খুব পাপ করেছিস। পাখিটা আমার বন্ধু ছিল।
তুমি রাগ করলে দাদা! কিন্তু পাখিটা যে কেন অমন ভয় খেল!
ভয় তো খাবেই। ওরা যে তোদের বিশ্বাস করতে পারে না।
ভারী ছলছলে হয়ে গেল হারানির চোখ। আর একটিও কথা না বলে ঘর মোছা শেষ করে উঠে হাত বাড়িয়ে বলল, দাও।
বিজু তখন চেয়ারে বসে করপুটে ধরা ব্রহ্মচারীর মৃত শরীরের দিকে চেয়ে ছিল। বলল, কী চাস?
পাখিটা দাও।
কী করবি?
দাতাবাবার কাছে নিয়ে যাব।
সে কে?
একজন গুণীন।
অবাক হয়ে বিজু বলে, সে কী করবে?
সে মরা জিনিস বাঁচাতে পারে।
ধুস। এখন যা, আমার মন ভাল লাগছে না।
মা যায়নি। দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। বলল, দে না ওকে। গুণীন-টুনিরা তো অনেক কিছু পারে।
কী যে সব আনসায়েন্টিফিক কথা বলো তার ঠিক নেই।
চেষ্টা করতে দোষ কী? দুনিয়ায় কত কিছু হয়, আমরা কি তার খোঁজ রাখি!
এসব করে কি আমাকে ভোলাতে পারবে? আমি তো আর বাচ্চা ছেলে নই।
হারানি হাতটা বাড়িয়েই ছিল। বলল, দাও না আমাকে।
বিরক্ত বিজু মৃত পাখিটা ওর হাতে দিয়ে বলল, গুণীনের কাছে যেতে হবে না। মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দিস।
সকাল থেকে মনটা বড় খারাপ বিজুর। তার নির্জন ঘরে পাখিটার আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেল। যতদিন না আর কোনও ব্রহ্মচারীর আগমন ঘটে।
পিছনে বিরাট বাগান করেছে নরহরি। ওটা তার বরাবরের নেশা। বাগানে সবজি ফলাবে। যত না খাবে তার বহুগুণ বেশি বিলোবে। মুলো, পালং, কপি, আলু অবধি। এই সময়টায় বাবা বাগানে বহুক্ষণ কাটায়। সঙ্গে জনা দুই মুনিশ থাকে। ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল বিজু। পুবের জানালা দিয়ে শীতের রোদ এসে পড়ল অনেকখানি মেঝে আর বিছানা জুড়ে।
মা মশারি খুলে ভাঁজ করে রেখে বিছানায় বেডকভার ঢাকা দিতে দিতে বলল, অমন মন খারাপ করে বসে আছিস কেন? মানুষ তো মশা-মাছিও মারে। পায়ের তলায় পিঁপড়েও তো মরে। তা বলে কি পাপ হয় নাকি?
বিজু জবাব দিল না। মাকে নিয়েও তার সমস্যা বড় কম নয়। তার মা হল পুত্রগতপ্রাণ। ছেলের প্রতি মার পক্ষপাত দৃষ্টিকটু পর্যায়ের। তার দুই দিদিই বহুবার কথাটা বলেছে। বিয়ের আগে মাঝে মাঝে বিজুকে নিয়ে মার সঙ্গে প্রায়ই খিটিমিটি বাধত তাদের। দিদিদের যুক্তি যথেষ্ট জোরালোই ছিল। বিজু মাকে কতদিন বকেছে, তোমার এত পারশিয়ালিটি কেন মা?
আজও, ছেলের প্রতি মার ওই দুরারোগ্য পক্ষপাত বিজুকে বিরক্তই করে। বিজু একটু চুপ করে বসে থাকলে, বাড়ি ফিরতে একটু দেরি করলে বা কোথাও ট্রেকিং কি বেড়াতে গেলে মা অস্থির হয়ে পড়ে। তার মার জন্যই সে আজ অবধি অনেক ইচ্ছেকে চেপে রেখে দিয়েছে।
টান ভালবাসা যে মানুষকে কখনও কখনও কত অপদার্থ করে দেয় তা বিজু ভালই জানে। দশ-বারো বছর বয়স অবধি সে নিজের হাতে খেতে পারত না, পোশাক পরতে পারত না। এই যে সে দোতলার ঘরে একা থাকে তাতে মার স্বস্তি নেই। দিনে শতেকবার নানা ছুতোয় এসে তাকে দেখে যায় মা। সবসময়ে সামনে আসে না, সবসময়ে জানান দেয় না। কিন্তু গোয়েন্দার মতো নজর রাখে। তার এই ঘরের একাকিত্ব আজও নিরঙ্কুশ নয়।
মাঝে মাঝে মার ওপর রেগে যায় বিজু। আবার মায়াও হয়।
সে মার দিকে চেয়ে বলল, এখন আমাকে একটু একা থাকতে দাও তো। আমার ভাল লাগছে না।
মা চলে যাওয়ার পর ভোলা ছাদে রোদের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায় বিজু। মন ভাল নেই। মন ভাল নেই। দুদিন ঝড়জলের পর আজ ভারী সুন্দর দিন। তীব্র উত্তরে বাতাস আর রোদ মিলে ঝলমল করছে একটা ধোয়ামোছা সকাল। গাছে গাছে বাতাসের ঝোড়ো শব্দ। চারদিকে পাখির ডাক। মন ভাল নেই।
এই যে এত সহজেই তার মন খারাপ হয়ে যায়, এটা সুলক্ষণ নয়। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ব্যক্তিগত মৃত্যুচিন্তা আমার নেই। কারণ চারদিকে যে প্রাণের লীলা, প্রাণের এত প্রকাশ তার মধ্যেই আমিও একজন মাত্র। আমি এই প্রাণবন্যারই একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি? সে কি এই যে, একটাই সত্তার প্রকাশ ঘটছে ঘটে ঘটে, নানা বিভঙ্গে, মূর্তিতে, আকারে, বিশিষ্টতায়? এই যে ব্রহ্মচারী আজ মারা পড়ল এটা কিছু নয়। একটি প্রাণ নিবে গেলেও যৌথ প্রাণ জেগে আছে? কিংবা এরকমই কিছু?
বিজুদা! এই বিজুদা!
কে রে?
আমি। ন্যাড়া ছাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে বিজু দেখে, পান্না। উমুখে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চোখের রোদ আটকাচ্ছে।
কী রে?
একটু ওপরে আসব?
আয় না! অনুমতি নেওয়ার কী হল?
কী জানি বাবা। ছোটমা বলল, পাখি মরেছে বলে তোমার নাকি মন খারাপ।
তা খারাপ একটু আছে। মা কি তোকে আসতে বারণ করল নাকি?
না। শুধু বলল, মেজাজ বিগড়ে আছে, বুঝেসুঝে যাস।
আসতে পারিস।
তোমার বাঁদরটা কি ওপরে নাকি?
আরে না। ও তো রাতেরবেলায় গোয়ালে বাঁধা থাকে।
ভারী অসভ্য বাঁদর।
কেন রে?
বাঃ রে, সেদিন তোমার কাধ থেকে নেমে আমাকে তাড়া করেছিল না?
তুই ওকে ক্ষ্যাপাচ্ছিলি বলেই তাড়া করেছিল। এমনি নয়।
বাঁদরকে সবাই ক্ষ্যাপায়।
তাহলে তাড়াও খেতে হয়।
আসছি, দাঁড়াও।
পান্না ওপরে উঠে এল।
এই সাতসকালে কী এমন কথা রে তোর?
তোমার তো ইন্টারনেট আছে, তাই না?
ইন্টারনেট! পাগল নাকি? তোর কি ধারণা পশ্চিমবঙ্গে গাঁয়ে গাঁয়ে ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে?
এ মা! আমি যে একজনকে বললাম তোমার ইন্টারনেট আছে।
কাকে বললি?
সেটা বলা যাবে না। কারণ আছে। নেই তাহলে?
