ডাকোনি। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে
তাতে আপনার কী?
তোমার ঠান্ডা লাগবে ভেবে–
আপনি আমার স্পেলটা ভেঙে দিয়েছেন।
কী ভেঙে দিয়েছি?
আপনি বুঝবেন না। বুঝবার মতো বুদ্ধি আপনার নেই।
রেগে গেলেও নিজেকে সংবরণ করে বিজু বলল, তুমি একটা ঘোরের মধ্যে ছিলে, তাই ভাবলাম–
প্লিজ! আপনি আমার অনেক ক্ষতি করেছেন। এখন দয়া করে চলে যান।
যাব?
হ্যাঁ, যাবেন।
বিজু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি নিজেকে কী ভাব তা তুমিই জানো। আমি তোমাকে পাগলের মতো কাণ্ড করতে দেখেই এসেছিলাম।
আমি একজন পাগলই। আপনি দয়া করে যান।
রেগে গেলে মানুষ অনেক সময়ে বোকার মতো কথা বলে। বিজুও বলল, এইজন্যই মানুষের উপকার করতে নেই।
দু হাতে ভেজা এবং ভিজন্ত চুল গুছি করে একটা খোঁপার মতো বেঁধে নিতে নিতে সোহাগ বলল, আমি আপনার উপকার চাই না তো! কে বলেছে আপনাকে আমার উপকার করতে?
আচ্ছা, ঠিক আছে! এর বেশি আর কথা জোগায়নি বিজুর মুখে। সে বৃষ্টির মধ্যে এসে ফের তার বাইক স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। আর হতভাগা, বিশ্বাসঘাতক মোটরবাইকটা জলে ভিজে কিছুতেই আর স্টার্ট নিল না। বাইকটা ঠেলে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিজু দেখতে পেল, উন্মাদিনী সোহাগ পান্নাদের বাড়ির দিকে ছুটছে।
কী ভাবছিস বল তো! অনেকক্ষণ চুপচাপ।
লজ্জা পেয়ে বিজু বলে, একটা স্পেল।
তার মানে কী?
কী যেন ভাবছিলাম একটা। ভুলে গেছি।
লুকোচ্ছিস।
না, সত্যিই ভুলে গেছি।
এবার চল একটু কেনাকাটা করি।
কী কিনবে?
কিছু ঠিক করিনি। শহরে যখন এসেই পড়েছি, মার জন্য কিছু নিয়ে যাই।
বড়মা! বড়মার জন্য আবার কী নেবে? জ্যাঠামশাই মারা যাওয়ার পর থেকে তো বড়মা একেবারে বৈরাগী হয়ে গেছে। দু হাত্তে কত জিনিস বিলিয়ে দিল। আমাকে কী দিয়েছে জানো?
কী রে?
জ্যাঠামশাইয়ের দুটো পার্কার কলম, একটা জেনিথ ঘড়ি, পুরনো একটা প্রিন্স কোট, দশটা রুপোর টাকা।
হ্যাঁ, মা যেন কেমন হয়ে গেছে।
আমি বলেছিলাম, জ্যাঠামশাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এগুলো রাখো। কী বলল জানো?
কী?
বলল স্মৃতির কোনও চিহ্ন লাগে না। আমার বুক জুড়ে, চোখ জুড়েই তো লোকটা আছে। জিনিসগুলো বরং ভোগে লাগুক। এরকম ভালবাসা ভাবাই যায় না, কী বলে?
পারুল একটু হাসল। বলল, এরকম ভালবাসা আর আনুগত্যই তো তোরা পুরুষেরা চাস।
যা বলেছ। তবে চাইলেই তো হবে না। দেনেওয়ালারও তো ইচ্ছে অনিচ্ছে আছে।
পুরুষেরা সবসময়েই কলোনিয়াল প্রভুদের মতো মেন্টালিটির হয় কেন রে? তারা রাজা, মেয়েরা প্রজা।
মাইরি পারুলদি, সেরকম হলে কিন্তু বেশ হত।
মারব থাপ্পড়। এখন ওঠ। খাবারের দাম আমি দিয়ে দিয়েছি।
আরেব্বাস! কখন দিলে?
তুই যখন হাঁ করে কার কথা ভেবে আনমনা ছিলি তখন।
যাঃ, কার কথা আবার ভাবলাম!
সে কি আর তুই আমাকে বলবি? তবে ঠিক বের করে নেব। গোয়েন্দা লাগাতে হবে।
২৬-৩০. চড়াই পাখিটা
২৬.
চড়াই পাখিটা ছিল ব্যাচেলার। গত বছর দুয়েক ধরে তাকে লক্ষ করছে বিজু। তার দোতলার একটেরে ঘরে জানালার ধারে কাঠের আলমারির ওপর রাখা একটা পটের পিছনে সন্ধেবেলায় এসে আশ্রয় নিত। সকালে উড়ে যেত বিষয়কর্মে। বাসা-টাসা করেনি। কোনও ঝামেলা ছিল না তার।
পাখিটা মরল হারানির দোষে। দোষ কিছুটা মায়েরও। পাখিটা মরতে পারে এই ভয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানটা কখনওই চালায় না বিজু। যদিও অভ্যাস ও স্বাভাবিক আত্মরক্ষার তাগিদে চড়াইপাখিরা সিলিং ফ্যান এড়িয়ে ওড়াউড়ি করতে পারে। তবু সাবধানের মার নেই। হারানিকে পই পই করে বলা আছে, ঘর মোছার পর শুকনোর জন্য যেন সিলিং ফ্যান না চালানো হয়। এখন শীতকাল, শুকনো জলীয় বাষ্পহীন বাতাসে চট করে ঘর শুকিয়ে যায়।
দোতলায় এই একটিই ঘর। তা বলে চিলেকোঠা নয়। আসলে একতলা হওয়ার পর দোতলাও তুলে ফেলছিল নরহরি। তিন ভাইয়ের মাথাতেই ছিট আছে। তাদের জীবনে মাপজোখ বা হিসেবনিকেশের বালাই নেই। তিনজনেরই ঝোঁকের ওপর চলা। আবার সঙ্গে চণ্ড মেজাজও আছে, কেউ কিছু তাদের বোঝাবে তার জো নেই। দোতলা যখন তেড়েফুঁড়ে উঠছে তখন বিজুর মা প্রমাদ গুনল। কারণ একতলাটাই পেল্লায়। পাঁচখানা শোওয়ার ঘর, বৈঠকখানা, দর-দালান সব হাঁ-হাঁ করছে। দুটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, আছে শুধু ছেলেটা। তিনটে প্রাণীর জন্য একতলাটাই তো বড় বড়। কিন্তু নরহরিকে সে কথা বোঝাবে কে? অগত্যা বিজুর মা গিয়ে মহিম রায়কে ধরে পড়ল, দাদা, আপনাদের ভাইকে একটু বোঝাবেন আসুন। কী কাণ্ড যে করছে। অত বড় একতলাটাই আমি সামাল দিতে পারছি না, দোতলা তো আমাদের গিলে খাবে। টাকারও শ্রাদ্ধ হচ্ছে।
মহিম রায় শুনে বলেছিল, বংশের ধারা যাবে কোথায় বউমা, সব যে এক ছাঁচে গড়া। ওদের মাথায় যা চাপে তা মানায় কার সাধ্য। গৌরদাকেও তো দেখি, উঠল বাই তো কটক যাই।
তা মহিম রায় এসেছিল।
নরহরি মহা আহ্লাদে নতুন বাড়ি তাকে ঘুরিয়ে দেখাল।
কেমন দেখছেন দাদা?
এ যে তাজমহল বানিয়ে ফেলেছিস!
কী যে বলেন! চিরকাল বড় বাড়িতে থেকে অভ্যেস তো, তাই একটু বড় করেই বানালাম।
তা বেশ। কিন্তু বড়রও তো একটা মাপ থাকবে, না কি?
কেন, একটু বেশি বড় বয়ে গেল নাকি?
ওরে আহাম্মক, বড় বাড়িতে ছিলি, তা সেখানে বড় সংসারও ছিল। জনমনিষ্যি ছিল। কিন্তু তোর জন কোথায়? পাঁচখানা শোওয়ার ঘর তোর কোন কাজে লাগবে? একটাতে স্বামী-স্ত্রী, একটাতে বিজু, আর দুখানা ঘরে দুই মেয়ে-জামাই এলে থাকবে–এ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আরও দুখানা শোওয়ার ঘর দিয়ে কী হবে?
