ওঃ।
আমি তখন বললাম আমার দাদা।
গাঁয়ে এসে কি গেঁয়ো হয়ে যাচ্ছে সুমন? এত সংকোচ, লজ্জা, বুক কাঁপা, দুর! দুর! এরকম মেয়ে তো কতই তার বগলের তলা দিয়ে পার হয়ে গেছে।
কিন্তু নিজের মনে এত দেমাক করেও চৌকাঠটা ডিঙোনো যাচ্ছিল না।
তোমার পান্নাদি নাচে বুঝি?
খুব ভাল নাচে। সবাই বলে কলকাতায় গেলে নাম হবে।
তোমাদের শেখায় না কেন?
বলে দুর, আমিই ভাল করে শিখিনি, তোদের কী শেখাব।
ওঃ।
আচ্ছা, আপনি তো খুব ভাল গাইতে পারেন, তাই না?
ওসব বাথরুম সং।
আমি শুনেছি। ঠিক হেমন্তর মতো গলা।
দুর। কোথায় হেমন্ত, কোথায় আমি!
আমাদের তো বেশ লাগে। কাল সন্ধেবেলায় গাইছিলেন, আমার মা বলল, কী সুন্দর যে গায় ছেলেটা। আমরা টিভি বন্ধ করে দিয়ে আপনার গান শুনছিলাম!
এ মা, ছিঃ ছিঃ। কী কাণ্ড!
আপনার ক্যাসেট নেই?
দুর পাগল! কে আমার ক্যাসেট করবে?
দেখবেন আপনি ঠিক একদিন প্লে ব্যাক করবেন।
ওরে বাবা! মস্ত সার্টিফিকেট দিয়ে ফেললে যে!
দেখবেন।
মেয়েটাকে বেশ লাগল সুমনের। আড় ভেঙে দিল, আর উঁকিঝুঁকি দেবে না, চোখ মটকাবে না। ওসব ভাল লাগে না সুমনের। তার চেয়ে সোজা স্পষ্ট সম্পর্ক অনেক ভাল।
কিন্তু ব্যাপারটা একটু ঘোরালো হয়ে দাঁড়াল তার বাবা ফেরার পর।
বাসন্তী রাতে তার ঘরে এসে বলল, হ্যাঁ বাবা, এই হিমি মেয়েটা নাকি তোমাকে আজ দুপুরে এসে জ্বালাতন করে গেছে?
জ্বালাতন! বলে হেসে ফেলল সে, না জ্বালাতন করেনি। গল্প করতে এসেছিল।
আমরা বাড়িতে নেই, এ সময়ে আসে কেউ? তোমার কাঁচা ঘুমটা মাটি করে গেছে তো!
আরে না না। আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।
মেয়েটার একটু গায়ে পড়া স্বভাব আছে বাবা। কিছু মনে কোরো না।
কিছু মনে করিনি। ও তো আমার বন্ধু হয়ে গেছে।
ভারী অবাক হয়ে বাসন্তী বলে, বন্ধু!
হ্যাঁ। মেয়েটা খারাপ নয় তো! একটু লাজুক।
তা হোক বাবা, ওকে বেশি পাত্তা দিয়ো না। পেয়ে বসবে।
আসে আসুক না। আমারও কথা বলার একটা সঙ্গী হয় তা হলে!
কিন্তু বাবা বলে বাসন্তী চুপ করে গেল।
কী বলুন না।
ভাবছি, মেয়েটার মতলব তো জানি না।
একটু গম্ভীর হয়ে সুমন বলে, ওকে নাকি আপনার মা আমার কাছে পাঠিয়েছিল।
আমার মা!
হ্যাঁ। তাঁকে অবশ্য আমি ভাল চিনি না।
বিহ্বল মুখে একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল বাসন্তী।
রাত্রিবেলা খাওয়ার টেবিলে যখন বাসন্তী সবাইকে পরিবেশন করছিল তখন সুমন লক্ষ করল, ভদ্রমহিলার মুখে স্পষ্ট কান্নার ছাপ। ঠোঁটে হাসির আভাসটুকুও নেই। কথাও কইছে না। এই প্রথম সুমনের একটু মায়া হল ভদ্রমহিলার জন্য। মানুষটা খুব বুদ্ধিমতী নয়। কিন্তু বোধ হয় মানুষটা ভালই।
মানুষ সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য অনাবিল চোখ দিয়ে কোনও কিছু বিচার করতে পারে না সবসময়। সুমনকে বহুকাল ধরে তার মা বুঝিয়েছে, তার বাবার দ্বিতীয় পক্ষ একজন ঘড়েল ও বদমাশ মহিলা। তার চরিত্রেরও ঠিক নেই। তার বাবাকে হিপনোটাইজ করে, বশীকরণ বা তুকতাক করে দখলে রেখেছে। এই ভদ্রমহিলা নানা ফিকির করে তাদের টাকাপয়সা বিষয়সম্পত্তি গ্রাস করে নিচ্ছে।
সুমন সেইরকম পূর্বধারণা নিয়েই ভদ্রমহিলাকে লক্ষ করত। ওই যে শান্ত, নিরীহ মুখ, নরম কথাবার্তা, ভিতু ভাব ওর আড়ালেই আছে সেই দাঁত নখঅলা ভ্যাম্পটা।
কিন্তু গত কয়েকদিনে ধারণাটা এক জায়গায় বসে থাকেনি। সরে গেছে। ভদ্রমহিলাকে তার ততটা খারাপ ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এর ভালমানুষি কিছুতেই অভিনয় নয়।
সকালে রান্নাঘরে জলখাবার তৈরি করতে যখন বাসন্তী ভীষণ ব্যস্ত তখন হঠাৎ সুমন রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
আপনি খুব ব্যস্ত?
চোখ তুলে এমন অবাক হল বাসন্তী যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। তারপর ভারী ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ও বাবা, তুমি রান্নাঘরে যে! কী দরকার বলো বাবা, একটা হাঁক দিলেই তো হত!
সুমন হেসে বলে, এমনিই এলাম। আপনার রান্নাঘরটা তো বিরাট বড়!
হ্যাঁ বাবা, গাঁদেশে রান্নাঘর তো বড়ই হয়। এসো না ভিতরে, জলচৌকি পেতে দিচ্ছি, বোসো।
সুমন বিনা আপত্তিতে বসল। আপনি সারাদিন খুব কাজ করেন।
বাসন্তীর মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। বলল, সংসার মানেই তো কাজ। কত কী সামলাতে হয়। গোরু, বাছুর, হাঁস-মুরগি, বেড়াল-কুকুর, মানুষজন। কার দিকে নজর না দিলে চলে বলো!
রান্নার লোক পাওয়া যায় না এখানে?
পাওয়া যাবে না কেন? উনি তো আমাকে প্রায়ই রান্নার লোক রাখতে বলেন। আমি রাখতে দিই না।
কেন বলুন তো! কলকাতায় আমাদের বাড়িতে তো রান্নার লোক আছে।
বাসন্তী যেন একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলে, মাইনে করা বাইরের লোকের তো তেমন দায় নেই। কী রাঁধতে কী রাঁধল, বাসি কাপড়ে হাঁড়ি ছুঁল, কি নাকের শিকনি ঝেড়ে সেই হাতেই কাজ করল। তাই আমি নিজেই করি। আমার বড় ঘিনপিত বাবা। শুচিবায়ুও বলতে পার।
সুমন একটু হাসল। কিছু বলল না।
হঠাৎ একটা ছায়া পড়ল দরজায়। সুমন তাকিয়ে দেখল, দরজায় জিজিবুড়ি দাঁড়িয়ে। তাকে হাঁ করে দেখছে। আর চোখ দুটো যেন গিলে খাচ্ছে তাকে।
.
২৮.
মানুষ যে কথা কয় সেটা দুনিয়ার এক অত্যাশ্চর্য জিনিস। মনের মধ্যে ভাবের যেসব গ্যাঁজলা ওঠে সেগুলো এই যে দিব্যি ভাষায় ভেসে ওঠে, ভাবলে ভারী অবাক লাগে। কথা জিনিসটা যে কে আবিষ্কার করেছিল কে জানে! ভারী ভাল জিনিস। ধীরেন লক্ষ করেছে, চারপাশে যেসব কথাটথা হয় সেগুলোর বেশির ভাগই আগডুম বাগড়ম। তবে তার মধ্যে হঠাৎ হঠাৎ দু-চারটে কথা যেন খচ করে মনের মধ্যে গেঁথে যায়।
