কেন রে মুখপোড়া, কাপড় পালটাব কেন?
তোমাকে এই শয়তানের কলে চাপিয়ে শীতলাবাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনব।
বলাকা চোখ কপালে তুলে বললেন, ওইটেই বাকি আছে আমার কপালে। রক্ষে কর বাপু, বুড়ো বয়সে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে দ হয়ে থাকতে পারব না।
আরে, চলোই না, একবার চড়লেই বুঝতে পারবে জিনিসটা মোটেই ভয়ের নয়।
আমার আর আহ্লাদের দরকার নেই বাবা। ওসব তোরা চড় গে।
দেখ বড়মা, বেশি কথা কইবে তো হাটে হাঁড়ি ভাঙব কিন্তু।
ওমা, চোখ রাঙায় দেখ! কী হাঁড়ি ভাঙবি রে মুখপোড়া?
জ্যাঠামশাই একসময়ে মোটরবাইক চড়ত, আমি জানি। একটা গাবদা-গোবদা বি এস এ মোটরবাইক ছিল তখন। তুমি তাতে চেপে জ্যাঠার সঙ্গে শহরে সিনেমা দেখতে যেতে।
তোর মাথা। তোর জ্যাঠা আমাকে মোটে একদিন চাপাতে পেরেছিল।
মোটে একদিন?
তাও অনেক সাধাসাধির পর। আর সে যা কাণ্ড হয়েছিল। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজও যায়নি দুড়ুম করে আমি পড়ে গেলুম।
এ মা!
আর বলিসনি। হাঁটু ছড়ে, শাড়ি ছিঁড়ে বিদিকিচ্ছিরি কাণ্ড। ওই একবারই।
তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। ভাবলুম নতুন বাইকটায় তোমাকে চাপিয়ে নিয়ে ঘুরে আসব একটু। আমার মা তো দিব্যি কাল আমার সঙ্গে ঘুরে এল।
আহা, ও ছুঁড়ির আর বয়স কী? আমার চেয়ে বছর দশেকের ছোট।
বয়স নয় বড়মা, এ হল স্মার্টনেসের প্রশ্ন। তুমি একদম স্মার্ট নও। অথচ আমি তোমাকে স্মার্ট বলে ভাবতুম।
আর আমার স্মার্ট হওয়ার দরকার নেই বাবা। কিন্তু দুচাকার জিনিসে বিশ্বাস নেই। কেন যে তোর বাবা মত দিল তাও বুঝি না।
অবশেষে বিজু এসে পারুলকে পাকড়াও করল।
চলো তো পারুলদি, তোমাকে নিয়েই একটা চক্কর দিয়ে আসি।
আজ ভাল লাগছে না রে।
আচ্ছা, তোমরা সবাই নন কো-অপারেশন করলে কেমন করে হয় বল তো! বড়মা রিফিউজ করল, তুমিও।
পারুলের অবশ্য ভয় নেই। গাড়ি কেনার আগে জ্যোতিপ্রকাশের স্কুটার ছিল। বহুবার চেপেছে পারুল। নিজেও চালাতে পারত। আজ অবশ্য মেজাজটা ঠিক নেই। তবু শেষ অবধি রাজি হল সে। ছেলেমেয়ে দুটো আজ ছোট কাকার সঙ্গে বর্ধমানে গেছে ওদের বাবাকে সি অফ করতে। কীসব কেনাকাটা করে দুপুরে ফিরবে। বাড়িটা ফাঁকা লাগছে বলে বেরিয়ে পড়ল পারুল।
কিন্তু বাইক চলতেই বুঝতে পারল, কাজটা ঠিক হয়নি। বড্ড ঠান্ডা বাতাস লাগছে। কান কনকন করছে, হাত পা সিটিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ওই গতি আর খোলা হাওয়া তার মাথা থেকে মনখারাপটাকে ঝেঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
একবার মুখ ফিরিয়ে বিজু বলল, বর্ধমান যাবে পারুলদি?
অত দূর যাবি! দরকার কী?
আহা চলোই না। ঘরে বসে থেকে হবেটা কী?
বড্ড ঘিঞ্জি শহর, সাবধানে চালাস।
বর্ধমানে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে বিজু বলে, চলো পারুলদি কিছু খেয়ে নিই। বড্ড খিদে পেয়েছে।
দুর! আমার তো একটুও খিদে নেই। এই তো একটু আগে মা জোর করে লুচি তরকারি খাওয়াল। গলা অবধি হয়ে আছে বাবা।
ডায়েটিং করার বদ অভ্যাসটা ছাড়ো তো পারুলদি। আমি জানি তুমি একটার বেশি দুটো লুচি খাও না। না হয় হবেই একটু মোটা, তা বলে খাওয়ার আনন্দটাকে ভোগ করবে না? জীবনটা কদিনের শুনি!
হয়েছে, তোকে আর ফিলজফি ঝাড়তে হবে না। তুই খা, আমি বসছি।
যখন গোগ্রাসে টোস্ট আর ওমলেট খাচ্ছিল বিজু তখন এক কাপ দুধ-চিনি ছাড়া চা নিয়ে চুপচাপ বসেছিল পারুল। একটা চুমুকও দেয়নি। দোকান-টোকানে খেতে তার বড় গা ঘিন ঘিন করে।
তোর সত্যিই খুব খিদে পেয়েছিল, না রে?
খুব। তোমার আর আমার মধ্যে তফাত কী জানো? আমি খিদে পেলে খাই, আর তুমি সুঁটকি মেরে থাক।
আমার আড়াই মন ওজন হলে তুই কি আমাকে তোর মোটরবাইকে তুলতে সাহস পেতি?
কেন, অসুবিধে কী আছে? আমার বাইকটা কীরকম সফিসটিকেটেড জানো?
তুই একটা ক্যাবলা।
কেন বলো তো!
মোটরবাইকের পেছনে চাপাতে হয় গার্লফ্রেন্ডকে। তোর গার্লফ্রন্ড জোটে না কেন বল তো!
দুর দুর, ওসব তোমাদের সেকেলে ধারণা। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরার মধ্যে কোনও গ্ল্যামার নেই। আজকাল। গণ্ডায় গণ্ডায় ঘুরছে।
ও বাবা! তুই যে অনেক এগিয়ে গেছিস! গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরাটাও সেকেলে হয়ে গেছে বুঝি?
আমার কাছে তাই।
আসল কথাটা বললেই তো হয়।
আসল কথাটা কী?
তোর গার্লফ্রেন্ড নেই।
বিজু এক গাল হাসল, কথাটা মন্দ বলোনি। সত্যিই নেই।
কেন নেই রে? চেহারাখানা তো সুন্দর। তোর চেহারায় আমি বাবার আদল পাই। তেমনই লম্বা, ফর্সা, তোর কাছে মেয়েরা ঘেঁষে না কেন?
ঘেঁষবে কী করে? পাত্তা দিলে তো?
পাত্তা দিলেই তো হয়।
বিজু মাথা নেড়ে বলে, হয় না পারুলদি। আমাকে ছেলেবেলা থেকে শেখানো হয়েছে মেয়েদের সঙ্গে সম্মানজনক দূরত্ব রাখতে হয়। মাখামাখি করতে নেই। বড় হয়ে আমি গাঁয়ের যুব সমাজের অভিভাবক। স্বনিযুক্ত অভিভাবকই ধরে নাও। আমি কি পারি মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে?
এত বেশি পিউরিটান হলে তুই যে এই বয়সেই বুড়োটে মেরে যাবি!
কী আর করা যাবে বলো। রক্ষক হয়ে তো ভক্ষক হতে পারি না। কোথাও কোনও মেয়ের ওপর কোনও রকম হামলা হলে, অপমানের ঘটনা ঘটলে আমরা গিয়ে তো রুখে দাঁড়াই। সেই আমিই যদি প্রেম-ট্রেম করে বেড়াই তাহলে লোকে বলবে কী?
দুর পাগলা, দুটোকে গুলিয়ে ফেলছিস কেন? মেয়েদের রক্ষা করিস সে তত ভাল কথা, তাতে প্রেম করা আটকায় কীসে?
