বাঙাল দেশে ভাগ্যান্বেষণে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল ধীরেনের। মিদ্দার মরার পর যখন তার আগল পাগল অবস্থা, ঘরে-বাইরে কোথাও শান্তি নেই, বুকের ভিতর সর্বদা হুহু করে মনস্তাপ তখনকার কথা। কাটোয়ায় কিছুদিন আত্মীয়বাড়িতে গিয়ে পালিয়ে ছিল সে। কিন্তু সেটা তো আর পাকা ব্যবস্থা নয়। একদিন ফিরে আসতে হল দেশে। এসে বুঝল, পুলিশের ঝাট কিছু হয়নি। কেউ তার খোঁজখবর বা তল্লাশেও আসেনি। মোটপর মিদ্দার আর তার বউয়ের সঙ্গে তাকে জড়ায়নি কেউ। বুকটার ধুকুর-পুকুর কমল বটে, কিন্তু মাথাটা কেমন পাগল-পাগল হয়ে রইল। নিজের বাড়ি, নিজের গাঁ ভাল লাগছিল না তখন।
মদন সামন্ত বন্ধু তোক। নানারকম ব্যবসা করতে গিয়ে বারবার মার খাচ্ছে। পুঁজিও বেশি ছিল না। মদন তখন বাঙাল দেশে যাতায়াত করছে। সে বলেছিল, ভাবছি ওদিকেই গেড়ে বসব। কিছু জমি কিনতে পারলে না খেয়ে মরার ভয় নেই।
ধীরেন ধরে পড়ল, আমাকেও নিয়ে চল তাহলে।
তুই গিয়ে কী করবি?
যা হোক কিছু করা যাবে। শুনেছি ওটা অন্যরকম দেশ।
তা বটে। কিন্তু গিয়ে হাজির হলেই তো হবে না। আগে থেকে কিছু একটা ভেবেচিন্তে যাওয়া ভাল।
বাঙাল দেশটা দুধ-ভাতের দেশ বলে একটা আবছা কল্পনা ছিল বটে তার। সেটা যে মিথ্যে স্বপ্ন তাও সে বুঝতে পারত। তবু মন দুর্বল হয়ে পড়েছিল বড়। ভেবেছিল, নতুন জায়গায় গেলে কাজকর্ম জুটে যাবে, মাথার পাগল ভাবটাও ঠান্ডা হবে।
মদনের বাড়িতে তখন খুব যাতায়াত। ঘন ঘন মিটিং হচ্ছে দুজনের। কাজের কথা কিছু হত না, আগডুম বাগড়ম নানা ফন্দি আঁটত দুজনে। কারও মাথায় তেমন ঘি ছিল না তো। শুধু কল্পনা ছিল খুব।
তবে মদন চাষবাস-বোঝা মানুষ। বলত, দিনে চাষবাস করব, রাতে নৌকো নিয়ে মাছ ধরতে বেরোব। সেখানে জাল ফেললেই মাছ।
কিন্তু কোথায় শেকড় গাড়বি তা কিছু ঠিক করেছিস?
নাঃ। তবে টাঙ্গাইল জায়গাটা আমার বেশ পছন্দ। সেখানে আমার দাদার এক সম্বন্ধী আছে। বিষয়ী লোক। বলেছে, গেলে ব্যবস্থা করে দেবে।
আমার জন্যে করবে না?
গিয়ে দেখতে পারিস।
তখন ধীরেনের উড়ুউড়ু অবস্থা। যে-কোনও শর্তেই তখন সে এ-দেশ ছাড়তে রাজি। কিছু টাকাপয়সাও জোগাড় করে ফেলল সে। গাড়িভাড়া আর দু-দশ দিনের খরচ তো কিছু আছেই। তারপর মদনকে তাগাদার পর তাগাদা দিতে লাগল।
প্রথম প্রথম মদনের উৎসাহ ছিল খুব। কিন্তু তারপর হঠাৎই একদিন ভারী লাজুক মুখ করে বলল, ওরে একটু অসুবিধে দেখা দিয়েছে।
কী অসুবিধে?
একটু বাধক হচ্ছে। একজন যেতে দিচ্ছে না।
এ কথায় মাথায় বাজ পড়ল ধীরেনের। দেহটা এখানে পড়ে থাকলেও তার মন বাঙাল দেশেই ঘুরে বেড়াচ্ছে। নানা ছবি ভেসে উঠছে চোখের সামনে। রূপকথার দেশের মতো। সেখানে গিয়ে পড়লেই। হয়, সব সমস্যার সমাধান। ভাত কাপড়, মিদ্দারের ভূত, কপালের ফের, কিছুটি আর নাগাল পাবে না তার।
সে মদনের চোখে চোখ রাখতে গিয়ে দেখল মদনের চোখ পিছলে সরে যাচ্ছে। সেখানে অন্য ব্যাপার।
সে বলল, কে তোকে বারণ করল রে? জ্যোতিষ নাকি?
আরে না। আছে একজন।
খোলসা করে বল। আমাকে এত নাচালি, এখন তুই পিছোলে আমার যে অগাধ জল।
না না, তুই বরং একাই যা। আমি দাদার সম্বন্ধীকে একটা হাতচিঠি লিখে দিচ্ছি।
ভয় পেয়ে ধীরেন বলে, হাতচিঠি দিয়ে কী হবে! ওসবের কোনও দাম নেই। সম্পর্কই বা কী বল। তোর দাদার সম্বন্ধী মানে তো মামার গোয়ালে বিয়োনো গাই। তোর আটকাচ্ছে কোথায়?
মদন ভারি অস্বস্তিতে পড়ে বলে, সে একটা কাণ্ডই হয়েছে।
কী কাণ্ড।
দাদার সম্বন্ধীর ব্যাপারে কয়েকদিন দাদার শ্বশুরবাড়ি মুকুন্দপুরে যাতায়াত করতে হয়েছিল তো!
সে খুব জানি। তুই তো প্রায়ই মুকুন্দপুরে যাস।
হ্যাঁ, সেই কথাই তো। যাতায়াত করতে করতে দাদার ছোট শালি মিনতির সঙ্গে ভারী চেনাজানা হয়ে গেছে। ওই করতে করতে যা হয়। দাদার শাউড়িরও আমাকে ভারী পছন্দ।
তাই বল! আশনাই।
তা একরকম ভাই। মুশকিল কী জানিস, ওদেশে যাব শুনে মিনতি ভারী আপত্তি করছে।
কেন, আপত্তিটা কীসের?
সে এ-জায়গা ছেড়ে যাবে না।
বিয়ে করলেও না?
তাই তো বলছে। মিনতির বাবাও বলছে, আমার ছেলে ওদেশে আছে বটে বাপু, কিন্তু আমি সেটা ভাল বলে মনে করি না। ও না যাওয়াই ভাল।
তুই মেনে নিলি?
কাঁদে যে!
খুবই হতাশ হয়ে পড়েছিল ধীরেন।
তার চোখের সামনেই কয়েক মাসের মধ্যে মদন মিনতিকে বিয়ে করে দিব্যি মুকুন্দপুরে গিয়ে বসবাস করতে লাগল।
ধীরেন তবু তক্কে তক্কে ছিল। বাঙাল দেশ না হোক, দুনিয়াটা তো আর ছোট জায়গা নয়। কোথাও না কোথাও চলে গেলেই হল। চলে যাওয়ার ইচ্ছেটা তখন তাকে ভূতের মতো পেয়ে বসেছে। কাউকে ভাল লাগে না, কিছু ভাল লাগে না।
কয়েকজন বন্ধু মানুষের সঙ্গে পৌষের মেলায় হরিহরপুরে গিয়েছিল সে। মাইল দশেক রাস্তা। মেলায় গিয়ে বন্ধুরা সব তাসের জুয়া খেলতে বসে গেল। হরিহরপুরের মেলায় ওইটের খুব চল। ধীরেনের পয়সা নেই, আগ্রহও ছিল না। সে মেলায় ঘুরে ঘুরে বেড়াল খানিক। বেশ জম্পেশ মেলা। ধীরেন দেখতে আর শুনতে বড্ড ভালবাসে। চোখের খোরাক কিছু কম ছিল না সেখানে। জামাকাপড় থেকে শুরু করে খেলনাপাতি। নাগরদোলা থেকে নিয়ে পাঁপড়ভাজা সবই তার কাছে দেখার বস্তু।
দেখতে দেখতেই সে এক ব্যাপারির দোকানে মোমের পুতুল দেখতে দাঁড়িয়ে পড়ল। ছোট, বড় নানা মাপের নানা গড়নের পুতুল। পুতুলে আবার সলতে লাগানো আছে। ইচ্ছে করলে মোমবাতি হিসেবে জ্বালানোও যায়। কে জানে ধীরেনের ভিতরে হয়তো একটু শিল্পবোধও আছে। শিল্পকর্ম দেখতে সে বেশ ভালবাসে। সে দোকানির সঙ্গে ভাব জমিয়ে ফেলল। সে মা কালীর দিব্যি কেটে বলতে পারে, দোকানির সঙ্গে যে কিশোরী মেয়েটি টালুক-টুলুক চারদিকে চাইছিল আর টোপাকুল খাচ্ছিল টুলে বসে তার দিকে একবারের বেশি দুবার তাকায়নি সে।
