সব জানি। পারুলের সঙ্গে তোমার শরীরের সম্পর্ক হয়েছিল। অবাক হয়ো না। অবাক হওয়ার কিছু নেই।
.
২৯.
চা জুড়িয়ে গেল যে! খাও।
চুপচাপ চা শেষ করল অমল। তারপর বউদির দিকে চেয়ে একটু মলিন হেসে বলল, এখন আমাকে কী চোখে দেখছ ঠাকরোন? ঘেন্না হচ্ছে?
না বাপু, পুরুষমানুষের ওরকম একটু আধটু দোষঘাট হতেই পারে। ঘেন্না হবে কেন? বিয়েই তো হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। পারুল দেমাক দেখিয়ে বিয়ে করল না। না হলে কি এটা নিয়ে কথা উঠত, বল?
অমল মাথা নেড়ে বলে, না, উঠত না। পারুল না হয়ে অন্য কোনও মেয়ে হলে বিয়েও করত। পারুল কেন করল না বল তো!
দেমাক বাপু, বড্ড দেমাক।
না বউদি। এটা দেমাকের ব্যাপার নয়, তবে কাছাকাছি। পারুল আমাকে যে অপমানটা করল সেটা করার জন্য বুকের পাটা চাই। খুব বুকের পাটা চাই। সেদিন পারুলের ওপর রাগ হয়েছিল বটে আমার। কিন্তু এখন ওই জন্যই পারুলের ওপর আমার শ্রদ্ধা হয়। পুরুষের গায়ের জোর বেশি, জোর খাটাতেও সে পিছপা হয় না। চিরকাল মেয়েরা এই প্রবল পুরুষের ইচ্ছের কাছে নত হয়ে আসছে। ওইটাই রেওয়াজ। পারুল সেটা হতে দিল না। ঝগড়া-তর্ক করেনি, ভাষণ দেয়নি, নারীমুক্তির বুলি কপচায়নি, শুধু নীরবে আমাকে নাকচ করে দিয়েছে। ঠাকরোন, ভেবে দেখো, পারুলের মতো এমন কঠিন প্রতিবাদ কটা মেয়ে করতে পারে?
ও বাবা, তুমি যে পারুলের গুণকীর্তন শুরু করলে! আমার বাপু, ওসব মনে হয় না। মেয়েদের অত অহংকার তো ভাল নয়। যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েই আছে সে যদি একটু বাড়াবাড়ি করেই ফেলে তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয় নাকি?
বললাম তো, বেশির ভাগ মেয়েই এসব ক্ষেত্রে মেনে নেয়, আসকারাও দেয়। পারুল যে দেয়নি তাতে প্রমাণ হয় যে সে বেশির ভাগ মেয়ের মতো নয়। তার জাত আলাদা।
অবাক কাণ্ড বাপু। তোমার বউও এরকমই কী যেন বলছিল।
কী বলছিল?
আমার মাথায় বাপু, এত সব ব্যাপার ঢুকতে চায় না। গেঁয়ো মানুষ তো। মোনারও দেখলুম, পারুলের ওপর একটুও রাগ নেই। বরং বলছিল তোমরা সবাই নাকি পারুলের মধ্যে একটা দেবী-দেবী ভাব দেখতে পাও। হ্যাঁ ঠাকুরপো, তোমাদের সবারই কি একসঙ্গে একটু মাথার দোষ হল?
তা নয় ঠাকরোন। পারুলকে আমি ভোগ্যবস্তুর মতো ব্যবহার করে যে মস্ত ভুল করেছিলাম তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। মেয়েরা তো শুধু ভোগ্যবস্তু নয়, যদিও বেশির ভাগ পুরুষই তাই মনে করে। পারুল আমাকে গ্রহণ না করে সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল। আর মোনার কথা বলব? আমার মনে হয় পারুলের মধ্যে মোনা সেই মেয়েটাকেই দেখতে পায় যে রকমটা সব মেয়েই হতে চায়।
উঃ বাপরে! এবার তুমি আমার মাথাটাই খারাপ করে দেবে। যা ভেবে নিয়েছ তোমরা তা সব মনগড়া। পারুলকে টং-এ চড়িয়ে কেন যে পুজো করতে লেগেছ জানিনে বাপু। যত সব পাগুলে কাণ্ড। একটু মর্ত্যে নেমে এসো তো এখন।
মৃদু হেসে অমল বলে, আচ্ছা, নামলাম। এবার বলো।
আমি বলি কী, মোনা যখন গাঁয়ে আর থাকতে চাইছে না তখন ওকে নিয়ে কলকাতায় যাও না কেন? এখানে বেচারার একঘেয়ে লাগছে।
যেতে তো হবেই। ছুটি ফুরিয়ে এল।
দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাও।
মোনা তোমাকে জপিয়েছে বুঝি? তোমাদের এত ভাব হল কী করে বল তো! আগে তো ও তোমাদের দিকে ফিরেও তাকাত না।
ভাব হয়েছে বটে, তবে ভালবাসাটা এখনও হয়নি।
কী করে হল?
হয়ে গেল। কারও কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে হবে তো!
ও, তাও তো বটে। মোন তোমার কাধটাই বেছে নিয়েছে তাহলে?
ওরকমই ধরে নাও না কেন?
পারুল আর আমার ঘটনাটা তোমাকে মোনা বলল কেন ঠাকরোন? ও কি চাইছে ব্যাপারটা চাউর হোক?
দুঃখে দুঃখে বলে ফেলেছিল। ভয় নেই, কথাটা পাঁচকান হবে না।
হলেই বা আমার কী বল! আমার কিছু আর যায় আসে না। কিন্তু পারুলের সম্পর্কে রটনা হলে আমার খারাপ লাগবে। ওর তো দোষ ছিল না!
একেবারেই ছিল না?
না ঠাকরোন।
আমি বিশ্বাস করি না।
কেন করো না?
আমিও মেয়েমানুষ বলেই।
অমল হাসছিল। বলল, দুনিয়ার সব ঘটনাই মানুষ নিজের নিজের মতো ব্যাখ্যা করে নেয়।
তুমি তোমার মতো বুঝেছ, আমি আমার মতো করে বুঝে নিয়েছি।
ঠাকরোন, আলোচনাটা আজ থাক। ঘটনাটা তো সুখের স্মৃতি নয়। যত ঘাঁটব তত মনটা খারাপ হবে।
তোমার বাপু, সবটাতেই বড় বাড়াবাড়ি। কবে কী হয়েছে তাই নিয়ে একেবারে দুঃখদাস হয়ে বসে আছ, বউকে ভালবাসতে পারলে না, সংসার মন দিলে না। নিজের দোষ ভেবে মনমরা হয়ে থাক। এমন কী ঘটনা যে আউল-বাউল হয়ে যাচ্ছ?
মাথা নেড়ে অমল বলে, আউল-বাউল নই, দুঃখদাসও নই।
তাহলে আবার কী! ওই যে বলেছিলাম, মনে আছে?
কী বলেছিলে?
বর বউ এক বিছানায় শোও এখন থেকে।
তাতেই হবে?
শুয়েই দেখো না। আর কলকাতায় যাও।
অমল হেসে ফেলে বলে, তোমার প্রেসক্রিপশন বড্ড সহজ-সরল। আমাদের সমস্যাটাও যদি তাই। হত।
আচ্ছা মশাই, বউকে ভালবাসা কি এতই কঠিন কাজ?
ভালবাসা কখন কঠিন হয় জান?
কখন?
যখন ভালবাসা জিনিসটাই বুকের ভিতর থেকে উবে যায়। তুমি বউকে ভালবাসার কথা বলছ, আমার যে কোনও কিছুর প্রতিই আর ভালবাসা নেই। বেঁচে থাকাটাও আর ভাল লাগে না।
বলে কী গো! শুধুই পারুল! আর কিছু নয়?
মৃদু হেসে অমল বলে, না ঠাকরোন, পারুলও নয়।
তবে তোমাকে খেলো কে?
সেইটেই তো ভাবি।
আর ভাবনা কাজী হয়ে বসে থেকো না। মোনাকে নিয়ে কলকাতায় যাও।
