সন্ধেবেলাতেই কেন যে মশারা এমন রক্তপাগল হয়ে ওঠে কে জানে বাবা! এটাই কি ওদের ডিনারটাইম? রাতে উৎপাত অনেক কমে যায়। কিন্তু সন্ধেবেলায় ওদের ণত্ব-ষত্ব জ্ঞান থাকে না, তখন প্রাণ তুচ্ছ করে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বউদি ডাকছে, ওঠো! মশায় যে হেঁকে ধরেছে একেবারে। ঘরে গিয়ে বোসো, ধোঁয়া দিয়ে এসেছি।
অমল একটু হাসল, ওদের জীবনও তো নিষ্কণ্টক নয় ঠাকরোন।
কে? কাদের কথা বলছ?
মশাদের কথা। প্রাণ হাতে করেই তো খায়।
আহা, মশাদের জন্য যে দরদ উথলে উঠছে দেখছি! গান্ধীবাবা হলে নাকি?
আচ্ছা, আজ বাড়িটা এত ফাঁকা কেন বলো তো! কোথায় গেল সবাই। তুমিও তো বাড়ি ছিলে না!
আমি গিয়েছিলুম একটু শীতলাবাড়িতে। বিষ্ণুর মায়ের দয়া হয়েছিল সেই কবে। পুজোটা আর দেওয়া হয়নি এতদিন। দিয়ে এলুম।
বেশ করেছ। জলবসন্তের চিকিৎসা নেই, তা জানো? পুজো দিলেও একুশ দিনে সারে, না দিলেও তাই।
আচ্ছা, আর নাস্তিকপানা করতে হবে না। ঘরে যাও, চা আনছি।
তুমিই সবসময়ে চা দাও, খাবার দাও। কেন বলো তো? আর সবাই কোথায় থাকে?
কেন গো, বউয়ের হাতে ছাড়া চা খাবার পছন্দ নয় বুঝি!
আহা, তা নয়। এটা একটা জয়েন্ট ফ্যামিলি, সকলেরই তো কিছু না কিছু করা উচিত।
বউদি একটা শ্বাস ফেলে বলে, কী করব বলো! আমি তো বাড়ির বড়বউ। বড়বউ হলে দায়িত্বও সে বড়।
ওটা কথা নয় ঠাকরোন, তোমাকে আমি সারাদিন কাজ করতেই দেখি, একজন এত পরিশ্রম করবে কেন?
একটু হেসে বউদি বলে, আমি খাটিয়ে পিটিয়ে মেয়ে হিসেবেই তৈরি হয়েছি যে! বিবিয়ানি করার জন্যে তো নয়। পেটে বিদ্যে বা অন্য গুণ না থাকলে যে গতর দিয়ে পুষিয়ে দিতেই হয় ভাই। মেয়ে হয়ে না জন্মালে বুঝবে না।
তা নয় ঠাকরোন। লজিকটা ভুলে ভরা। তুমি যদি দশভুজা হয়ে সব কাজে ঝাঁপিয়ে না-পড়ার অভ্যাস করো, তা হলে দেখবে সবাই যে যার নিজের কাজ করে নিতে শুরু করবে। তুমি করো বলেই অন্যেরা গা বাঁচিয়ে চলে।
সে গুড়ে বালি। উঠোনের কোণে যদি ঘটিটা পড়ে থাকে, বাড়ির সবাই ওর আশপাশ দিয়ে শতেকবার হেঁটে যাবে, কেউ তুলে রাখবে না। আমি না তুললে বাইরের লোক এসে নিয়ে চলে যাবে।
অভ্যাস তুমিই খারাপ করেছ।
দাসী হয়ে জন্মেছি যে ভাই, দাসত্ব না করে উপায় আছে? তবে সবাইকে দোষ দিয়ে লাভ নেই।
মোনাও তো কিছু করতে পারে।
সে দুদিনের জন্য বেড়াতে এসেছে, তাকে কেন ঘানিগাছে জুড়তে যাব বলো! তা ছাড়া সব সংসারেরই কাজকর্মের আলাদা রকম ধাঁচ থাকে। সে অত বুঝবে না। ছোঁয়াছুঁয়ি, পয়পরিষ্কার ওসব কি ওর অভ্যাস আছে, বলো! আর সন্ধ্যাকে তো দেখছ, বেচারা দিনরাত ব্যবসার পেছনে খেটে মুখে রক্ত তুলছে। তাই ওকে আমি সংসারে জড়াই না, দুঃখী মেয়ে তো!
ব্যস, সব জল করে বুঝিয়ে দিলে! এগুলো কোনও যুক্তি নয় ঠাকরোন, এসব হল অজুহাত।
বেশ, না হয় তাই হল। কিন্তু এই বাঘা শীতে তুমি খোলা উঠোনটার মধ্যে বসে আছ কী করে বলল তো! তোমার বউ বাড়ি থাকলে বকুনি দিত।
অমল ম্লান হেসে বলে, তা হলে তো বর্তে যেতুম। সে আমাকে ততটা লক্ষ করে না ঠাকরোন।
আর বউয়ের নিন্দে করতে হবে না। ঘরে গিয়ে ঢাকাঁচাপা দিয়ে বোসো। ঘরের জানালা দরজা হুট করে খুলো না, এ সময়ে মশা ঢোকে।
মোনা কোথায় গেছে? এখানে তো তার যাওয়ার জায়গা নেই! কারও সঙ্গে মেশেও তো না।
রতনের সঙ্গে মোটরবাইকে চেপে বর্ধমানে গেছে।
মোটরবাইকে! রতনের সঙ্গে।
অত অবাক হওয়ার কী আছে?
এ তো জলে ভাসে শিলা! রতনের সঙ্গে তার ভাব হল কবে?
বউদি মুখ টিপে হেসে বলে, থাকতে থাকতে হয়েছে। ভাব না হওয়ার কথা নাকি!
কিছু বললেই তো বলবে বউয়ের নিন্দে করছি। আমার মুখে মোনার নিন্দে তো তুমি মোটেই পছন্দ করো না।
তাই কী হয় ভাই? গাঁয়ের মেয়েরা তো নিন্দে দিয়ে মেখেই ভাত খায়, জানো না? নিন্দেমন্দ হল আমাদের থিয়েটার বায়স্কোপের মতো। তবে কি না তুমি তো আর পাঁচটা মানুষের মতো নও। তুমি ওসব হ্যাঁন্যাতা জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাবে কেন?
একটু হেসে অমল বলে, আমি কিন্তু আমার নিজেরও নিন্দে করি।
খুব খারাপ করো। ওরকম করা ভাল নয়।
তোমরা যেরকম ভাবো আমাকে, সেরকম আর হতে পারলাম কই?
অনেক হয়েছ ঠাকুরপো, অনেক হয়েছ। কটা লোক তোমার মতো হয়েছে বলো তো!
গাছে তুলো না, ঠাকরোন, গাছে তুলো না। একগাদা লেখাপড়া করে লম্বা মাইনের চাকরি করছি এই তো! এটা কিন্তু অনেক হওয়া নয়।
আমাকে আর বোঝাতে হবে না। এখন কি তোমার চশমা পরে নিয়ে তোমাকে বিচার করতে হবে নাকি? আমারও তো একটা বিচার আছে!
বরাবর তুমি আমাকে একটু অন্য চোখে দেখ, আমি জানি। দেখাটা কিন্তু ভুলও হতে পারে।
সেটা আমি বুঝব। অনেক ঠান্ডা লাগিয়েছ কিন্তু, এর পর জ্বরজারি বাধিয়ে বসবে। ঘরে যাও। এসে দেখি, অকাতরে ঠান্ডার মধ্যে পড়ে পড়ে ঘুমোচ্ছ, মশা ঘেঁকে ধরেছে। এমন মায়া হল। যেন কেউ নেই তোমার।
কেউ নেই-ই তো!
ফের ওসব কথা?
অমল হাসল। বলল, ফাঁকা বাড়িতে চুপচাপ একা বসেছিলাম। বসে বসে ঢুলুনি পেয়ে গেল।
হ্যাঁ, আজ তোমাকে একটু ফাঁকাতেই থাকতে হয়েছে বটে। সন্ধ্যা গেছে আদায় উশুল করতে। বাবা আজ বড়শুলে গেছেন নিমাইকাকার বাড়ি। রাতে হয়তো ফিরবেন না। সোহাগ দুপুরে খেয়েই বেরিয়েছে পান্নার বাড়ি যাবে বলে। দুজনের তো কথার শেষ নেই। আর তোমার দাদাকে তো জানোই। ঘরের খেয়ে কোন বনের মোষ তাড়াতে বেরিয়েছেন কে জানে!
