ও। তাহলে কি ব্যবসাটা তুলে দেবেন?
তুলে দিতেও মায়া হয়।
তাহলে?
উপযুক্ত কাউকে পেলে বিদ্যেটা শিখিয়ে ব্যবসা তার হাতে তুলে দিতে পারলে নিশ্চিন্ত হতাম।
সে তো ভাল প্রস্তাব।
তোমাকে আমার খুব পছন্দ।
আমাকে! কিন্তু আমাকে দিয়ে কি হবে?
খুব হবে। ব্যবসাটা খারাপও নয়। খাটাতে পারলে স্বচ্ছন্দে পেট চালাতে পারবে। আমিও সাহায্য করব।
ভেবে দেখি।
ও রে বাপু, ভাবতে বসলে আর কাজ হবে না। আগু-পিছু করতে থাকবে।
বন্দোবস্তটা কী রকম হবে?
বন্দোবস্তটস্ত কিছু নেই। সোজাসুজিই বলছি মেয়ে আমার ফ্যালনা নয়।
মেয়ে!
হ্যাঁ। আমার বড় মেয়ে মালতীর কথাই বলছি। এই যে মিনতিকে দেখছ এর চেয়ে দুগুণ সুন্দর দেখতে, আরও ফর্সা। যদি বিয়ে করো তাহলে সব দিক রক্ষে হয়।
বিয়ে! ভ্রূ কুঁচকে খানিক বিয়ে নিয়ে খুব ভাবল ধীরেন। গাঁগঞ্জ জায়গা। লোকে কিছু করার না থাকলে পট করে বিয়ে বসে যায়। ধীরেনের তখনও বিয়ে হয়নি, নানা গণ্ডগোলে মাথায় আসেওনি কথাটা। তবে প্রস্তাবটা পেয়ে তার মনে হল, বিয়ে করলেও হয়তো মনটা অন্য দিকে ঘুরে যেতে পারে। যে কারণে বাঙাল দেশে পালাতে চেয়েছিল সেই একই কারণে বিয়েও করা যেতে পারে। প্রস্তাবটা মন্দ নয়।
ওহে বাপু, বেশি ভেবো না। ভাবনাচিন্তা বড় কর্মনাশা। তাতে জীবনে ওই আগু-পিছু চলে আসে। ওতে কাজ ভণ্ডুল হয়।
একটু ভাবতে তো দেবেন মশাই। মাথার ওপর মা-বাবাও আছেন।
শোনো বাপু, মোমের কারবারে আমার পাঁচ হাজার টাকা খাটছে। যদি পুরো ব্যবসাটাই তোমাকে দিই তাহলে বড় কম পাচ্ছ না। হিল্লে হয়ে গেল বলেই ধরে নিতে পারো। আর এ যা মোমবাতি দেখছ এগুলোই তো নয়, আমি গির্জায় সাহেবরা যে মোম জ্বালে তাও বানাই। ব্যবসা ধরে রাখতে পারলে লুটেপুটে খেতে পারবে।
দাঁড়ান, মা-বাবাকে আগে গিয়ে বলি।
তুমি রাজি তো!
পট করে কী যে বলি!
মোটপর তোমার অমত নেই। কাল সকালে দোকান গুটিয়ে আমি প্রথম তোমার বাড়িতে যাব। তোমার মা বাবাকে রাজি করিয়ে তবে দেশে ফিরব।
বৃন্দাবন যে কী দেখে তাকে পছন্দ করেছিল কে জানে! দুনিয়ায় কত আহাম্মকই থাকে। ধীরেনের বাবার অবস্থা যে খুব খারাপ ছিল তা নয়। তবে জমিজমার ওপর নির্ভর। নগদ টাকার বিশেষ টানাটানি। একটা পেট বাড়লে খুব ইতরবিশেষ হবে না বটে, কিন্তু নতুন বউয়ের সুখেরও বিশেষ কারণ ঘটবে না। তার ওপর পয়সাওলা ঘর থেকে আসবে।
ধীরেনের দুশ্চিন্তা একটু হচ্ছিল বইকী।
ওই ভাবনাচিন্তার মধ্যেই প্রস্তাব চালাচালি হয়ে গেল। খারাপ প্রস্তাবও তো নয়। মুষলের মতো একটা ছেলে ঘরে বসে বাপের অন্ন ধ্বংস করছে, শ্বশুর যদি হিল্লে করে দেয় তো ভালই।
তা হয়েও গেল বিয়ে।
মালতী দেখতে কিছু খারাপ নয়। রং ফর্সার দিকেই। নাকটা একটু থ্যাবড়া না হলে আরও ভাল হত।
বিয়ের রাতেই মালতী জিজ্ঞেস করেছিল, মদগাঁজার নেশা নেই তো!
না, আমার নেশা নেই। থাকলে কি তোমার বাপ বিয়ে দিত আমার সঙ্গে?
বাবা কি সব খবর নিয়েছে?
নেশা থাকলে কী করবে?
নেশারু লোক আমি সইতে পারি না। নেশা দেখলে বাপের বাড়ি চলে যাব।
কথাটা বিয়ের আগে জানতে চাইলে ভাল করতে।
বিয়ের আগে মেয়েদের কিছু জানতে দেওয়া হয় নাকি? পুঁটুলি পাকিয়ে এনে ফেলা হয় ছাঁদনাতলায়।
ও বাবাঃ! তুমি যে বেশ কটর কটর কথা কও।
হ্যাঁ, আমার সব পষ্টাপষ্টি কথা।
জ্বালাবে দেখছি! ফুলশয্যার রাতেই এত স্পষ্ট কথা!
সব জেনেবুঝে নেওয়া ভাল।
আর কী জানতে চাও?
মেয়েমানুষের দোষ নেই তো!
থাকলে?
থাকলে মুশকিল হবে।
ধীরেন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। বউকে তার ভারী অপছন্দ হতে লাগল প্রথম থেকেই।
সে বলল, দোষঘাট কোন মানুষের না থাকে বলল! মেয়ে পুরুষ সবার থাকে।
তার মানে আছে।
আমি কি তাই বললুম?
তাহলে পষ্ট করে বললে না কেন যে তোমার মেয়েছেলের দোষ নেই?
বললেই তুমি মেনে নেবে?
বলেই দেখ না!
শোনো মালতী, আমার একটা মানসম্মান আছে। পায়ে ধরে সেধে তো বিয়ে করে আনিনি। তুমি যদি অতই সতী তবে বাপকে বললে না কেন বিয়ের আগে খোঁজখবর নিতে!
বলেছি। বাবা পাত্তা দেয়নি। কোন মেলায় তোমাকে দেখেই বাবার পছন্দ হয়ে গিয়েছিল।
সেখানে তোমার বোন মিনতিও ছিল।
মিনতি ছেলেমানুষ, সে কী বুঝবে?
তাহলে এখন আর বোঝার কিছু নেই। আমি মাতাল বা চরিত্রহীন যাই হই, তোমার স্বামী।
ওটাই কি তোমার জোর? স্বামী বলেই মাথা কিনে নিয়েছ?
আমি কিনতে যাইনি। তোমার বাবা গছিয়েছে। তুমি একটি গেছে মেয়েছেলে।
ফুলশয্যার রাত্রিটা ঝগড়া করেই কেটেছিল দুজনের। আদর সোহাগের নামগন্ধ ছিল না।
তবে একথা সত্যি যে মেয়েদের গতিই বা আর কী। সে আমলে স্বামী ছেড়ে চলে যাওয়ার হিম্মৎই বা কটা মেয়ের ছিল?
সুতরাং মালতীর সঙ্গে তার ভাবও হল দু-চারদিন পরে। গৃহত্যাগ করার ইচ্ছেটাও ধামাচাপা পড়ে গেল।
ধীরেন ভাবে বৃন্দাবন হঠাৎ উদয় না হলে তার জীবনটা অন্য খাতে বইতে পারত। গৃহত্যাগ করে সে হয়তো একদিন এক কেবিন্ধু হয়েই ফিরে আসত। এরকম তো কতই হয়।
এতকাল নানা ঝড়ঝাপটা সয়েও মালতীও আছে, সেও আছে, ছেলেপুলেও আছে। তবে সব মিলিয়ে ভাল কিছু হয়ে উঠল না।
এক বাটি ধোঁয়া ওঠা গরম ডাল একটা স্টিলের প্লেটে বসিয়ে নিজেই নিয়ে এল বাসন্তী। হলুদ ডালের ওপর অনেকটা ঘিয়ের দলা ভেসে আছে।
