ধীরেন কথা শুনতে ভালবাসে। দোকানপাটে, রাস্তায় ঘাটে, চেনা অচেনা লোকের কথা মনে দিয়ে শোনে সে। বেশির ভাগই ফেলে দিতে হয়, দুটো চারটে থাকে, ভদ্রলোক হোক বা ছোটলোক, লেখাপড়া জানা হোক বা মুখ-সুখই হোক এক একজন এমন মোক্ষম কথা বলে বসে যে আক্কেল গুড়ুম হুয়ে যায়। ইরেব্বাস! কথা তো নয়, যেন কুড়ুল।
তার ঘোরাফেরার চৌহদ্দি এই গাঁয়ের মধ্যেই। এক মুঠো তো জায়গা। আর লোকজনই বা কী এমন! ঘুরেফিরে সেই যোদো-মোধো-রেমো। তবু এইটুকু চৌহদ্দির মধ্যেই নিত্যনতুন কথা ফুট কাটছে। ভাবে, একখানা খাতা কিনে কথাগুলো লিখে রাখলে হয়। ভাবাই অবশ্য সার, হয়ে ওঠে না।
এই সেদিন বিকেলের দিকটায় গিয়ে পড়েছিল মহিম রায়ের বাড়ি। মহিমদের বাড়ি সেদিন ভারী সুনসান। জনমনিষ্যি নেই। শুধু কুকুরটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে আর ইজিচেয়ারে আধশোয়া হয়ে একখানা বই পড়ছে অমল। ধীরেনকে দেখে কেউ খুশি হয় না এটা ধীরেন জানে। কিন্তু কী আশ্চর্য সে যখন মহিমার এই বিদ্বান ছেলেটিকে দেখে সসংকোচে ফিরে আসবে বলে মুখ ঘুরিয়েছে তখন অমল ভারী খাতির করে বলল, আরে ধীরেনকাকা না! বসুন।
বসার জন্য চেয়ার বা মোড়া কিছু ছিল না ধারে কাছে। তাই ইতিউতি চেয়ে ধীরেন যখন দাওয়ার এক ধারে বসতে যাচ্ছিল তখন অমল বলল, করেন কী! দাঁড়ান চেয়ার এনে দিচ্ছি।
বিদ্বান মানুষ অমল, তার বাবার ঘর থেকে চেয়ার এনে বসতে দিল তাকে। বড় সংকোচ হচ্ছিল।
বই পড়ছিলে বাবা, এসে রসভঙ্গ করলুম।
অমল মুখটা তেতো করে বলে, দুর! বই পড়ে কি সময় কাটে! লেখাপড়া করে লোকে মুখ্যুই হয়।
বলে কী ছোকরা! কথাটা ভারী অদ্ভুত শোনাল।
বেশ বাবা, ওকথা বলছ কেন? লেখাপড়া তো ভাল জিনিস!
কাকা, লেখাপড়া হল ধার করা জিনিস। অন্যের চিন্তাভাবনার জঞ্জাল টেনে এনে নিজের মাথায় বোঝাই করা। লেখাপড়া করে তো দেখলাম, ওতে কিছু হয় না!
এ কথাটা ভারী নতুন শোনাল ধীরেনের কানে। লেখাপড়ার মেলা গুণগানই তো করে লোকে। তা হলে লেখাপড়া জানা এ ছেলেটা উলটো কথা কয় কেন?
ধীরেন ভারী আগ্রহী হয়ে জিজ্ঞেস করে, লেখাপড়া করে কী হয় না বাবা?
অমল একটা আলস্যের আড়মোড়া ভেঙে বলে, মানুষ তো কত কী জানল বুঝল, কত কেরদানিই দেখাল, কিন্তু শেষ অবধি নিজের মনের কাছে জব্দ হয়ে রইল। আপনি ভগবান মানেন কাকা?
এ কথায় একটু ফাঁপরে পড়ে গেল ধীরেন। আমতা আমতা করে বলল, তা মানি বইকী বাবা, একটু আধটু মানি। তবে তেমন মাথা ঘামাই না।
ভগবান কাকে বলে জানেন কাকা?
ধীরেন আবার ডুবজলে। এসব কঠিন প্রশ্নের জবাব কি তার জানা থাকার কথা?
অমল অবশ্য তার জবাবের জন্য অপেক্ষা করল না, বলল, মনই হচ্ছে ভগবান। ওই মনই ভগবান-টগবান বানায়, আবার মনই ভগবানকে নাকচ করে দেয়। মনের মতো বন্ধু হয় না, আবার অমন শত্ৰু কেউ নেই।
বাঃ, এ যে বেশ কাজের কথা হচ্ছে! ধীরেন ভারী আপ্লুত হয়ে নড়েচড়ে বসল, একেই তো এই মহা বিদ্বান মানুষটি তার সঙ্গে যেচে কথা কইছে বলে সে বর্তে যাচ্ছে। তার ওপর কথাগুলো কইছেও ভারী ভাল। টুকে রাখার মতোই কথা সব।
ধীরে হেঁ হেঁ করে হেসে বলে, বড্ড ভাল বলেছ বাবা।
ভাল-মন্দ যে ধীরেন বোঝে এমন নয়। তবে সে কথা শুনতে ভালবাসে। যেসব কথা শুনতে ভাল সেগুলোই তার কাছে ভাল কথা।
অমলকে আজ কথায় পেয়েছে। ধীরেন কাষ্ঠ যে একটা মনিষ্যির মতো মনিষ্যিই নয় সে কথা ভুলে গিয়ে কথা কয়ে যাচ্ছে। লক্ষণটা চেনে ধীরেন এক এক সময়ে মানুষ মনের ভার নামাতে দেয়ালের সঙ্গেও কথা কয়। তা ধীরেন দেয়াল ছাড়া আর কী!
বুঝলেন কাকা, একটা লোককে চিনতুম। ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যানসেলর ছিলেন, একগাদা সরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান বা মেম্বার ছিলেন, নামের পাশে বিরাট বিলিতি ডিগ্রি। সাউথ ক্যালকাটায় বিরাট বাড়ি, অগাধ টাকা কিছুর অভাব নেই। দেখে মনে হত দুনিয়াটা যেন ওঁর পকেটে। শেষে কী হল জানেন?
ধীরেন বাঁয়া কোলে করে বসে আছে। প্রতিধ্বনি করল, কী হল?
বুড়ো বয়সে তাকে যখন দেখলুম বউ মারা গেছে, ছেলে বিদেশে, চাকরি থেকে রিটায়ার করে লোকটা একরকম নিষ্কর্মা। কিছু লেকচারে ডাকাডাকি হয়, কিছু মিটিং-টিটিং থাকে বটে, কিন্তু বড্ড ফাঁকা হয়ে গেছে মানুষটা। একদিন আমাকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন, আচ্ছা তুমি ভূতের গল্প জানো? বলো তো একটা শুনি। আমার আজকাল বড্ড ভূতের গল্প শোনার ইচ্ছে হয়।
ভূতের গল্প?
তাই তো বলছি কাকা। এত লেখাপড়া জানা মানুষ, কিন্তু নিজের একা বোকা ভাবটা কাটাতে পারছেন না। শরীরটা আছে, কিন্তু মনটা অথর্ব হয়ে পড়েছে। ভূতের গল্প শুনে ভারী খুশি, আমাকে আর ছাড়তেই চান না। শেষে আমাকে বললেন, ওহে, এত বড় বাড়িটা বড্ড হাঁ হাঁ করে। আমার তো জন নেই। একটা ভাল ফ্যামিলিতে পেয়িংগেস্ট হিসেবে যদি থাকতে চাই ব্যবস্থা করতে পারবে? আর কিছু না হোক, পাঁচ জনের মধ্যে তো থাকা যাবে।
বলো কী?
তাই তো বলছি কাকা, ওসব বইপড়া বিদ্যে দিয়ে জীবনে সত্যিকারের কিছু হয় না। সেই বিরাট মানুষটা শেষ অবধি এক বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে জুটলেন। সেখানেই মারা যান। ঘটনাটা আমাকে জোর একটা ধাক্কা দিয়েছিল।
তা তো দেবেই।
সেই থেকেই আমার বড় ভাবনা হয়। মানুষ এত শেখে, এত তড়পায়। এত কাজকর্ম করে। কিন্তু শেষ অবধি তাকে তার মনের ভূত ভয় দেখাতে থাকে। মনই তাকে খায়। মনের সঙ্গে আজও পেরে উঠল না মানুষ।
