কার ডাকের অপেক্ষা ছিল মেয়েটার?
বিহ্বলতা জিনিসটা বিজু টের পায়। বারবার ওই করুণ একজোড়া চোখ তার স্মৃতিতে হানা দিয়েছে। আর ওই কথা, আমাকে তো কেউ ডাকেনি।
প্রেমিক না হলেও মেয়েদের কাছে হিরো হওয়ার লোভ কি সংবরণ করতে পেরেছে বিজু? বোধহয় না।
স্পোর্টিং ক্লাবের বদমাশ ছেলেরা যখন সোহাগের পিছনে লেগেছিল তখন কথাটা তার কানে তুলেছিল পান্না। স্বাভাবিক অবস্থায় এসব ঘটনা ঘটলে সে প্রতিকার করে বটে কিন্তু বাড়াবাড়ি কখনও করে না। হঠাৎ ওই ঘটনা শোনার পর সে যে কেন উন্মাদের মতো রেগে গিয়েছিল তা কে বলবে? রেগে গিয়ে সে তার ডু গুডার দলবল নিয়ে নিজেই চড়াও হয়েছিল ওদের ওপর। মাত্রা ছাড়িয়ে মারধর করেছিল। তারপর পাঠিয়েছিল সোহাগের কাছে ক্ষমা চাইতে।
কোথায় বিগলিত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটবে, হল উলটো। মেয়েটা বড়মাকে আর পান্নাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কাউকে নিতে হবে না। সুস্পষ্ট অপমান এবং প্রত্যাখ্যান।
তা হলে কি ওই দু চোখের বিহ্বলতা ভুল রিডিং দিয়েছিল বিজুকে? ভুল পাঠ? ভুল ব্যাখ্যা? সব ভুল?
তাই হবে। মেয়েদের মতো এত ভাল ড্রিবল আর কে করতে পারে? অদৃশ্য থাপ্পড় খেয়ে মেয়ে জাতটার ওপরেই কিছুদিন বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল তার।
নতুন বাইকটি হাতে পাওয়ার পর কিছুদিন হল লম্বা লম্বা ড্রাইভে চলে যাচ্ছে বিজু। খোল রাস্তা, অফুরান পথ, হাওয়া, রোদ, গতি–সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মুক্তি। বুকটা হা-হা করে আনন্দে। সাইকেল এর কাছে কোথায় লাগে! মোটরগাড়িও না। যৌবন এবং মুক্তির দূত হল মোটরবাইক। হাইওয়েতে সে যখন একের পর এক গাড়ি এবং স্কুটারকে কাটিয়ে দুরন্ত গতিতে ছোটে তখন মনে হয়, এর চেয়ে ভাল কিছু নেই।
পরশু সকালবেলা থেকে একটু একটু মেঘলা করেছিল, হাওয়া দিচ্ছিল খুব। একটা পুলওভার আর তার ওপর উইন্ডচিটার চাপিয়ে হেলমেটে মাথা ঢেকে সাতসকালে বেরিয়ে পড়েছিল বিজু। বর্ধমান থেকে বাইপাস ধরে বাঁকুড়া আরামবাগের রাস্তা ধরে অনেকটা চলে গিয়েছিল সে। তারপর ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে দেখে ফিরল।
ফেরাটা ছিল পাগলের মতো। বৃষ্টির আগেই গাঁয়ে পৌঁছনোর জন্য সে স্পিড তুলে দিয়েছিল সাংঘাতিক। বাইকটা ক্ষণে ক্ষণে লাফাচ্ছিল রাস্তার খানাখন্দে। শক্ত হাতে হ্যান্ডেল চেপে দাঁতে দাঁত পিষে ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল বিজু।
কিন্তু শেষ অবধি বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। প্রথমেই বড় বড় শিল পড়তে থাকায় একটা গাছতলায় কিছুক্ষণ দাঁড়াল সে। তারপর বৃষ্টিতে বেরিয়ে পড়ল। ভিজে ঝুল্লুস হয়ে গেল মাঝ রাস্তায়। ভিজতে ভিজতেই গাঁয়ে ঢুকে সে বাইকের স্পিড কমিয়ে ধীর গতিতে চালাচ্ছিল।
ফটিক কাঞ্জিলালের জমির কাছ বরাবর এসে সে অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখতে পায়। একটা মেয়ে ওই প্রবল বৃষ্টিতে ফাঁকা জমিটায় দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো ঘুরে ঘুরে নাচছে।
পাগল নাকি মেয়েটা?
বাইক থামিয়ে নেমে এল সে।
এই! তুমি কী করছ এখানে?
মেয়েটা জবাব দিল না। ভ্রূক্ষেপও করল না তার দিকে। যেমন ঘুরে ঘুরে নাচছিল তেমনই নেচে যেতে লাগল।
এই সোহাগ! সোহাগ! বাড়ি যাও।
মেয়েটা সম্পূর্ণ সম্মোহিতের মতো নেচেই যাচ্ছিল। জবাব দিল না, তাকালও না।
নিতান্ত বাধ্য হয়েই এগিয়ে হঠাৎ মেয়েটার পথ জুড়ে দাঁড়াল বিজু।
শুনতে পাচ্ছ? কী হচ্ছে এখানে?
মেয়েটা বেভুলে ঘুরতে ঘুরতে এসে ধাক্কা খেল তার সঙ্গে। তখনই বিজু প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও শুনতে পেয়েছিল মেয়েটা বিড়বিড় করে অস্ফুট উচ্চারণে কিছু বলে যাচ্ছে। মন্ত্রের মতো।
ধাক্কা খেয়ে মেয়েটা হঠাৎ জলকাদার মধ্যে ধড়াস করে পড়ে গেল। এমন অদ্ভুত ছিল পড়াটা। খাড়া অবস্থা থেকে গাছ যেমন পড়ে তেমনই টানটান শরীর নিয়ে পড়ল। চারদিকে খোয়া ইট, পাথরের টুকরো। মাথা কেটে যেতে পারত।
ভয় পেয়ে গেল বিজু। মেয়েটা পড়ে নড়ছিল না।
গাঁয়ে লোকলজ্জার ভয় আছে। মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলতে পারত বিজু। সেটা করার সাহস না পেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ডাল, এই যে সোহাগ! ওঠো। তোমার কী হয়েছে?
সোহাগ জবাব দিল না। ওই প্রবল বৃষ্টিতে নির্বিকারভাবে পড়ে রইল।
অগত্যা দুটো কাঁধ ধরে তাকে তোলার চেষ্টা করতে লাগল বিজু। মেয়েটার কপালে নিউমোনিয়া লেখা আছে। কিন্তু মূৰ্ছিত সোহাগকে বসানোও যাচ্ছিল না। তুললেই ফের পড়ে যাচ্ছে। কী যে মুশকিল হয়েছিল বিজুর। একবার ভাবল গিয়ে লোকজন ডেকে আনবে। কিন্তু ওই প্রবল বৃষ্টি এবং ঠান্ডায় লোজন পাওয়াও মুশকিল।
যখন প্রবল দুশ্চিন্তায় দ্বিধাগ্রস্ত বিজু সোহাগের বৃষ্টিস্নাত মুখের দিকে চেয়ে আছে তখনই হঠাৎ তার দুর্গের প্রাকারে নয়, কোনও অন্ধ রন্ধ্রের পথে চোর ঢুকছিল অবরোধের ভিতর। নিজের হৃদয়কে সে দুর্বল হয়ে যেতে টের পাচ্ছিল।
আর তখনই হঠাৎ খুব ধীরে চোখ খুলছিল সোহাগ। অস্ফুট একটা উঃ শব্দ করে সে বৃষ্টির ঝাপটা থেকে মুখ বাঁচাতে দু হাতে মুখ ঢাকা দিল। স্বপ্লেখিতের মতো উঠে বসল।
সোহাগ!
কে আপনি?
আমি বিজু। তুমি এখানে কী করছিলে?
সোহাগ বৃষ্টির ঝরোখার ভিতর দিয়ে তাকে দেখল। চিনতে পারল। তারপর বলল, আমি যা-খুশি করছিলাম। আপনাকে তো আমি ডাকিনি।
