না। ইন্টারনেট দিয়ে কী হবে?
একটা ওয়েবসাইট ধরতে হবে।
কোন ওয়েবসাইট?
ডিপ্রেশন ডট কম।
ডিপ্রেশনটা কার হল? তোর নাকি?
ডিপ্রেশন কার নেই বলো। আমার, তোমার, সকলেরই আজকাল খুব ডিপ্রেশন। এই যে চড়াইপাখিটা মরে গেল তুমি ডিপ্রেসড।
চড়াইপাখিটা আমার একজন ভাল বন্ধু ছিল, জানিস? আসত, যেত, কোনও ঝামেলা ছিল না। ভদ্র, সভ্য, একা একটা পাখি।
বাব্বাঃ, তোমার যে কাব্য বেরোচ্ছে বিজুদা! ক্রৌঞ্চমিথুনের দুঃখে বাল্মীকির যেমন ধারা হয়েছিল।
তোর মাথা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পান্না বলে, একটা পাখির জন্য তোমার যা দরদ তার একশো ভাগের এক ভাগও যদি আমাদের জন্য থাকত।
কেন রে, তোর আবার আলাদা দরদের দরকার হল কেন? দিব্যি তো আদরে আহ্লাদে বখা হয়ে যাচ্ছিস। কাকা আর কাকিমা আসকারা দিয়ে মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে।
আহা, আর বোলা না। বাবা মা দেবে আমাকে আসকারা! উঠতে-বসতে মা চুলের মুঠি ধরতে আসে, জানো? আর বাবা তো কবেই আমাকে বেড়াল পার করতে চেয়েছিল গৌরীদান করে। সব ভুলে গেছ?
তাই তো! তোর তো তবে বড্ড দুঃখ।
ইয়ার্কি কোরো না, ভাল লাগে না।
তোর মাথা আরও একজন চিবিয়ে খাচ্ছে।
ওমা! আবার কে চিবিয়ে খাবে গো! আমি কি রুইমাছ নাকি যে সবাই আমার মুড়ো চিবোবে!
রুইমাছ নোস, তুই হচ্ছিস হদ্দ বোকা আর গেঁয়ো একটা মেয়ে।
কেন ওকথা বলছ! আমার যে ভয় লাগছে!
ভয় লাগছে না হাতি! ও মেয়েটার সঙ্গে তোর অত মাখামাখি কীসের?
কোন মেয়ে? কার কথা বলছ?
কার কথা বলছি ভালই জানিস।
বুঝেছি। সোহাগ তো!
ও মেয়েটার নামে নাকি তোর নাল গড়ায়! এই তো সেদিন কাকিমা বলছিল, রাত নেই দিন নেই যখন-তখন এসে হামলে পড়ে। তারপর দরজা বন্ধ করে গুজগুজ ফুসফুস।
যাঃ, মোটেই না। মা ওরকমই। তিল থেকে সবসময়ে তাল বের করে।
তার মানে কি সোহাগ তোর কাছে আসে না?
আসবে না কেন? মাঝে মাঝে আসে।
এসে তোর পড়াশুনো নষ্ট করে?
মোটেই না। খুব এটিকেট মেনে চলে। ও আসে দুপুরবেলা, তখন আমি পড়ি না।
কী মন্ত্রে দীক্ষিত করছে তোকে?
যাঃ, কী যে বলো না। সোহাগ খুব ভাল মেয়ে। খুব দুঃখী। একটু পাগলাটে আছে বটে, কিন্তু খারাপ নয় তো! তোমার বাপু, সোহাগের ওপর বড্ড বেশি রাগ।
অকারণে রাগ তো নয়। যেসব ছেলেরা ওর পিছনে লাগত, আজকাল দেখছি তাদের সঙ্গে মাঠেঘাটে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
তাতে কী হয় বিজুদা? ছেলেগুলোর সঙ্গে ভাব করায় ওরা আর তো ওর পিছনে লাগে না।
মাঝখান থেকে ছেলেগুলোকে শাসন করতে গিয়ে আমিই আহাম্মক হলাম। ডিসগাস্টিং।
রাগ করছ কেন? দোষটা ওর নয়।
তবে কার?
একটু ভেবে পান্না বলল, বোধহয় আমার।
তোর দোষ কেন হবে?
ছেলেগুলো একদিন আমার সামনেই ওকে যা-খুশি বলছিল। তাতে আমি ভীষণ রেগে গিয়ে তোমার কাছে নালিশ করে দিই। সোহাগ কিন্তু বারণ করেছিল।
জানি। বড়মার কাছেও বলে গেছে ওর নাকি আমার সাহায্যের দরকার নেই। খুব দেমাক। এখন হয়তো আমার মুখে চুনকালি মাখানোর জন্যই ওই ছেলেগুলোকে জুটিয়ে মক্ষীরানি সেজেছে।
ওর ওপর তোমার খুব রাগ, না?
কথাটা দুবার বললি। রাগ হওয়ার কারণ ঘটলেই রাগ হয়।
কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। সোহাগ বলে, পৃথিবীর সব জায়গায় তো বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে না। তাই মেয়েদের নিজেদেরই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আর আত্মরক্ষার সবচেয়ে ভাল উপায় হল শত্রুকে বন্ধু করে নেওয়া।
বেশ কথা। মেয়েদের বন্ধু জোটাতে সময় লাগে না, বিশেষ করে যদি একটু চটক থাকে। ও যেসব ছেলেদের সঙ্গে মেশে তারা কী ধরনের ছেলে তা কি ও জানে? তা ছাড়া এসব বেলেল্লাপনা কি গাঁদেশে চলে?
দিনকাল পালটে গেছে বিজুদা।
কবে পালটাল? আর পালটালে তুই টের পেলি, আমি পেলাম না কেন?
বড্ড রেগে আছ তুমি। আজ পাখিটা মরে যাওয়ায় সত্যিই তোমার মাথা গরম।
হ্যাঁ, গরম। আজ আমার মন ভাল নেই। পাখি, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, গাছপালা এসব নিয়েই পৃথিবীর পরিমণ্ডল। সবাইকেই পৃথিবীর দরকার। নইলে এত সব প্রাণীর বৃথা সৃষ্টি হত না। মানুষ সেটা বুঝতে বড্ড সময় নিচ্ছে। ওই যে লোকটা কী নাম যেন জিম করবেট, তাকে প্রায় মহাপুরুষ বানানো হয়েছে। লোকটার শিকারকাহিনী এখনও রাশি রাশি বিক্রি হয়। লোকটার মস্ত কৃতিত্ব হল বন্দুক দিয়ে বাঘ মারা। এটা কোনও বীরত্বের কাজ? আমি সেসময়ে ক্ষমতায় থাকলে লোকটিকে দেশ থেকে বের করে দিতাম। ওরা হচ্ছে সেই জাত যারা বছরে একবার শেয়াল মারার উৎসব করে।
ওঃ, আজ তুমি বড্ড রেগে আছ বিজুদা।
রাগলে কী হবে? এ হল ফান্টুস রাগ। এ রাগ দিয়ে কাজ হয় না। শুধু হাত কামড়ে মরি। পাখিটা মরল কেন জানিস? মা আর হারানির বুদ্ধির দোষে। পাখাটা চালানোর দরকার ছিল না, জানালাটা খুলে দেওয়া উচিত ছিল। বেরোতে না পেরে পাখিটা ভয় খেয়ে দিশেহারা হয়ে পাখাটায় ধাক্কা খেল। হি ওয়াজ গুড ম্যান।
ম্যান?
আমার কাছে পাখিটা তাই ছিল। এ ম্যান, এ জেন্টেলম্যান।
মেয়ে পাখিও তো হতে পারে।
তা পারে।
মেয়েই হবে।
কী করে বুঝলি?
হি হি করে হেসে পান্না বলে, ওটা ছিল তোমার গার্লফ্রেন্ড।
মারব থাপ্পড়। যা ভাগ এখন।
ওয়েবসাইটটার কী হবে?
কিছু হবে না। তোর বন্ধুকে কলকাতায় যেতে বল।
আচ্ছা, একটা কথা বলবে?
আবার কী কথা?
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে তোমাদের ভিতর কী হয়েছিল?
