেখা?
হ্যাঁ।
কী লিখছ ডায়েরিতে? আমার সম্পর্কে কিছু?
হঠাৎ অমল বুঝতে পারল, মোনা যুদ্ধ করতে আসেনি। এসেছে সন্ধি করতে। সম্ভবত বউদি ওকেও তার গ্রাম্য প্রেসক্রিপশনটা গিলতে বাধ্য করেছে।
ডায়েরি আর কলম রেখে দিল অমল। বলল, না, তোমার সম্পর্কে বা কারও সম্পর্কেই কিছু নয়। মাথায় অনেক কথা আসে। লিখে রাখি।
মোনা দু হাতে তার এলোচুল গোছ করছিল। মুখাবয়বে একটু ভ্রকুটি। ঠোঁট দুটো চেপে বসে আছে। দেহ মিলনের প্রস্তাবটা দিতে লজ্জা বা সংকোচ বোধ করছে। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মাঝে মাঝে এত দুস্তর ব্যবধান রচিত হয় যে, কিছুতেই সহজ হওয়া যায় না।
বোসো মোনা।
বসব?
যদি আপত্তি না থাকে।
মোনা বসল।
কথাটা বউদিকে না বললেও পারতে।
কোন কথাটা?
আমার আর পারুলের।
মোনা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল। জবাব দিল না।
ধীর স্বরে শান্তভাবে অমল বলে, বউদি গাঁয়ের মেয়ে তো। কথা ছড়ানো ওদের স্বভাব।
মোনা তার চুলের একটা গুছি সামনে এনে নীরবে পাক খাওয়াতে লাগল।
তোমার ইচ্ছে হলে অবশ্য পাঁচজনকে বলতে পার। আমার আর তাতে কোনও লজ্জা বা ভয় নেই। কিন্তু স্ক্যান্ডালটা হয়তো দুটো পরিবারের ক্ষতি করবে। যদিও অনেকদিন আগেকার ঘটনা তবু তারও কিছু প্রতিক্রিয়া তো আছেই। পাড়াগাঁয়ের নিষ্কর্মা মানুষ এসব কেচ্ছা নিয়ে খুব কথা চালাচালি করে।
দিদি বলবে না। কথা দিয়েছে।
অমল ম্লান একটু হেসে বলে, তুমিই তো সিক্রেটটা রাখতে পারলে না, অন্যে রাখবে সেটা কি আশা করা যায়?
