সুমন হাসল, তাই বুঝি?
জিজিবুড়ি বলছিল।
আর কিছু নয়?
না।
তা হলে ঘরে ঢুকছ না কেন? আমি তো তোমাকে খেয়ে ফেলব না।
মেয়েটা ফিচিক করে একটু হাসল। তারপর লতানে পায়ে একটু এঁকেবেঁকে ঘরে ঢুকল। ইচ্ছে আর লজ্জায় ভাগাভাগি হয়ে।
ওই চেয়ারটা টেনে বোসো।
মেঝেতেই বসি।
দুর! মেঝেতে কেন বসবে? মেঝে ভীষণ ঠান্ডা। চেয়ারে বসতে দোষ কী?
আমরা যে গুরুজনদের সামনে চেয়ারে বসি না।
গুরুজন! বলে সুমন হেসে ফেলে, আমি আবার কোন সম্পর্কে তোমার গুরুজন হলাম?
বাঃ, আপনি বি এ পড়েন না!
বি এ পড়লেই গুরুজন হয় বুঝি? অদ্ভুত যুক্তি তো!
তা হলে দাঁড়িয়েই থাকি।
সুমন মাথা নেড়ে বলে, অত সংকোচের কারণ নেই। আমাকে বন্ধু বলে ধরে নাও।
উরেব্বাস!
ভয় পেলে নাকি?
আপনি কী করে বন্ধু হবেন! আপনি যে বড়!
বড়! সেটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। তোমার চেয়ে আমি হয়তো দু-চার বছরের বড়। বুড়োমানুষ তো নই!
মেয়েটা অগত্যা চেয়ারে বসল। মাথা নিচু।
তুমি তো আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছ!
হ্যাঁ তো।
সঙ্গ দিতে হলে কথা কইতে হয়।
কী বলব?
সেটাও কি আমি শিখিয়ে দেব? বন্ধুদের সঙ্গে কী করে কথা বলো?
ও সেসব আজেবাজে কথা।
কীরকম আজেবাজে বলো তো!
আমরা কি ভাল কথা জানি!
তুমি অত সেজেছ কেন?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, সেজেছি!
হ্যাঁ তো!
মেয়েটা লজ্জা পেয়ে বলে, সে তো একটুখানি। এখানে আসব বলে একটা টিপ পরেছি। টিপ না পরলে মা রাগ করে।
লিপস্টিকও দেখতে পাচ্ছি যেন!
মেয়েটা মুখ নিচু করে হি হি করে হাসল। আজকাল মেয়েরা সাজে না জান তো? কলকাতার মেয়েরা লিপস্টিকও মাখে না বড় একটা।
ওমা! তাই?
কেন জান? তারা এখন ভাবে শরীরে রং মাখার চেয়ে শরীরটাকেই সুন্দর করে তোলা ভাল। তাই তারা যোগব্যায়াম করে, ধ্যান করে আর স্কিনের যত্ন নেয়।
আপনি এত জানেন কী করে?
বাঃ রে, আমার যে অনেক মেয়েবন্ধু আছে।
কজন?
অনেক। দশ-বারোজন তো হবেই।
উরেব্বাস!
অবাক হওয়ার কী আছে? তোমার ছেলেবন্ধু নেই?
মেয়েটা এবার মুখ তুলে বলে, আছে দু-চারজন। ঠিক বন্ধু নয়, চেনাজানা আর কী।
সমান বয়সি?
হ্যাঁ।
তা হলে ওরা তোমার ছেলেবন্ধুই। তাদের সঙ্গে আড্ডা হয় না?
ঘাড় কাত করে হিমি বলে, খুব হয়।
তা হলে তো তুমি স্মার্ট মেয়ে। অত লজ্জা পাচ্ছিলে কেন?
সুমন যে লজ্জার কারণটা জানে না তা নয়। তার আন্দাজ, এ মেয়েটা তার প্রেমে পড়েছে। আর দুর্বলতা থেকে ওই লজ্জা। প্রেমে পড়লেও কাঁচা প্রেম। চোখের আড়াল হলেই কেটে যাবে। এরা বেশ মেয়ে, শতেকবার প্রেমে পড়ে আর ওঠে।
শীতের এই দুপুরে গেঁয়ো মেয়েটার সঙ্গ তার বেশ ভালই লাগছিল। বিপজ্জনক না হলে লঘু এই প্রেম-প্রেম লাজলজ্জার খেলা খারাপ তো কিছু নয়।
আপনি একটা গল্প বলুন।
গল্প! না, আমি গল্প-টল্প বলতে পারি না। গল্প শুনতে চাও কেন?
এমনি।
তুমি আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছ, গল্প তো তোমার বলার কথা।
আপনার মেয়েবন্ধুরা কেউ সাজে না?
কেউ কেউ সাজে। তবে বেশির ভাগই সাজে না।
তারা শুধু ব্যায়াম করে?
হ্যাঁ। যোগব্যায়াম কাকে বলে জান?
জানি। আমাদের শিখা দিদিমণি শেখায়।
তুমি শেখ নাকি।
হ্যাঁ। আমি অনেক আসন জানি।
বাঃ, তুমি তো তা হলে প্রোগ্রেসিভ মেয়ে। নাচ গান কিছু জান?
আমার গানের গলা নেই। আর এখানে একজন মাত্র নাচ জানে। তবে শেখায় না।
কে বল তো?
চাটুজ্জেবাড়ির মেয়ে পান্না।
পান্না নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সুমনের বুকটা ধক করে ওঠে। কানটা সামান্য গরম হয়। তবু সে একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলে, পান্না?
পুজোর ফাংশনে নেচেছিল, দেখেননি?
সুমন একটু উদাস ভাব দেখিয়ে বলে, তা হবে। মনে নেই। কিন্তু মনে আছে, ভীষণ মনে আছে সুমনের। মনে আছে শুধু নয়, সারাদিন পান্না তার মনে আনাগোনা করে।
পান্না নাচে, তা বলে আনা পাভলোভা নয়। তালজ্ঞান থাকলে যে কোনও মেয়েই অল্পবিস্তর শরীর দোলাতে পারে। বড় পুজোর ফাংশনে যে নৃত্যনাট্যটা হয়েছিল তাতে পান্নাকে যখন ফুলের সাজ আর মেকআপে দেখেছিল সুমন তখনই সে খরচ হয়ে যায়। নাচের ব্যাকরণ সুমন জানে না বটে, কিন্তু দেখেছিল কী বিভোর হয়ে সম্মোহিতের মতো সারা স্টেজ জুড়ে ঢেউ হয়ে বয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।
তারপর থেকেই ছুতোনাতায় কতবার যে ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াত হল।
হ্যাঁ রে মরণ, তুই না আগে চাটুজ্জেবাড়িতে নারকোল আর সুপুরি পাড়তিস!
পাড়তুম তো৷ কিন্তু তুমিই যে বারণ করে দিয়েছ!
ওঃ হ্যাঁ, তাই তো!
ওদের বাড়ি যাবে?
সুমন লজ্জা পেয়ে বলে, না না, আমি কেন যাব?
পান্নাদিরা খুব ভাল লোক। গেলে খুশি হবে কিন্তু।
যাঃ, খুশি হলেই যেতে হবে নাকি?
আসলে মেয়েদের ব্যাপারে সুমনের কোনওদিন লজ্জা সংকোচ ছিল না। আজও নেই। সে ছেলেবেলা থেকে কো-এডুকেশন আর ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে। মেয়েদের নিয়ে তার লজ্জা সংকোচ কেটে গেছে কবে! তবু জীবনে এই প্রথম এবং এই একটি জায়গায় সে কেমন আটকে গেছে যেন। একটা বাধা হচ্ছে।
পাকা মরণটা অবশেষে বলে বসল, চলো না, বিজয়া করে আসি।
বিজয়া! বলে বিস্ময় প্রকাশ করে সুমন।
বাঃ, বিজয়া করতে তো আমরা সব বাড়ি যাই।
তোর চেনা বাড়ি, তুই যেতে পারিস। আমি কেন যাব?
তোমাকেও সবাই চিনে গেছে। পান্নাদি তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।
কী জিজ্ঞেস করেছিল?
বলল, ওই সুন্দরমতো ছেলেটা কে রে তোর সঙ্গে ঘোরে?
