অমল উঠতে উঠতে বলল, তোমার বাজারহাট বা দোকানপাটের জিনিস লাগবে কি না দেখো তো। লাগলে বোলো, একটা পাক দিয়ে গিয়ে নিয়ে আসবখন।
তোমাকে আর কাজ দেখাতে হবে না। ঘরে গিয়ে লেপচাপা দিয়ে বসে থাকো। যা ঠান্ডা পড়েছে আজ!
এই ঠান্ডায় তুমিও আর বসে থাকবে না।
বউদি হিহি করে হেসে বলল, মেয়েমানুষের দুঃখু অত দেখতে নেই গো পুরুষমানুষের। ওতে যে পাপ হয়।
কেন, পাপ হয় কেন?
হবে না? মেয়েমানুষের দুঃখ বুঝলে পুরুষমানুষের পুরুষত্ব থাকে নাকি?
ঠাট্টা করছ?
না গো, সত্যি কথাই বললুম। ভেবে দেখলেই বুঝবে।
তুমি একটু নারীবাদী আছ কিন্তু ঠাকরোন!
আমি নারীবাদী হলে এ বাড়ির কারও আর খাওয়াপরা জুটত না, বুঝলে!
নারীবাদীদের দোষ কী জান?
কী?
তারা খোঁটা দেবে, আবার সেবা-টেবাও করবে। দুরকম চলে না ঠাকরোন। একরকম হও।
উরেব্বাস! তা হলে তো সংসার ভেসে যাবে গো।
ওইজন্যই তোমরা ঠিকঠাক নারীবাদী হতে পারলে না।
অমল ধীর পদক্ষেপে দোতলায় উঠল। তারপর নিজের ঘরটিতে এসে দরজা ভেজিয়ে দিয়ে হাঁটু অবধি লেপটা টেনে আধশোয়া হল। জানালা দরজা বন্ধ থাকায় ঘরটা বেশ গরম। যেন রুম হিটার চলছে।
কিছুক্ষণ পর দরজায় টক টক শব্দ হল।
এসো ঠাকরোন, তোমাকে আর ভদ্রতা করে নক করতে হবে না।
বউদি একগাল হেসে ঘরে ঢুকে বলল, ছোটদের কাছেও কত কী শেখার আছে আমাদের!
কে আবার তোমাকে কী শেখাল?
এই যে দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢোকা এটা আমাকে সোহাগ শিখিয়েছে। বলেছে, এটা অভ্যাস করে নিলে কোথাও অপ্রস্তুত হতে হবে না।
তা বিলিতি কায়দা রপ্ত করছ?
তা বাপু, শিক্ষাটা খারাপ নয় কিন্তু। আজকাল তোমার দাদা ঘরে থাকলেও আমি দরজায় টোকা দিয়ে ঘরে ঢুকি। প্রথম প্রথম কায়দা দেখে হাসত। আজকাল দেখি নিজেও তাই করছে।
হাঃ হাঃ করে হাসল অমল, এইসব হচ্ছে তা হলে আজকাল?
তাই ভাই, ভাল জিনিসকে ভাল বলতেই হয়।
হাতে চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে বউদি চেয়ার বসে বলল, সাঁজাল দিতে একটু দেরি হল, নইলে আরও আগে তোমাকে চা দিতে পারতাম।
সন্ধের পর চা খাওয়া তো ভুলেই গেছি। প্রায়ই পার্টি বা বন্ধু বা কলিগের বাড়িতে নেমন্তন্ন থাকে। সেখানে তো আর চা দেয় না।
জানি বাপু, জানি। মদ খাও তো!
হ্যাঁ ঠাকরোন।
তাই মাঝে মাঝে মদের গন্ধ পাই। এখানেও তো খাও, তাই না? খাই ঠাকরোন। বাজে অভ্যাস।
তা বাপু, তোমার দাদাও কখনও-সখনও খায়। আমি তার জন্য বকাঝকা করি না। শুধু চোখ পাকিয়ে তাকাই।
তাতেই ঠান্ডা হয়ে যায় দাদা?
হয় ভাই। জানে তো, বউ ছাড়া গতি নেই। বউ বিগড়োলে তার দুনিয়া অন্ধকার।
বেশ আছ তোমরা।
সে তো আছি। কিন্তু তুমি বেশ নেই কেন? তোমার বউটা খারাপ নয়, মেয়েটা ভাল, ছেলেটা ভাল, তবে তোমাদের পট খায় না কেন বলো তো!
ঠিক বুঝতে পারি না ঠাকরোন।
ভাল করে ভাবো তো একটু। তোমার মতো এমন ভাল একজন মানুষের সংসারে অশান্তি থাকার কথা নয়।
ভালমানুষ কথাটা শুনেই কেমন যেন বিকল হয়ে গেল অমলের মনটা। চায়ে চুমুক দিয়ে তেতো মুখ করে বলল, ঠাকরোন, আমার মধ্যে যেটুকু ভাল বলে তোমার মনে হয় তা হল মেধা। আমি ছাত্র ভাল ছিলাম, ঠিক কথা। কিন্তু মেধা আর চরিত্র এক নয়।
এখন নিজের চরিত্র নিয়ে কথা তুলবে নাকি?
নিজের চরিত্র সম্পর্কে যে আমার কোনও বিশ্বাস নেই। যখন ছোট ছিলাম তখন বেশ ভালমানুষ ছিলাম। দুষ্টুমি নষ্টামি করতাম না, মিথ্যে কথা বলতাম না, মা বাবার বাধ্য ছেলে ছিলাম। কিন্তু সমস্যা কখন দেখা দিল জানো?
কখন?
যখন ক্লাসে ফার্স্ট হতে শুরু করলাম। অনেক নম্বর পেতাম, মাস্টারমশাইরা প্রকাশ্যে প্রশংসা শুরু করলেন, পাঁচজন ধন্য ধন্য করতে লাগল, তখনই একদিন অহংকার চলে এল। খুব সূক্ষ্ম ব্যাপার, বুঝলে? বাইরের লোক ততটা টের পেত না। কিন্তু মনে মনে আমি ক্লাসমেটদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা করুণা করতে শুরু করি। কোনও মাস্টারমশাই কখনও কিছু ভুল করলে মনে মনে অনুকম্পা বোধ করতাম, অশ্রদ্ধার ভাব আসত। আমার বাবা যে ইংরিজিতে এম এ পাশ তা জানো?
জানব না কেন?
আমি বাবাকেও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করি। বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, যত বড় মূর্খ ছেলে তত বড় লেকচার। আমারও ঠিক তাই হয়েছিল। বাবা, মা, দাদা এদের কাউকে তেমন পাত্তা না দেওয়ার মনোভাব এসে গেল।
তাতে কী? ওরকম তো হতেই পারে। এখন তো আর তুমি অহংকারী নও!
অনেক ঠেকে শিখতে হয়েছে যে, অহংকার করার মতো আমার কিছুই নেই। অধীত বিদ্যা আমাকে জীবনে শান্তি বা স্বস্তি কিছুই দেয়নি। এমন কী যৌবন বয়সে আমার পদস্খলনও ঠেকাতে পারেনি। আমি কীসের ভাল ছেলে ঠাকরোন?
দেখ কাণ্ড! নিজের নিন্দে শুরু করে দিলে যে!
সব তো জানো না ঠাকরোন। জানলে আমাকে ঘেন্না করতে।
কী জানি না বলো তো?
সেটা তো তোমাকে বলা যায় না। আমার অধঃপতন যে কবে, কীভাবে শুরু হয়েছিল তা আমিই শুধু জানি।
আচ্ছা ভাই, যে নিজের সম্পর্কে এ কথা বলতে পারে তাকে কি খারাপ বলা যায়?
অমল হাসল, তোমার চোখে খারাপ না হলেই কি আর আমি ভাল?
অত মনস্তাপের দরকার নেই। আমি সব জানি। জেনেও বলছি, তুমি মোটেই খারাপ নও।
একটু অবাক হয়ে অমল বলে, জানো?
হ্যাঁ জানি। কিন্তু তোমাকে বলি বাপু, সব কথা কি সকলের কাছে বলতে হয়? পাত্রভেদ নেই? কাক তো এঁটো ছড়ায়।
তুমি কী জানো ঠাকরোন?
