আটকায়। ও তুমি বুঝবে না। আর প্রেমের যা-সব ছিরি দেখছি তাতে ও ব্যাপারটার ওপরেই আমার ঘেন্না ধরে গেছে।
একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পারুল বলে, বুঝেছি। তোর তো দেখছি গভীর বিপদ।
না পারুলদি, বেশ আছি। মেয়েদের নিয়ে ভাবতে হয় না বলে অন্য সব ব্যাপারে মন দিতে পারি। নারীচিন্তা কিন্তু অন্য সব চিন্তাকে খেয়ে নেয়।
পারুল রুমালে মুখ চেপে খুব হাসল। বলল, হ্যাঁ রে তুই ব্রহ্মচর্য-টর্য করছিস না তো! বিবেকানন্দের বই-টই পড়ছিস নাকি?
কেন, পড়া কি খারাপ?
বদহজম হলে খারাপ। নইলে ভালই তো।
না, ওসব নয়। আমি পিউরিটানও নই। আসলে আমি তেমন মেয়ের দেখাও পাইনি যাকে দেখলে দয়ে পড়ে যেতে হয়।
বড় বড় চোখে চেয়ে পারুল বলে, একটাও নয়?
না পারুলদি, একটাও নয়।
কথাটা কি মিথ্যে বলল বিজু? ভাবের ঘরে চুরি! একথা ঠিক তার জীবনে কোনও মহিলার আবির্ভাব ঘটেনি এতকাল। কিন্তু এখন সে অতটা নিশ্চিত নয়।
এরকম ঘটনা যে ঘটতে পারে তা তার স্বপ্নেও কখনও মনে হয়নি। তার একটা স্পর্ধিত অহং আছে। সেই অহং তাকে পাঁচিলের মতো ঘিরে রেখেছে এতকাল। সুন্দর চেহারা, মেধাবী ছাত্র, রবীন্দ্রসংগীতের দারুণ কণ্ঠ এবং বড় বাড়ির ছেলে– এইসব গুণাবলীর জন্য সে কৈশোরকাল থেকেই চুম্বকের মতো মেয়েদের আকর্ষণ করেছে। কিন্তু তাকে একটা মন্ত্র সেই অবোধ বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছিল তার বাবা, দেখো বাবা, মেয়েদের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করো না। মায়ের জাত, তাদের সম্মান রাখতে হয়।
তাদের বংশে এই ধারাটা আছে। পুরুষেরা একটু এইরকম, মহিলাদের এড়িয়ে চলে। যখন সে বর্ধমান কলেজে পড়ে তখন ইউনিয়ন করত। খেলাধুলোয় ভাল ছিল বলেও বেশ নামডাক। সেই সময়ে বুলবুলি নামে ফুটফুটে একটি মেয়ে খুব ঘুরঘুর করত তার কাছে। ছোটখাটো, রোগা, কিন্তু ভারী মিষ্টি দেখতে ছিল সে। নানাভাবেই সে নিত্য নিজেকে নিবেদন করতে চাইত। তাকে দেখে মাঝে মাঝে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ত বিজুও। অনেক সময়ে তাদের দীর্ঘ সংলাপও হয়েছে।
বুলবুলি বলত, আমার চোখে চোখে তাকাও না কেন বলো তো! তোমার কি ভয় আমি তোমাকে হিপনোটাইজ করে ফেলব?
খানিকটা হিপনোটিজম তো মেয়েদের মধ্যে থাকেই। কিন্তু কথাটা উঠছে কেন? চোখে চোখ রাখাটা কি জরুরি?
আমার কাছে জরুরি।
কেন?
একটু বোঝার চেষ্টা করো। তুমি বোকা নও।
না নই। বোকা নই বলেই বোকামিটা করি না।
তুমি কি আমাকে ভয় পাও?
না বুলবুলি, আমি বোধহয় নিজেকেই ভয় পাই।
আমাকে নিয়ে কখনও ভাব? যখন একা থাকো?
না-ভাবার চেষ্টা করি।
আমি সবসময়ে তোমার কথা ভাবি। তুমি কেন ভাব না?
তোমাকে কখনও বলা হয়নি, মানুষের মহার্ঘ্য মস্তিষ্কটা অর্থহীন, প্রয়োজনহীন চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকে বলেই অধিকাংশ মানুষ তার মাথাকে সঠিক ব্যবহার করতে পারে না।
ওসব শক্ত শক্ত কথা বলছ কেন? সহজ করে বলো।
সহজ করে বললে বিচ্ছিরি শোনাবে যে।
অর্থাৎ আমার কথা ভাবলে তোমার সময় নষ্ট হয়?
অনেকটা তাই।
এ কথায় বুলবুলির চোখ ভরে জল এল। ধরা গলায় বলেছিল, এরকম অপমান আমাকে কেউ কখনও করেনি জানো?
ভাল করে ভেবে দেখো বুলবুলি, এটা অপমান নয়। এটা এক ধরনের আত্মরক্ষা। বন্ধুত্ব থেকে অবসেশন জন্ম নিলে সমস্যা হবে।
কেন, সমস্যা কীসের?
ভাল লাগার তো শেষ নেই। একটা ভাল লাগার স্টেজ শেষ হলে আর একটা ভাল লাগার স্টেজ আসতে পারে। জীবন পরিবর্তনশীল।
আবার শক্ত শক্ত কথা বলছ?
তুমি বুঝতে চাইছ না বলে শক্ত মনে হচ্ছে। একটু ভাবো তুমি। একটু গভীরভাবে ভাবো।
বুলবুলির সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠতর সম্পর্কের সম্ভাবনা সেদিনই শেষ হয়ে যায়।
এরকম হব-হব সম্পর্ক আরও তৈরি হয়েছে তার জীবনে। বারবার। শেষ অবধি বিচিত্র সব বহিরাক্রমণেও অটুট থেকেছে তার দুর্গ। ফটক ভাঙেনি, বিজয়োল্লাসে ঢুকেও পড়েনি কেউ।
লুঠেরা না থাক, তস্কর তো আছে। তারা দেয়াল ভাঙে না, সিঁদ কেটে আসে।
অষ্টমী পুজোর দিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। তুচ্ছ সামান্য ঘটনা।
মনে না রাখলেও চলে। তবু কী করে যেন থেকে গেছে মনে। তার প্রিয় বানর বজরংকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। সামনেই বলি হচ্ছে। ঢাক বাজছে দ্রিমি দ্রিমি। রাজ্যের লোকের ভিড় চারদিকে। তার মধ্যেই হঠাৎ এক জোড়া বিহ্বল চোখ তার দিকে অপলক চেয়েছিল। ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে উঠছিল লজ্জায়। তবু চোখ দুটো সরিয়েও নিতে পারেনি মেয়েটা। বজরং একাধ থেকে ওকাঁধে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল, চুল ধরে টানছিল বিবেকের মতো। বিজু খুব অস্বস্তির সঙ্গে সরে এসেছিল ভিড় থেকে।
পুজোর ভাসানের দিন প্যান্ডেলে মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল একটু তফাতে। সবাই লরিতে উঠল হুড়মুড় করে। মেয়েটির চোখ চকচক করছিল লোভে। কিন্তু শেষ অবধি সে এসে আর দশজনের মতো উঠল না লরিতে, দাঁড়িয়ে রইল একা, ফাঁকা প্যান্ডেলে। এবং সে নির্ভুল চোখে তাকিয়েছিল বিজুর দিকেই। বিজুই যে এই বাহিনীর সর্দার তা জানত সে। হয়তো সে দূরাকাঙ্ক্ষা করেছিল, বিজু তাকে ডাকবে। ডেকে নেবে। কিন্তু বিজু তাকে ডাকবে কেন? সবাই নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছে, সকলেরই প্রবল উৎসাহ, শুধু ওই অহংকারী মেয়েটাই দেমাক দেখাচ্ছিল। বিজুর কী দায় পড়েছিল ডাকার!
পরে মেয়েটা পান্নাকে দুঃখ করে বলেছিল, আমাকে তো কেউ ডাকেনি।
