এখান থেকে ফটিক কাঞ্জিলালের ফাঁকা বাস্তুজমিটা দেখা যাচ্ছে। সেখানে সামান্য একটা ধুলোর ঘূর্ণি উঠল। নেচে নেচে বেড়াল এদিক সেদিক। পান্না জানে, ওইখানে জ্যোৎস্না রাতে পরিরা নেমে আসে। যে গাছটায় গলায় দড়ি দিয়েছিল লোকটা সেই গাছটার চারপাশে পরিরা খেলা করে আর ফটিক কাঞ্জিলাল দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে দেখে আর খুব হাসে।
বিজুদাই গল্পটা বলেছিল। ফাঁসির দড়িটা দিয়ে নাকি কাঞ্জিলাল একটা দোলনা বানিয়ে নিয়েছে। তাইতেই দোল খায় আর পরিদের খেলা দেখে। মা গো! ভাবলেই বুকটা ভয়ে দুরদুর করে। তবে বিজুদা বড্ড বিচ্ছু। তাকে ভয় দেখানোর জন্যই বানিয়ে বলে কিনা কে জানে।
ফটিকের সঙ্গে তার বউ আশালতার ছিল ভীষণ ঝগড়া। আশালতা কতবার মরতে গেছে। আর ফটিক নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে বলে শাসাত।
মরার দিন সকাল থেকে ঝগড়া লেগেছিল খুব।
শেষে ফটিক বলল, দেখবে? মজা দেখাব?
দেখাও না! তোমার পাল্লায় পড়ে কত মজাই তো দেখলুম। আর কী দেখাবে?
তখন কিন্তু থই পাবে না।
থই আমার এখনও নেই।
সবাই বলে, কাঞ্জিলাল খুব গুছিয়ে মরেছিল। টাকাপয়সা সব আদায়-উশুল করে বউয়ের নামে গচ্ছিত রেখে, কাজকারবার গুটিয়ে একটু বেশি রাতের দিকে নাইলনের দড়িগাছ নিয়ে নিরিবিলিতে গিয়ে–ম্যাগো!
আশালতাকে মজা দেখিয়েছিল বটে কাঞ্জিলাল। সে কী বুকফাটা কান্না মেয়েটার! বয়সও তত বেশি নয়। বাইশ-টাইশ হবে।
কিন্তু মুশকিল হল, দুনিয়াটা বড্ড নিষ্ঠুর। দুদিন পরেই সবাই সব কিছু ভুলে যায়। সব আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
বর-বউয়ের ঝগড়া তার চারদিকে। বর-বউতে যে কেন এত ঝগড়া হয় তা বোঝে না পান্না। সে যদি বিয়ে করে তাহলে সে একদিনও ঝগড়া করবে না তার বরের সঙ্গে। একবারও না।
ওলো পতিসোহাগী লো, দেখা যাবেখন বিয়ের পর। বিয়ের আগে কত কথাই থাকে মেয়েদের। বুঝবি মজা।
ছোট জ্যাঠাইমা বড্ড ঠোঁটকাটা। ভাল কিছু ভাবতেই চায় না।
প্রথমে এক ফোঁটা দু ফোঁটা বৃষ্টি উড়ে এল। তারপর হঠাৎ অ্যাই বড় বড় শিল পড়তে লাগল নষ্টচন্দ্রের ঢিলের মতো। সরে এল পান্না। আর দেখতে পেল একটা মেয়ে ফটিকের জমির পাশ দিয়ে কুঁজো হয়ে দৌড়ে আসছে। গায়ে গরমজামাটা পর্যন্ত নেই। সোহাগ।
.
২৫.
মন মানুষকে খায় নানাভাবে। কখনও বাঘের মতো হালুম করে এসে লাফিয়ে পড়ে ঘাড় মটকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কখনও অজগরের মতো ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে থাকে। কাকে কখন কী ভাবে খাবে তার কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম তো নেই। যখন শত্রু তখন ষোলো আনা শত্রু। আবার যখন পোষ মানে তখন মনের মতো বন্ধুই বা কে। তখন তুমি মরুভূমিতে থাকলেও সে অধরা হয়ে নাচ দেখাবে। ঝড়ের দরিয়ায় সে বন্দরের ছবি টাঙিয়ে দেবে। কখনও ঈশ্বর, কখনও শয়তান, কখনও নিয়তি।
অমলকে খাচ্ছে অজগরের মতো। ধীরে ধীরে একটা অমন মানুষ তার ক্ষুরধার বুদ্ধি, ঝকঝকে মেধা নিয়েও অজগরের গরাস হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই আর ছাড়িয়ে নিতে পারছে না নিজেকে।
ভাবতে একটু কষ্ট হয় পারুলের।
মন আজ ভাল নেই। ভোররাতে বাবাকে স্বপ্ন দেখেছে সে। মরা মানুষকে স্বপ্ন দেখা কি ভাল? বার। বার? গত সাতদিনে বোধহয় বারতিনেক বাবাকেই স্বপ্নে দেখেছে সে। ভোররাতে আজ দেখল, বিরাট বড় একটা বাড়ি আর তার অফুরান গড়ানে বারান্দা পুবের রোদে ভেসে যাচ্ছে। এই অত বড় বারান্দা ধু ধু করছে জনহীনতায়। কেউ কোথাও নেই। আর আশ্চর্য, সেই বারান্দাটা কোথাও শেষ হয়নি। সে হাঁটছে তো হাঁটছেই। কেন যে শেষ হচ্ছে না ছাই কে জানে। ভীষণ ভয় করছিল তখন। ধ্যাত, এত বড় বারান্দা কে যে বানাল। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন বলল, যা না, আরও যা, একসময়ে শেষ হবে ঠিকই।
কে বলল কথাটা? ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে সে দেখল, বাবা। তেমনই ফর্সা টকটকে রং, তেমনই মস্ত গোঁফ, তেমনই সুন্দর।
ও বাবা, তবে যে লোকে বলে তুমি মরে গেছ?
দুর বোকা! মরব কেন? এই একটু বেড়িয়ে এলুম।
এ বাড়িটা কে বানাল বল তো! এত বড় বারান্দা কেন?
তা ঠিক, বারান্দাটা একটু বড়। চল তোকে এগিয়ে দিই।
এর আগেও বারদুয়েক বাবাকে স্বপ্নে দেখেছে সে। স্বপ্ন নিয়ে তার তেমন কোনও কুসংস্কার নেই। আবার এও মনে হয়, কী জানি বাবা, স্বপ্নের মধ্যেও কোনও ইশারা ইঙ্গিত থাকতেও পারে।
সকাল থেকেই আকাশে মেঘলা ভাব। মনের মধ্যেও তাই। জ্যোতিপ্রকাশ আজ ভোরে চলে গেল জামশেদপুর। মন খারাপের সেটাও একটা কারণ। বিয়ের পর যখন বরের সঙ্গে ভাব হল তখন সম্পর্কটা উত্তেজক, মাদক। তখন দুজনেরই দুজনের জন্য আনচান অবস্থা। চোখে হারাই ভাব।
তারপর ধীরে ধীরে সেই আকর্ষণের তীব্রতা কমতে লাগল। কিন্তু অন্যরকম একটা টান জন্মাতে লাগল তা থেকে। এখন বরকে ছেড়ে থাকলে একটা কেমন নিরাপত্তার অভাব টের পায় সে।
অবশ্য সেখানে রান্না আর কাজের লোক আছে। তার বরের কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তবু পারুলের একটু খুঁতখুঁত করে। মনটা সেই কারণেই আজ কেমনধারা হয়ে আছে যেন।
সকালে বিজু এল তার নতুন মোটরবাইক নিয়ে। সবে কিনেছে। ভট ভট করে ফটক দিয়ে ঢুকে সোজা উঠোনে এনে দাঁড় করিয়েই হক মারল, বড়মা! ও বড়মা।
বলাকা ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে বললেন, শয়তানের কলটা শেষ অবধি কিনেই ফেললি?
শিগগির কাপড়টা পালটে এসো।
