ও তো জিজিবুড়ি।
জিজিবুড়ি আবার কে? আমার দিদিমা। আমি জিজিবুড়ি বলে ডাকি। ওঃ। বলে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি সুমন। মরণ নিজের থেকেই বলল, জানো তো, জিজিবুড়ি রোজ দুধ খেতে আসে আর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে।
ঝগড়া করে কেন?
ক্যাট ক্যাট করে অনেক কথা শোনায় মাকে। বলে মার সঙ্গে নাকি বাবার মোটে বিয়েই হয়নি। ও বিয়ে নাকি ভড়ং।
বাবার দ্বিতীয় বিয়েটা সম্পর্কে সুমনের তীব্র বিদ্বেষ আছে। যখন তার বাবা বিয়েটা করেছিল তখন সুমনের বয়স কম। ফুঁসে উঠবার মতো ব্যক্তিত্ব তখনও অর্জন করেনি সে। বাড়িতে যে বিশাল গণ্ডগোল হয়েছিল, মা আর বাবার মধ্যে, তার অনেকটারই সাক্ষী ছিল সে। তার মা তার বাবাকে এত গালাগাল করেছিল যে বলার না। পুলিশ এসে বাবাকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল। রসিক সাহা জামিন না নিয়ে কিছুদিন পুলিশের হেফাজতে থেকেও গিয়েছিল। সেটা বোধ হয় বাড়িতে অশান্তি এড়ানোর জন্যই। তারপর অবশ্য কাজ কারবার লাটে উঠছে দেখে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। বাড়িতে টিকতে না পেরে কোনও আত্মীয়বাড়িতে গিয়েও কিছুদিন ছিল। বাড়িতে মায়ের তখন পাগলের মতো অবস্থা। কখনও কাঁদে, কখনও বাসন-কোসন ছুঁড়ে ভাঙে, কখনও তাদের ভাইবোন দুটোকে অনর্থক পেটায় আর পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে ভ্যাড়ভ্যাড় করে বাবার কীর্তি কাহিনী বলে। প্রথম প্রথম পাড়ার মেয়েরা দল বেঁধে শুনতে আসত। কিছু দিন পরে অবশ্য একই কথা শুনতে শুনতে তাদের উৎসাহে ভাটা পড়তে থাকে। এমন দুঃসময় তাদের জীবনে আর আসেনি। শেষ অবধি কালক্রমে ধীরে ধীরে চেঁচামেচি কমতে লাগল। বাবাও বাড়ি ফিরতে পারল একদিন। বাইরের উত্তেজনা কমলেও পরিবারটা আর স্বাভাবিক রইল না। তাদের চারজনের যে পরিবারটি ছিল তার বাইরেও যে আর একটা লজ্জার সম্পর্ক তৈরি হয়ে রইল সেইটে মেনে নিতে বা সয়ে নিতে সময় লাগছিল তাদের। বাবাকে তখন তার খুব অপছন্দ হত।
তার বাবা অনেকদিন মায়ের ভয়ে গাঁয়ে আসেনি। তখন একবার খবর পাওয়া গেল যে, গাঁয়ের বিষয় সম্পত্তিতে লুটমার হচ্ছে। বাবার দ্বিতীয় বউ সামলাতে পারছে না। তার বাবা বিষয়ী, একরোখা লোক। দেশভাগ হয়ে ঠাঁইনাড়া মানুষের দঙ্গলে মিশে এদেশে এসে বহু কষ্ট করেছে। ক্যাম্পে থাকার সময় ভিক্ষে অবধি করেছে পেটের দায়ে। তারপর নিজের রোখে উঠে দাঁড়িয়েছে। এইসব লোকের কাছে বিষয়সম্পত্তি হল প্রাণ। তার বাবা মায়ের রাগের তোয়াক্কা না করে ছুটে এল গাঁয়ে। মারধর খেয়েছিল, শত্রুতাও কম হয়নি। গোটা তিন চার মোকদ্দমাও লড়তে হয়েছে। কিন্তু রসিক সাহা হার মানেনি।
এই যে সুমনের হঠাৎ গাঁয়ে আসা এর পিছনেও তার মায়ের প্ররোচনা আছে। দশ-বারো বছর ধরে রসিক সাহার একটা সিস্টেম তৈরি হয়েছে। সপ্তাহান্তে শনিবার সে গাঁয়ে আসে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে। সোমবার ফিরে যায়। এই নিয়েও বাড়িতে প্রথম প্রথম কুরুক্ষেত্র বড় কম হয়নি। শুক্রবার রাত থেকে মায়ের মাথা গরম হত। সে কী চেঁচামেচি আর শাপশাপান্ত। একবার একটা ভারী তালা ছুঁড়ে মেরে তার বাবার থুতনি ফাটিয়ে দিয়েছিল। তবু রসিক সাহার সিস্টেম ভাঙেনি। এখন সব গা সওয়া হয়ে গেছে। মা তাকে কয়েকদিন ধরেই বলছিল, একবার যা, গিয়ে দেখে আয় সেই বেশ্যাটার তবিলে কত টাকা ঢালছে।
সুমন রাগ করে বলেছিল, আমি যাব কেন? তোমার জানার হলে তুমি যাও।
আমি! আমি গেলে যে ওকে খুন করে আসব।
তা হলে আমাকে পাঠাতে চাইছ কেন?
তোদের ভালর জন্যই চাইছি। শেষ অবধি যদি সবই ওই মাগীর গর্ভে যায় তা হলে তোদের কী হবে?
আমাদের জন্য তো বাবা কম করছে না!
ছাই করছে। আমি জানি, ওই মেয়েমানুষটার পিছনে আরও টাকা ঢালছে।
ঢালুক। আমি যেতে পারব না।
ঢাললেই হল! আমি উকিলের সঙ্গে কথা কয়েছি। দ্বিতীয় বিয়েটা বিয়েই নয়। ওসব বিষয়সম্পত্তিও আমাদেরই। তুই গিয়ে শুধু ওদের মতলবটা বুঝে আয়।
রোজ এইসব কথা শুনতে শুনতে অবশেষে সুমন রাজি হয়েছিল। এখানে এসে অবধি সে এখনও কিছু বুঝতে পারে না। দিব্যি একটা পাড়াগাঁয়ের গেরস্থের সংসার। বাবার দ্বিতীয় বউকে খুব অপছন্দ হবে বলে মনে হয়েছিল সুমনের। কিন্তু কাছে এসে দেখছে মহিলা ভারী ভিতু আর নিরীহ। আজ অবধি উঁচু গলায় কথা কইতে শোনেনি। আর মহিলা সুমনকে সবসময়ে খুশি করতে একটা প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিছু খারাপ লাগছে না সুমনের। মানুষের দুবার বিয়ে করাটা হয়তো খারাপ। কিন্তু সেই খারাপের চিহ্ন বা লক্ষণগুলি খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেও সে পেরে ওঠেনি।
জিজিবুড়ি বা তার মা বিয়েটা স্বীকার না করলেও সুমনের মনে হয়েছে, তার বাবা এখানে এসে বেশ ভালই থাকে। মুখে হাসি-টাসি দেখা যায়। কলকাতার বাড়িতে বাবা ভীষণ গোমড়ামুখো।
সে মরণকে বলেছিল, তোর দিদিমা ওসব কথা কেন বলে?
জিজিবুড়ি তো ওরইমই। সবসময় মুখে খারাপ খারাপ কথা।
জিজিবুড়ি কেমন লোক তা অবশ্য সুমন ভাল করে জানে না। এখনও আলাপ পরিচয় হয়নি।
সে দিকে চেয়ে বলল, দিদিমা তোমাকে পাঠাল কেন?
হিমি চৌকাঠ থেকে এক পাও এগোয়নি, মুখও তোলেনি। আঙুলে আঁচল জড়াচ্ছে আর খুলছে। ওইভাবে থেকেই বলল, জিজিবুড়ি বলছিল, ছেলেটা একা একা থেকে হাঁপসে পড়ছে, যা না গিয়ে একটু গল্প-টল্প কর। শহরের ছেলে তো, ওদের সঙ্গে কথা কইলেও একটা শিক্ষে হয়।
