মা তো ওরকমই। যা মুখে আসে বলে।
দ্যাখ, আমাদের বংশের গৌরব হল তোর বাবা। অমল রায়কে এক ডাকে গাঁয়ের সবাই চেনে, সম্মান করে। আজ অবধি ওরকম রত্ন ছেলে এ-গাঁয়ে আর কেউ হয়নি। তার সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলতে আছে? আমরা না হয় খারাপ–
তুমি খারাপ নও পিসি।
হ্যাঁ রে, আমি কি তোকে কানমন্তর দিই, বল না?
কানমন্তর কাকে বলে?
কানমন্তর কাকে বলে জানিস না?
না তো!
কানমন্তর হল–দুর ছাই, ও আমি তোকে বোঝাতে পারব না। মানেটা বোধহয় খারাপ সব পরামর্শ দেওয়া।
তুমি তো শুধু আমার সঙ্গে গল্প করো।
তোর মাকে সে কথা কে বোঝাবে বল। তার ধারণা আমার সঙ্গে মিশে তুই খারাপ হয়ে যাচ্ছিস। লেখাপড়া জানি না বটে, কিন্তু আপন পিসিটা তো! আমি কি তোর খারাপ করতে পারি?
সোহাগ একটু হাসল, আমিই তো খারাপ।
যাঃ, তুই কেন খারাপ হতে যাবি?
আমিই খারাপ পিসি। আমার অনেক দোষ আছে।
দোষঘাট সকলেরই একটু-আধটু থাকে। মানুষ তো আর ভগবান নয়।
আচ্ছা, তুমি তো একজন ওয়ার্কিং উওম্যান, তোমার এত সেন্টিমেন্ট থাকবে কেন?
কথাটা ইংরিজি হলেও বুঝতে পারল সন্ধ্যা। মুখখানা ভার করে বলল, সে তুই বুঝবি না। আমার ভিতরটা তো পুড়ে আংরা।
তার মানে কী?
দুর মুখপুড়ি, তুই যে কেন সব কথা বুঝতে পারিস না!
দুজনেই হেসে ফেলে। তারপর সন্ধ্যা একটু থমথমে গলায় বলে, কত কষ্টে তোদের সঙ্গে অল্পস্বল্প ভাব হচ্ছিল। হঠাৎ কোথা থেকে যে কী হয়ে গেল সেদিন! আমার মোটেই ঝগড়া করার ইচ্ছে ছিল না। তবু হয়ে গেল। সেদিন থেকে কেবল ভয় হয়েছে, তুই বুঝি আর আমার ঘরে আসবি না, আড়িই করে দিবি বুঝি!
আড়ি মানে বয়কট না?
হ্যাঁ। তার ওপর দুদিন তুই এলি না, কথাও বললি না। তখন ভীষণ মনটা খারাপ লাগতে লাগল। ভাবলুম, সোহাগ বোধহয় আমার ওপর রাগ করেছে। করবেই তো। নিজের মায়ের অপমান কার সহ্য হয় বল। যত ভাবতুম তত কান্না পেত।
একটা চাপা দুষ্টু হাসি হাসছিল সোহাগ। ভারী ভাল দেখায় ওকে ওই হাসিটাতে। বলল, কী করব বলো। দুদিন আমাকে একটু শাসনে রাখা হয়েছিল।
শাসন! হ্যাঁ রে, তোর মা কি তোকে মারধর করেছে নাকি?
সে তো আছেই। প্রায়ই আমাকে মায়ের হাতে মার খেতে হয়।
বলিস কী? সোমত্ত মেয়েকে মারতে আছে?
শি ইজ এ বিচ।
তার মানে কী?
ওটা তোমার জানার দরকার নেই। বাংলায় অনেক কথা খুব খারাপ শোনায়, ইংরিজিতে ততটা নয়।
তবে থাক। ওই জন্যই ইংরিজির ওপর আমার রাগ।
হি হি করে বাচ্চা মেয়ের মতো হাসল সোহাগ।
খুব মেরেছে?
ওসব আমি গায়ে মাখি না। মারুক না; কত আর মারবে?
আমিও মায়ের হাতে অনেক মার খেয়েছি। বোকাহাবা ছিলুম তো, মা তাই খুব মারত। কিন্তু ডাগর হওয়ার পর আর গায়ে হাত তুলত না।
বোকা হাবা ছিলে কেন?
ছিলুম কী রে, এখনও তাই আছি। বোকা বলেই তো গতি হল না। আমার মাথায় একটুও বুদ্ধি নেই। তাই তো গতরে খেটে পুষিয়ে নিতে হয়।
তুমি কি নিজেকে খুব বোকা ভাব?
বোকাই তো। সবাই তাই ভাবে।
ওটা কিন্তু অটো সাজেশন।
তার মানে কী রে?
মানুষ নিজেকে খারাপ ভাবতে ভাবতে ওরকমই হয়ে যায়। কনফিডেন্স থাকে না।
একটা শ্বাস ফেলে সন্ধ্যা বলল, কী করব বল। ছেলেবেলা থেকেই সকলের মুখে শুনে আসছি, আমি নাকি মাথা-মোটা। গবেট, বোকা, কুচ্ছিত। শুনতে শুনতে সেটাই বিশ্বাস হয়ে গেল। ওই জন্যই বোধহয় কপালে সংসারও টিকল না।
তুমি বোকা নও পিসি।
এখন আর নিজেকে নিয়ে ভাবিই না। সব ভাবনাচিন্তা হামানদিস্তায় ফেলে গুঁড়ো করে দিই। দিলুম তো জীবনটা একরকম কাটিয়ে।
তোমার প্রবলেমগুলো কিন্তু খুব ছোটখাটো।
এক গাল হেসে সন্ধ্যা বলে, সেটাও খুব ভাবি। দুনিয়ায় কত কী হয়ে যাচ্ছে বলে শুনি মাঝে মাঝে। সেসব নিয়ে এক মিনিটও ভাবনা হয় না। আমার সব ভাবনাচিন্তা আচার, কাসুন্দি, মশলাপাতি, পাওনাগণ্ডা, হিসেবনিকেশ নিয়ে। ছোট মাপের মানুষদের সমস্যাও ছোটখাটোই তো হবে।
তা নয় পিসি!
তবে কী?
তুমি যে মনের দরজা বন্ধ করে রাখো। দুনিয়াকে ঢুকতেই দাও না তোমার ভিতরে।
কী সুন্দর যে বলিস তুই! বেশ বলিস তো! একরত্তি মেয়ে হলে কী হবে, তোর খুব বুদ্ধি!
ছাই! বলে খুব হিহি করে হাসে সোহাগ, এ কথাটা তোমার কাছে শিখেছি। আজকাল কথায় কথায় বলি, ছাই!
আহা, কী ভাল কথাই না শিখলেন আমার কাছে থেকে! তবে শেখাবোই বা কী! আমি কি ভাল কথা জানি কিছু! হ্যাঁ রে, বুডোরও কি তোর মতোই খুব বুদ্ধি?
বুডঢা! বুডঢা মেরিটোরিয়াস। ক্লাসে ভাল গ্রেড পায়। আর পড়াশুনোয় খুব সিরিয়াস। আমার চেয়ে ওর বুদ্ধি অনেক বেশি।
ওর সঙ্গে আলাপই হল না ভাল করে। হয়তো মনে মনে ঘেন্না পায় আমাকে।
না, বুডঢা ইজ নট দ্যাট টাইপ। ও হল গুঁড়ি গুডি বয়। আমার মায়ের সঙ্গে একমাত্র বুডঢারই যা একটু ভাব।
মায়ের তো ছেলের ওপর টান থাকবেই। আমার মারও দেখেছি, মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের ওপর টান অনেক বেশি। অনেক, অনেক বেশি।
ওটা মায়েদের একটা কমপ্লেক্স। তুমি বুডঢার সঙ্গে আলাপ করতে চাও? তা হলে ডেকে আনতে পারি কিন্তু।
না বাবা থাক, যা গম্ভীর।
মোটেই তা নয় কিন্তু। আসলে খুব ফাজিল। খুব হাসাতে পারে। মুখটা গম্ভীর করে রাখে বটে, কিন্তু সেটা ওর মুখোশ।
না বাবা, ডেকে আনতে হবে না। বড় সাজানো ব্যাপার হবে তা হলে। আমার লজ্জা কি জানিস? ঝগড়ার সময় ছেলেটা সামনেই ছিল। সব শুনেছে। কী মনে করল কে জানে। সেই থেকে ওর চোখের দিকে চাইতেই পারি না আমি।
