দুর বোকা! ওসব শুনলে খারাপ লাগে। একবার বাতিল হয়েছি তো, সেই ঘা-ই শুকোয়নি।
ইউ আর এ ম্যাড উওম্যান। আর সেইজন্যই তোমাকে ভাল লাগে। আই লাভ এভরিথিং ম্যাড।
দুর পাগল! তোর যে কী সব অলক্ষুণে কথা! হ্যাঁ রে, তোর মায়ের সঙ্গে আমার ভাব করিয়ে দিবি?
অবাক হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে সোহাগ বলে, ইউ আর ইমপসিবল। কেন ভাব করতে চাও বলো তো!
ইচ্ছে করছে। ঝগড়া হওয়ার পর থেকে মনটা ভাল নেই।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, নো ডাইস।
মানে কী রে?
মানে চান্স নেই। আমার মা একজন স্টাবোর্ন উওম্যান। বাবার সঙ্গে বা আমার সঙ্গে যখন ঝগড়া হয় তখন দিনের পর দিন আমাদের ভাব হয় না। এখন তো মায়ের সঙ্গে কখনওই আমার ভাব নেই। সব সময়েই আমাদের সম্পর্ক খারাপ।
তবে থাক, ভাবের দরকার নেই।
দরকার নেই পিসি।
তুই তোর মাকে পছন্দ করিস না?
আমরা কেউ কাউকে পছন্দ করি না।
তা হলে কী করে থাকিস?
অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে আমি তো থাকব না।
কোথায় যাবি?
পালাব।
চোখ বড় বড় করে সন্ধ্যা বলে কোথায় যাবি?
তা জানি না। শুধু জানি পালাব।
ওরে বাবা, ওসব ভাবতে নেই। মেয়েরা পালালে ভীষণ বদনাম।
হোক না বদনাম!
কোনও ছেলের সঙ্গে?
কোনও পুরুষের সঙ্গে পালানোটা ভীষণ ভ্যাতভ্যাতে ব্যাপার। কাওয়ার্ড মেয়েরাই ওরকম পালায়। না, আমি একাই পালাব।
পালিয়ে কোথায় যাবি?
তা কিছু ঠিক করিনি। একটা জায়গায় তো যাব না, সন্ন্যাসিনী হয়ে একা একা ঘুরে বেড়াব।
যাঃ, এই বয়সে সন্ন্যাসিনী হবি কী রে?
সন্ন্যাসিনীর ব্যাপারটা ক্যামোফ্লেজ। ক্যামোফ্লেজ বোঝো?
না।
ছদ্মবেশ।
ছদ্মবেশ মানে তো ভেক ধরা।
ভেক? তার মানে?
ছদ্মবেশ। দুজনেই হাসে।
ভেক ধরবি কেন? ‘
কোনও দেশেই একা যুবতী মেয়ে তো নিরাপদ নয়। তাই সন্ন্যাসিনী সাজলে খানিকটা হয়তো সেফ।
ছাই সেফ। কত সন্ন্যাসিনীও রেপ হয়।
ওসব ভাবলে কি হয় পিসি? দুনিয়াটা নিজের চোখে দেখতে হবে না?
দুনিয়াটা তো তুই অনেক দেখেছিস, আর কী দেখার আছে?
আরও কত কী দেখার আছে, জানার আছে। একা একা ঘুরে বেড়ানোর থ্রিলই আলাদা।
তোর বাপু বড় দুর্জয় সাহস।
হ্যাঁ, আমার ভয়-টয় করে না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলে, আমার কখনও পালানোর ইচ্ছে হয় না। কিন্তু আমারই বোধহয় পালানো উচিত। তাই না?
পালালে না কেন পিসি?
ভয় করে যে! তোর মতো সাহস তো আমার নেই। ছেলেবেলা থেকেই জেনে এসেছি, আমি অবলা মেয়েমানুষ। আর মেয়েদের দুনিয়াটা হল ভয়ভীতিতে ভরা। তোর মতো সাহস থাকলে ঠিক পালাতুম। তুই তবু অনেক কিছু দেখেছিস, আমি তো একটুখানি জায়গায় সারাজীবন কলুর বলদের মতো ঘুরে মরছি।
কলুর বলদ কী?
ওঃ, তোকে আর বোঝাতে পারি না। ঘানিগাছ জানিস?
না তো! তবে আর তোকে বুঝতে হবে না বাপু। বিয়ে হয়ে দুর্গাপুর গিয়েছিলুম, সেই যা বাইরে যাওয়া। দু-তিনবার কলকাতায় গেছি। আর আমার সর্বতীর্থ সার হল বর্ধমান। মোল্লার দৌড় মসজিদ অবধি। এর বাইরের পৃথিবীটা কেমন তা জানাই হল না।
তুমি আর পারবে না পিসি।
মাথা নেড়ে সন্ধ্যা বলে, না, আর পারব না। বড্ড আটকে পড়েছি। স্বামী নেই, সন্তান নেই, তবু পিছুটানও কি কম! নিজেই মায়া সৃষ্টি করে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছি। অথচ সবই তো ফক্কিকারি।
ফকিকারি! বাঃ বেশ শব্দটা তো!
মানে জানিস?
আন্দাজ করতে পারি।
কী বল তো!
নাথিংনেস।
ও বাবা, ওটা আবার আমি জানি না।
এখানে এসে আমি অনেক শব্দ শিখে গেছি।
গাঁয়ে কিন্তু লোকে কথায় কথায় অনেক খারাপ খারাপ শব্দ উচ্চারণ করে। সেগুলো শিখিসনি যেন।
হি হি করে হেসে সোহাগ বলে, হ্যাঁ, খুব স্ল্যাং শব্দ। পোঁদের কাপড়, পাছা, মাগী, আরও বলব?
রক্ষে কর বাপু, আর নয়। খবরদার যার-তার সামনে বলিসনি যেন!
আচ্ছা পিসি, চার দিকটা এমন অন্ধকার হয়ে গেল কেন বলো তো!
ও মা! তাই তো! এখন তো মোটে বেলা তিনটে, এত তাড়াতাড়ি তো রোদ মরে যাওয়ার কথা নয়। মেঘ করেছে বোধহয়। দেখ তো জানালার কাছে গিয়ে!
সোহাগ এক ছুটে জানলার কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখে বলল, ওঃ পিসি, শিগগির দেখবে এসো।
কী রে?
কী সাংঘাতিক মেঘ!
দুর বোকা! মেঘ আবার সাংঘাতিক কী রে! শীতকালে তো মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়ই।
আমার মনে হচ্ছে ইটস এ টুইস্টার।
সেটা আবার কী?
টর্নেডো। সাংঘাতিক ঝড়।
না না, এটা ঝড়ের সময় নয়।
তুমি টুইস্টার দেখনি?
সেটা কীরকম বলবি তো।
আমরা যখন ফ্লোরিডায় ছিলাম তখন একবার দেখেছি।
কীরকম বল তো?
ঘূর্ণিঝড়, সব উলটেপালটে দেয়, উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমি চোখের সামনে একটা টয়োটা গাড়িকে উড়ে যেতে দেখেছি।
এই মেয়েটা, ভীষণ ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে। গরমজামা গায়ে দিয়ে আয়।
দুর! আমার কুটকুট করে যে!
তাহলে ওই লাল পশমি চাদরটা গায়ে দে। আলনায় আছে। কাচা চাদর, ঘেন্নার কিছু নেই।
ঘেন্না নয়, আমি সব সময়ে যে অ্যাটমোসফিয়ারটাকে ফিল করতে চাই।
তোর মাথা। জানলার কাছ থেকে সরে আয়। ইস্ বাতাসে যেন বরফের কুচি মিশে আছে। বুকে ঠান্ডা লাগলে আর দেখতে হবে না।
.
এক উন্মাদ ক্ষ্যাপা হাওয়া কোথা থেকে ময়লা ছেঁড়া কাগজের মতো মেঘের টুকরো কুড়িয়ে এনে জড়ো করছিল আকাশের এক কোণে, সকাল থেকে। দুপুরের পর থেকে সেই মেঘ জুড়ে জুড়ে কালো স্লেটের গায়ের মতো মেঘের মহাপর্বত তৈরি হল। ওই থমথমে, কালো, ভয়ংকর মেঘখানাকে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল সে। ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটায় তার কান কনকন করছে, চোখে জল আসছে, গাঁটে গাঁটে ব্যথা। গলায় খুশখুশি তুলছে শীতের সরু সরু আঙুল। আর শরীরের ভিতরে যেন হাঁটু মুড়ে বসে আছে একশো বছরের এক থুরথুরে বুড়ি।
