মনের ভূত ধীরেনকেও কি কম খেয়েছে! আজও সেই ভরা বর্ষার ছাইরঙা সকালটার দৃশ্য পট করে চোখের সামনে বায়স্কোপের মতো ভেসে ওঠে। ডবকা সেই যুবতীর শবদেহ কাঁধে নিয়ে এক বুক জল ভেঙে পিছল উঠোন পেরোচ্ছে, গলায় তারের ফাঁস। ফাঁসের প্রান্ত মিদ্দারের হাতে ধরা। এক চুল এদিক ওদিক হলেই তারের ফাঁস গলা কেটে বসে যাবে। উরে বাবা, সে কী একটা সময় যাচ্ছিল তখন!
মিদ্দার তার গুরুই ছিল একরকম। নিরীহ, ঝঞ্জাটহীন গুণী এক মানুষ নিজের কাজে মজে থাকত। তাঁতির যেমন এঁড়ে গোরু, মিদ্দারের পোয়ের তেমনি কাল হল যুবতী বউ। আর তা থেকে কত কী পাকিয়ে উঠল। সাদামাটা সম্পর্ক ছড়িয়ে গেল জটিল কুটিল নানা খানাখন্দে।
মিদ্দারকে মেরে ফেলেছিল বটে, কিন্তু সে তো ইচ্ছে করে নয়! না মারলে মরতে হত। গৌরদা তাকে বুঝিয়েছিল, ওতে পাপ নেই, আত্মরক্ষার জন্য নরহত্যা করলে পেনাল কোডে সাজাও হয় না। তবু মন কি মানে! কৃতকর্মের জন্য আজও বুক টনটন করে বড়। একা হলেই যেন মিদ্দারের ভূত কাছেপিঠে চলে আসে। ভয় করে, বড্ড ভয় করে।
তখন, সেই খুনের ঘটনার পর তার ঘুম, খিদে সব ছুট হয়ে দিয়েছিল। সারাদিন পাগল পাগল অবস্থা। এই হাসে, এই কাঁদে। আর তখন চারদিকে যেন ভুতুড়ে এক জাল তাকে ঘিরে থাকত। রাতবিরেতে মিদ্দার এসে হানা দিত। দেখা যেত না, কথাও কইত না, কিন্তু তাকে খুব টের পেত ধীরেন।
অমন নিরীহ, ভাল মানুষটা কী থেকে কী হয়ে গিয়েছিল!
মনের ভূতে খায় বইকী বাবা, খুব খায়। মনের ভূতই তো খাচ্ছে আমাদের।
অমল একটু কেতরে হেলে পড়ে আছে ইজিচেয়ারে। কথা কইল না। চোখ চাওয়া, কিন্তু সে চোখের দৃষ্টি কোথায় চলে গেছে কে জানে!
ধীরেন দু-একবার গলা খাঁকারি দিল। বুঝল অমল আর বাইরের জগৎটায় নেই। নিজের ভিতরে ঢুকে অন্ধিসন্ধি খুঁজে বেড়াচ্ছে কিছু। ধীরেন এসব বুঝতে পারে।
গৌরদার ছোট মেয়ে পারুলের সঙ্গে ভাব ভালবাসা ছিল ছেলেটার। সেই বৃত্তান্ত সবাই জানে। তা বিশ-বাইশ বছরের পুরনো কথা। তখন সারা গাঁয়ে বেশ মুখরোচক প্রসঙ্গ ছিল সেটা। তবে নিলেমন্দ হয়নি তেমন। কারণ ছেলেটি ছিল রত্ন, আর মেয়েটিও ছিল ডাকের সুন্দরী। তার ওপর গৌরহরি ছিলেন গাঁয়ের মাথা, মহিম রায়ও পণ্ডিত মানুষ। সবাই ধরে নিয়েছিল বিয়েটা হবেই।
সেই বিয়ে যে ফসকাতে পারে সেটাই অষ্টম আশ্চর্য! এমন হওয়ার কথাই নয়। গৌরহরিকে ব্যাপারটা নিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেছিল ধীরেন।
দাদা, পারুলের বিয়েটা অন্য জায়গায় দিচ্ছেন যে!
বিয়ে জিনিসটাই যে ওইরকম রে, কার যে কার সঙ্গে ঘাট বাঁধা তা কে বলবে!
তা অবিশ্যি ঠিক। তা পারুল কান্নাকাটি করছে না?
আরে সে কাঁদবে কী! তার ইচ্ছেতেই তো হচ্ছে।
ধীরেন প্রেম ভালবাসার রহস্য যে খুব ভাল বোঝে তা নয়। শুধু বোঝে, ওসব, বিয়ে পর্যন্ত গড়ায়, তারপর থমকে যায়। তার নিজের জীবনে তাও হয়নি। বিয়ের রাত থেকেই ফোঁসফোঁস শুরু করেছিল। কাজেই ভাব ভালবাসা নিয়ে তার উচ্চবাচ্য করার কিছু নেই।
কিন্তু পারুল নিজের ইচ্ছেয় অন্য জায়গায় বিয়ে বসছে এটা যেন তার কাছে একটু কেমনধারা মনে হয়েছিল। এরকম তো হওয়ার কথা নয়।
তা পারুলের বিয়ে বেশ ঘটা করেই হল। গাঁ দেশে এমন বিয়ে দেখা ভাগ্যের কথা। গৌরদা টাকাও ঢেলেছিলেন জলের মতো। সেই বিয়েতে বারো পিস মাছ খেয়েছিল ধীরেন, খুব মনে আছে। না, পারুলের হাসি হাসি মুখখানায় কোনও দুঃখের চিহ্ন খুঁজে পায়নি ধীরেন। হাত বাড়িয়ে ধীরেনের হাত থেকে যখন খবরের কাগজে মোড়া শস্তার তাঁতের শাড়িটা উপহার নিচ্ছিল তখনও পারুলের মুখখানা ভাল করে দেখেছিল ধীরেন। বেশ ঢলটলে মুখ, তাতে হাসির মিশেল, বিরহের ভাব-টাব নেই।
বছর না ঘুরতেই অমলের বিয়ে। তা তাতেও ধীরেন হাজির ছিল। বরযাত্রী যেতে বলেনি বটে, কিন্তু বউভাতে গাঁ ঝেটিয়ে নেমন্তন্ন খেয়েছিল লোকে। অমলকে তখন বেশ ভাল করেই দেখেছিল ধীরেন। গরদের পাঞ্জাবি আর ধাক্কাপাড়ের ধুতি পরে অতিথিদের দেখভাল করছিল। মুখে হাসি ছিল, কিন্তু খুশিটা ছিল না যেন। খুশিটা আজও নেই।
অঙ্কটা মেলেনি ধীরেনের। মেয়ে জাতটাই নিমকহারাম বললে এক রকমের মেলে, কিন্তু কথাটা সত্যি হয় না। কোথাও একটা খিঁচ থেকে যায়।
ধীরেন দেখল, ইজিচেয়ারে কেতরে শুয়ে অমল ঘুমিয়ে পড়েছে, কোলে উপুড় করা বই, রাজ্যের মশা ঝাঁক বেঁধে উড়ছে মাথার ওপরে। ধীরেন চোরের মতো উঠে নিঃশব্দে বেরিয়ে পড়ল। ছোকরা সেই প্রেমের, ফেরেই আজও পড়ে আছে কি না কে জানে! বইয়ে কেতাবে ওরকম হয়-টয় বটে, কিন্তু ধীরেনের দুনিয়ায় ওসব এতকাল টিকে থাকতে দেখেনি কিনা। প্রেম একটা ফুসমন্তর বই তো নয়, হুস বলতেই উড়ে যায়। ফঙ্গবেনে জিনিস। খিদে তেষ্টা বাহ্যে পেচ্ছাপের মতোও স্থায়ী জিনিস নয়। একটা জীবনে প্রেম অনেকবার পাশ ফেরে।
দিনের আলো মরে এলে অসুবিধেটা বাড়ে। চোখে এমন ঝাপসা একটা ভাব হয় যে, চলাফেরায় আজকাল মুশকিল হচ্ছে। চোখ কাটানোর পাকা তারিখ এখনও পাওয়া যায়নি। সামনের মাসে হতে পারে বলে খবর একটা পাওয়া গেছে। পরের দয়া, জোর তো নেই। তবু এই দয়াধর্ম, সেবা-টেবা পতিতোদ্ধারে বড় মানুষরা যে একটু আধটু কাজকর্ম করে তাতেই বাঁচোয়া।
