একথা সে কথার পর সে জানল, দোকানির বাড়ি নদীয়ার গাঁয়ে। সে ভালমানুষের মতো জিজ্ঞেস করল, ওদিকটায় কিছু সুবিধে-টুবিধে হয়?
কীসের সুবিধে বাপু? এদিকও যেমন ওদিকও তেমন।
তা বটে, তবে ইদিকে আমার সুবিধে হচ্ছে না। বাঙাল দেশে চলে যাব ভেবেছিলাম, তাও হল না। এখন ভাবছি জয় মা বলে যেদিকে দু চোখ যায় রওনা হয়ে পড়ি।
দোকানি হেসে বলে, তা বাপু, অনেক সময় জায়গার গুণেও কিছু হয়ে পড়ে বইকী। আমার বয়স তো এত হল, অভিজ্ঞতাও কম হল না। মনে হয় কোনও কোনও মানুষের কোনও কোনও জায়গা সহ্য হয় না। অন্য জায়গায় গেলে তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়।
ধীরেন আশান্বিত হয়ে বলে, আমারও সেরকমই মনে হয়।
তা নদীয়ায় গিয়েও দেখতে পার। বা অন্য কোথাও। তবে বাপু, তাতে হয়রানি বাড়বে। ঘরের খেয়ে লড়াই করা যায়, অন্য জায়গায় গিয়ে আতান্তরে পড়ে গেলে পারবে কি?
টুকটাক পুতুল বিক্রি হচ্ছিল মন্দ নয়। মেয়েটাই বিক্রিবাটা করে পয়সা গুনে নিচ্ছে। বছর পনেরো ষোলো বয়স, ফ্রক পরা, গায়ে লাল সোয়েটার, দুই বিনুনি ঝুলছে।
ওটা আমার মেয়ে। খুব বাপক্যাংলা। যেখানে যাই সঙ্গে নিয়ে যেতে হয়। তা বাপু, কী করা হয় টয়?
অনেক কিছুই করে দেখেছি। কিছু তেমন হচ্ছে না।
চাষবাস আছে?
আছে। সামান্য। পেটের ভাতটুকু জোটে।
কারবারে নামতে চাও নাকি?
সে তো খুব ইচ্ছে যায়। কিন্তু টাকা কোথায়?
সেই তো কথা।
এইভাবে আলাপ বেশ জমে গেল।
সন্ধের পর দোকানি হ্যাজাক জ্বেলে দিল, ধূপ-ধুনো লাগাল, হ্যাঁজাকের আলোয় মেয়েটা যেন হঠাৎ করে ফুটে উঠল। বিকেলের মরা আলোয় তেমন দেখায়নি, এই আলোতে দিব্যি দেখাচ্ছিল। যেন বহুরূপী।
দেখতে ভালবাসে ধীরেন। আর মেয়েটাও ঘন ঘন তাকাতে লাগল তার দিকে। এইভাবেই সব হয়-টয় আর কী।
দোকানির নাম বৃন্দাবন পাল। বলল, মেলার কয়েকদিন আছি। ইদিকে এলে দেখা করে যেও। গল্প টল্প করা যাবে।
একদিন ফাঁক দিয়ে গেলও ধীরেন। মেয়েটার হ্যাঁজাকের আলোয় দেখা মুখখানা দুদিন ভুলতে পারেনি। হ্যাজাক বাতির কী জাদু আছে কে জানে!
গিয়ে দেখল, দোকানি সওদা করতে গেছে। মেয়েটা একা দোকান সামলাচ্ছে। মেলার শেষ দিন ছিল সেটা। দোকানে বেশ ভিড়। রমরম করে মোমের পুতুল বিকিয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা সামাল দিতে পারছে না। বয়সের মেয়ে দেখে বখাটে ছেলে-ছোকরাও জুটেছিল কয়েকটা।
তা ধীরেনের তখন বেশ শক্ত জোয়ান চেহারা। গায়ের জোরও ছিল মন্দ নয়। সে গিয়ে মেয়েটার পাশে দাঁড়িয়ে যেতেই ভিড়টা একটু একটু করে পাতলা হল।
মেয়েটা কাঁদো কাঁদো মুখে বলল, কতগুলো পুতুল চুরি হয়ে গেছে, জান! চোখের সামনেই পটাপট তুলে নিয়ে গেল। যেই বললুম, দাম দিলে না যে, অমনি বলে, দিয়েছি তো! এই তো গুনে নিলে!
ইস, আমি একটু আগে এলেই হত।
ভাগ্যিস এলে, নইলে এতক্ষণে সব লুটপাট হয়ে যেত।
মেয়েটাকে ভাল করে দেখল ধীরেন। তখনও দিনের আলো আছে, হ্যাজাক জ্বলেনি। তবু বেশ লেগেছিল দেখতে। ডাগর ফর্সা চেহারা, চোখ দুখানা মিঠে তাতে তখনও রাগ-অভিমান-ভয় মেশানো চাউনি। একটু জলও চিকচিক করছিল চোখে।
ধীরেন ভরসা দিয়ে বলল, আর ভয় নেই। আমি আছি কিছু হবে না।
অবলা নারীকে রক্ষা করা চিরকালই সবল পুরুষের কর্তব্য। মেয়েটা তার দিকে চেয়ে বলল, রোজই ছেলেগুলো আসে, বাবা থাকলে বেশি কিছু করে না। আজ আমাকে একা পেয়ে
ওরা পাজি ছেলে।
ভীষণ পাজি। কী সব অসভ্য অসভ্য কথা বলছিল শুনিয়ে শুনিয়ে।
তুমি বুঝি সব সময়ে বাবার সঙ্গে থাকো?
না। মাঝে মাঝে। আজকাল মা ছাড়তে চায় না। বড় হচ্ছি তো!
ও, তাও তো বটে।
বাবার একজন কর্মচারী আছে। সব জায়গায় সে বাবার সঙ্গে থাকে। এবার অসুখ করেছে বলে আসেনি।
বড্ড সরল মেয়েটা, নিজের থেকেই অনেক কথা বলে যাচ্ছিল। খুব মন দিয়ে শুনছিল ধীরেন।
বাড়িতে তোমার কে কে আছে?
মা বাবা দিদি, ছোট দুই ভাই, দাদু আর ঠাকুমা।
ইস্কুলে পড় না?
হ্যাঁ, পড়ি তো। ক্লাস সিক্স-এ।
বাবা বুঝি শুধুই পুতুল গড়েন?
পুতুল আমরা সবাই গড়ি। খুব সোজা। মোম গলিয়ে ছাঁচে ফেলতে হয়। গাঁয়ে আমাদের মুদির দোকানও আছে একটা।
তাহলে তো তোমাদের অবস্থা ভালই।
ওই একরকম।
জমিজমা নেই?
হ্যাঁ, তাও আছে।
গোরু বাছুর?
দুটো দুধেল গাই।
পাকা ঘর?
হ্যাঁ।
তাহলে তো তোমরা বড়লোক।
মেয়েটা লাজুক হেসে বলে, না, না, তা কেন? আমাদের গাঁয়ে বড়লোক হল রায়বাবুরা, মুখার্জিবাবু আর সরকারবাবুরা। তাদের অনেক কিছু আছে।
কী আছে তাদের?
রায়বাবুরা তো খুব বড়লোক। মেলা জমিজমা।
আচ্ছা তোমাদের তো বেশ ভাল অবস্থা, তাহলে তোমার বাবা পুতুল বিক্রি করে কেন?
ওটা বাবার শখ। আমার দাদুর মোমের পুতুলের ব্যবসা ছিল। দাদু এখনও ছাঁচ তৈরি করে দেয়।
প্রায় সন্ধের মুখে বৃন্দাবন ফিরল।
এই যে ধীরেন, এসেছ? আমার একটু দেরি হল।
সঙ্গের দু ব্যাগ মালপত্র নামিয়ে ক্লান্ত বৃন্দাবন একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, কালই চলে যাচ্ছি।
হ্যাঁ, আজই তো মেলা শেষ।
তা বাপু, তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
বলুন।
কথাটা একটু আবডালে বলতে হবে।
কয়েক পা তফাত হয়ে মেয়ে যাতে শুনতে না পায় এমন দূরত্বে এসে বৃন্দাবন বিনা ভণিতায় বলে ফেলল, বাপু হে, আমার বয়স হচ্ছে, এই মোম দিয়ে পুতুল বানানোর কারবারে আমার আর পোষাচ্ছেও না।
