আচমকা বিজুর কান গরম হয়ে গেল। মুখখানা লাল। পান্নার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল সে। বিজু ভেবেছিল, দৃশ্যটা কেউ দেখেনি। ক্ষীণ আশা ছিল, সোহাগ কাউকে ঘটনাটার কথা বলবে না। তাই ধরা পড়ে গিয়ে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে তার।
বিজু বলল, কেন বল তো! তোকে সোহাগ কিছু বলেছে?
খুব বেশি বলেনি।
কী বলেছে?
বলেছে, তোমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছিরি ইনসিডেন্ট হয়েছে।
ওভাবে বললে লোকে অন্য কিছু ধরে নিতে পারে।
তোমরা কি ঝগড়া করেছ?
বরং ঝগড়াই ভাল ছিল। এটা তার চেয়েও খারাপ।
কী হয়েছিল বিজুদা?
মেয়েটা যে পাগল তা জানিস?
আছে একটু। সকলের মতো তো নয়। ও একটু অন্যরকমভাবে চিন্তাভাবনা করে।
পাগলরাও তো তাই। তারা আর পাঁচজনের মতো নয়, তাদের চিন্তার জগৎ আলাদা। তাই তো!
পায়ে পড়ি, বলো না!
মেয়েটা সেদিন ওই ঠান্ডায় আর ভয়ংকর বৃষ্টির মধ্যে কাঞ্জিলালের জমিটায় নেচে বেড়াচ্ছিল।
হ্যাঁ, এরকম সব কাণ্ড ও করে তো।
দোষের মধ্যে আমি গিয়ে ওকে অ্যালার্ট করার চেষ্টা করি।
ভালই তো করেছিলে।
করুণ একটু হেসে বিজু বলল, ভাল আর হল কই? আমি বারবার ডাকছিলাম। সাড়া না পেয়ে গিয়ে হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতেই ও কেমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর উঠে সে কী রাগ! পাগল আর কাকে বলে!
একটু চুপ করে থেকে পান্না বলল, হ্যাঁ, ওর নাকি মাঝে মাঝে একটা ট্রান্সের মতো হয়। সে সময়ে কেউ ওকে ধরলে অজ্ঞান হয়ে যায়।
ও হল মৃগি রোগ, বুঝলি! মৃগির সঙ্গে পাগলামি।
সবাই তো একরকম হয় না বিজুদা। ও ওর মতো।
বন্ধুর হয়ে ওকালতি করতে এসেছিস?
তা নয়। একটু বুঝবার চেষ্টা করো। ও খুব দুঃখী একটা মেয়ে।
দুঃখী!
খুব দুঃখী। তুমি বুঝবে না বিজুদা। মা-বাবার কাছ থেকে ও কোনও প্রশ্রয় পায় না। খুব অশান্তি ওদের সংসারে। সবাই নাকি সবাইকে ঘেন্না করে।
আমার ওসব জেনে কী হবে?
একটু চুপ করে থেকে পান্না বলে, ও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
নাটক নাকি?
সত্যিই চেয়েছে।
আর নাটকের দরকার নেই। ঘটনাটা আমি ভুলে যাব।
ওকে কী বলব?
কিছু না।
.
২৭.
চোখ চেয়েই জানালার বাইরে একজোড়া চোখ দেখতে পেল সে। চমকে উঠল। জানালার কপাটের আড়ালে লুকোনো মুখ। শুধু দুখানি চোখ নিবিড় দৃষ্টিতে চেয়েছিল। সে তাকাতেই সরে গেল টপ করে। সঙ্গে কাচের চুড়ির একটু ঠিন ঠিন শব্দ।
কে ওখানে?
প্রথমে জবাব নেই।
গায়ের লেপটা সরিয়ে উঠতে উঠতে সে ফের প্রশ্ন করে, কে রে?
ক্ষীণ জবাব এল এবার, আমি।
আমি কে?
আমি হিমি।
বড্ড সাহস হয়েছে তো মেয়েটার! গত কয়েকদিন শুধু বারবার এ বাড়িতে নানা ছুতোয় হানা দিয়েছে আর সুযোগ পেলেই হাঁ করে দেখেছে তাকে। মুচকি হাসি, চোখের ইশারাও শুরু হয়েছে ইদানীং। কিন্তু এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না কি!
আজ কেউ বাড়িতে নেই। বাবা গেছে মরণ, হাম্মি আর মরণের মাকে নিয়ে বর্ধমানে কী সব গেরস্থালির জিনিস কেনাকাটা করতে। ফাঁকা বাড়িতে আছে শুধু দুটো কাজের মেয়ে, গোটাকয় মুনিশ আর কুকুর বেড়াল। এই অবস্থায় মেয়েটা কেন এল?
কী চাও?
এমনিই এসেছিলাম। খুড়িমা নেই?
ওরা যখন বর্ধমানে রওনা হচ্ছিল তখন দোতলা থেকে হিমিকে সদর দরজার আগলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সুমন। ন্যাকা! জানে না যেন!
না , নেই।
মেয়েটা চুপ। সুমন টের পেল, এখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েদের অভিজ্ঞতা সুমনের কম নেই। নারীসঙ্গ তার প্রিয়। কলকাতায় তার একগাদা মেয়েবন্ধু আছে। বলতে কী, ছেলেবন্ধুর চেয়ে তার মেয়েবন্ধুই বেশি। এখানে এসে অবধি সে নারীসঙ্গের একটু অভাববোধ করছে ঠিক। সে অভাব মেটানোর সাধ্য তো হিমির নেই। একটা সুন্দর চেহারার ছেলে দেখে ঢলে পড়া এবং বিয়ের লাইনে চিন্তা করা ছাড়া ওসব মেয়ের মন আর কোনও চিন্তা করতে পারে না। এইট না নাইনে পড়ে বলে শুনেছিল যেন একবার।
সুমন একটু ভাবল। একটা ধমক দিলেই মেয়েটা চলে যাবে। কিন্তু ধমক না দিয়ে ডেকে একটু কথা বললে কেমন হয়? ঠিক এই ক্লাসের কোনও মেয়ের সঙ্গে তো তার বন্ধুত্ব হয়নি।
ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভিতরে এসো।
মেয়েটা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আসব?
এসো। ডাকলাম তো!
খুব বাধো বাধো পায়ে মেয়েটা এসে দরজার ফ্রেমে দাঁড়াল। পশ্চিমের জানালা দিয়ে শীতের ঢলানি রোদ অনেকটা মেঝে পার হয়ে দরজার কাছে গিয়ে থেমেছে। সেই আলোয় সুমন দেখল, মেয়েটা এই দুপুরেও একটু সেজেছে। জংলা ছাপা শাড়ি, কপালে টিপ, চুল বিনুনিতে বাঁধা। ঠোঁটে একটু লিপস্টিকও কি? এতদিন তাচ্ছিল্যে তাকায়নি সুমন ভাল করে। এখন দেখল, সুন্দরী না হলেও হ্যাঁক ছিঃ নয় মোটেই। যৌবনে কুকুরী ধন্যা।
চৌকাঠে থমকে গেছে মেয়েটা। আর এগোতে সাহস পাচ্ছে না।
সুমন বলল, আরে এসো, এসো।
মেয়েটা কেমন থতমত খেয়ে একটু হাসল, মাথা নত করল।
হঠাৎ এই দুপুরে এলে যে! কী ব্যাপার?
সুমন ধমকায়নি। কড়া গলাতেও বলেনি। মেয়েটা তবু যেন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, আমাকে পাঠাল যে!
সুমন অবাক।
পাঠাল! কে তোমাকে পাঠাল?
দিদিমা। দিদিমা? কে দিদিমা?
মরণের দিদিমা, জিজিবুড়ি।
সুমন জিজিবুড়িকে দেখেছে। রোগা চেহারার একজন বিধবা মহিলার আনাগোনা আছে এবাড়িতে। সুট করে আসে, আর ফুট করে চলে যায়। গতিবিধি কিছুটা সন্দেহজনক। মহিলা কে তা বুঝতে না পেরে একদিন সে মরণকে জিজ্ঞেস করেছিল, বুড়িটা কে রে?
