হেঃ হেঃ করে হেসে ধীরেন বলে, ওঃ গন্ধটা যা ছেড়েছে।
খান খুড়া, খান। আগো, আরও দুইখান রুটি দাও খুড়ারে। খুড়া খাইতে ভালবাসে।
আরে না না, রুটি তো আছে।
আরে, লজ্জা কীসের? পেট ভইরা খান।
ধীরেনকে আর বলতে হল না।
উঠোনের ওধারে সুমন চাপা স্বরে মরণকে জিজ্ঞেস করে, লোকটা কে রে?
ও হল কাষ্ঠ জ্যাঠামশাই। রাস্তায় ঘাটে আমরা ওকে ক্ষ্যাপাই।
পাগল নাকি?
কী জানি।
তবে ক্ষ্যাপাস কেন?
একটু কেমন যেন। ছেঁড়া ময়লা জামাকাপড় পরে ঘোরে। একটু লোভী আছে।
এখানে আসে কেন?
বাড়িতে খেতে পায় না তো। গরিব।
খুব গরিব?
তা জানি না। কাষ্ঠ জ্যাঠামশাইকে কেউ পাত্তা দেয় না।
হ্যাঁ রে, বাবা ওকে কাকা ডাকে, তুই তাহলে জ্যাঠা ডাকিস কেন?
কাঁচুমাচু হয়ে মরণ বলে, সবাই ডাকে বলে আমিও ডাকি। ডাকের খুব গোলমাল এখানে।
হঠাৎ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে যাওয়া সুমনের একটা স্বভাব। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল বেভুল হয়ে। তারপর বলল, চল বেড়িয়ে আসি।
দাঁড়াও, মাকে বলে আসি।
সুমন হঠাৎ একটু গম্ভীর মুখ করে বলে, আমিও কিন্তু তোর একজন গার্জিয়ান। আমার সঙ্গে গেলে তোর মা কিছু বলবে না।
তা ঠিক। সুমন যেন গুরুঠাকুরটি। তার প্রতিটি কথাকেই মা ভীষণ গুরুত্ব দেয়। তবু মুখটা মলিন হল মরণের। দাদা এই মাত্র বলল তোর মা। এটা কানে খট করে বড় লাগল মরণের। দাদা তো শুধু মা বললেই পারত।
আজও দাদা তার মাকে মা বলে ডাকেনি।
রাস্তায় বেরিয়ে মরণ বলল, আজ কোন দিকে যাবে দাদা?
ওই দিকটায়।
বলে যে দিকটায় দেখাল সে দিকটায় তারা রোজই যাচ্ছে আজকাল। ও পথটা পান্নাদিদের বাড়ির কাছ ঘেঁষে গেছে। দাদা আজকাল এই পথটাই বেশি পছন্দ করে।
দিন পাঁচ-সাত আগে পান্নাদি জ্বর থেকে উঠে মলিন মুখে জানালায় দাঁড়িয়ে ছিল।
দাদা দেখে বলল, কে রে মেয়েটা?
ও তো পান্নাদি।
কী করে?
পান্নাদি! ওঃ পান্নাদি খুব ভাল ছাত্রী। গান গায়, নাচে, নাটকে পার্ট করে।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
কার মেয়ে বল তো।
রামহরি জ্যাঠার মেয়ে। আলাপ করবে?
না থাক।
আমার সঙ্গে খুব ভাব কিন্তু।
তোর সঙ্গে তো দেখছি বিশ্বসুদ্ধু সকলের ভাব!
হ্যাঁ। আমি তো পান্নাদিদের বাড়ির নারকোল পেড়ে দিই।
অন্যের ফাইফরমাশ খাঁটিস কেন? তুই কি ওদের চাকর?
কথাটা বুঝতে পারল না মরণ। লোকে কিছু বললে সে করে দেয়। এটাই রেওয়াজ। তার সঙ্গে চাকরের কী সম্পর্ক। দাদার রাগের কারণটা বুঝতে না পারলেও মরণ আর একটা জিনিস বুঝতে পারে যেটা তার বোঝার কথা নয়। সে বুঝতে পারে, তার এই শহুরে দাদাটি পান্নাদিদের বাড়ির সামনে দিয়ে আনাগোনা করতে পছন্দ করে।
পান্নাদি একদিন তাকে ডেকে বলেছিল, তুই আজকাল কার সঙ্গে ঘুরে বেড়াস রে? ছেলেটা কে?
ওমা চেনো না! ওই তো আমার দাদা।
পান্না অবাক হয়ে বলে, দাদা! তোর আবার দাদা কোত্থেকে এল?
বাঃ, আমার কলকাতার দাদা!
বুঝতে তবু একটু সময় লেগেছিল পান্নার। খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে হঠাৎ হেসে ফেলেছিল, ওঃ তাই তো! ও বোধহয় তোর বড়মার ছেলে, তাই না!
হ্যাঁ তো। দেখতে সুন্দর না?
হ্যাঁ, বেশ দেখতে। দাদাকে পেয়ে খুব আনন্দ বুঝি তোর! তাই আজকাল আর আসিস না।
তা নয় পান্নাদি। আজকাল বাবা প্রায়ই চলে আসে তো, তাই।
তোর দাদা কী করে?
পড়ে। কলেজে।
কী পড়ে?
বি এসসি বোধহয়। ঠিক জানি না। একদিন নিয়ে আসব।
আনিস।
পান্নাদির কথা সে দাদাকে বলেও দিয়েছিল পরে। তখন লক্ষ করল, দাদার মুখে একটু হাসি খেলা করে গেল আর উজ্জ্বল হল দুটো চোখ।
এসব সে আজকাল বুঝতে পারে, যদিও এসব তার বোঝার কথা নয়। না বোঝার ভান করেই থাকতে হয় তাকে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে সে সব বুঝতে পারে।
দাদা আজও পান্নাদিদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাবে এবং আসবে। কিন্তু পান্নাদি জানালায় দাঁড়িয়ে থাকে না। দাদা একটু যেন হতাশ হয়। তার ইচ্ছে করে পান্নাদিকে গিয়ে বলতে, আমি যখন দাদাকে নিয়ে তোমাদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাব তখন তুমি একটু জানালায় দাঁড়িয়ে থেকো।
পান্নাদি তখন হয়তো অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করবে, কেন রে?
তখন সে মুচকি হেসে পালিয়ে আসবে।
এসব আগে সে বুঝত না। এখন বুঝতে পারে। তার সামনে একটা নতুন পৃথিবী জেগে উঠছে। তাতে সে খুশি হয় তা নয়। বরং অনেক সময় তার ভিতরে একটা যন্ত্রণা হয়।
একদিন সে তার মা আর বাবাকে মধ্যরাতে দেখে ফেলেছিল। ঘর অন্ধকার ছিল তবু দেখে ফেলেছিল। ভয়ে শ্বাস বন্ধ করে ছিল সে। কী করছে ওসব বাবা আর মা! এঃ মা। ওসব করতে হয়? বাবাকে তার খুন করতে ইচ্ছে হয়েছিল সেদিন।
.
২৪.
আমি ভেবেছিলুম তুই আর আমার মুখদর্শন করবি না, সম্পর্কও রাখবি না।
তা কেন পিসি?
তোর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করলুম যে। মাথা গরম হয়ে গেলে আজকাল আমার লঘু-গুরু জ্ঞান থাকে না। মুখ দিয়ে ছোটলোকী বচন বেরিয়ে যায়। কী যে সব বলে ফেললুম!
মাও তো তোমাকে কম বলেনি।
সে বলুক গে। আমি কি আর তেমন ভারিক্কী লোক! আমার মান-অপমান বলে তো কিছু নেই। হয়েও গেছি ছোটলোক। গতর খাটিয়ে খাই। তোর মা তো তা নয়। মুখ আমার বড় শত্রুর।
তুমি কেঁদো না পিসি। ব্যাপারটা ঠান্ডা হতে দাও। সব ঠিক হয়ে যাবে।
সে তো হবে। কিন্তু মনটা খারাপ থাকবে। তুইও তো দুঃখ পেলি। পেলি না?
না তো। আমার মা ডিজার্ভস ইট।
মেজদা সম্পর্কে ও কথাটা কেন যে বলল বউদি!
