গরম চপ পাতে পড়তেই তা ভেঙে মিয়োন মুড়ির সঙ্গে মেখে নিতে লাগল মুনিশেরা। সঙ্গে পেঁয়াজ আর লঙ্কা।
এই দৃশ্য চোখ গোল করে মুগ্ধ হয়ে দেখে ধীরেন। মানুষ খাচ্ছে, এর চেয়ে ভাল ঘটনা আর কী হতে পারে তা তার মাথায় আসে না। পরিপাটি করে খাচ্ছে, তৃপ্তি করে খাচ্ছে, ভগবান যেন সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন।
হঃ হঃ করে খুব হাসে ধীরেন। তার ভিতর থেকে আনন্দ যেন উথলে আসতে থাকে। ছোটখাটো এরকম কত ঘটনাই ঘটে যাচ্ছে দুনিয়াতে। দেখার লোক নেই, চোখ নেই। এইসব ঘটনার ভিতরেও কত রস, কত সৌন্দর্য। একেবারে টইটম্বুর।
বাবার এই উঠোনে বসে থাকাটা মোটেই ভাল চোখে দেখছে না মরণ। সামনে পড়ার বই খোলা রেখে সে হাঁ করে বসে বাইরেটা দেখছে। ওই বাইরেটা তাকে খুব ডাকাডাকি করে সবসময়ে। কিন্তু উঠোনে জ্যান্ত বাঘ বসা। কী করে বেরোবে সে?
তার পড়ার ঘরের পিছনেই রান্নাঘর। আজ মায়ে আর জিজিবুড়িতে খুব একচোট হয়েছে, তা অবশ্য প্রায়ই হয়। জিজিবুড়িকে কতবার মা বের করে দিয়েছে, আবার জিজিবুড়িও শাপশাপান্ত করতে করতে এ-বাড়িতে কোনওদিন আসবে না বলে প্রতিজ্ঞা করে চলে গেছে এবং ফের পরদিন এসেছে। সুতরাং সেজন্য চিন্তিত নয় মরণ, যেটা চিন্তার কথা সেটা হল মা আজ খুব কেঁদেছে। সহজে কাঁদে না তো মা!
ওই দাদা নামছে দোতলা থেকে! দাদাকে দেখলেই একটা আশাভরসা হয় মরণের। দাদাকে কেউ শাসন করে না। বাবা অবধি যেন সমঝে চলে। মরণ জানে সে যখন দাদার মতো বড় হবে তখন তাকেও সবাই খাতির করবে। এমনকী বাবাও। সেই দিনটা যে কবে আসবে তারই প্রহর গোনে মরণ।
সুমন দক্ষিণের বারান্দার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মুনিশদের খাওয়া দেখতে দেখতে বলে, তোমরা বুঝি মুড়ি জলে ভিজিয়ে খাও?
বুড়ো মুনিশ একগাল হেসে বলে, হ বাবা, মুড়ি ভিজিয়ে নিলে ও ভাতের সমান।
আরও বড় এক ধামা মুড়ি নিয়ে এল শীতলা। চুড়ো করে ঢেলে দিল পাতে পাতে। সঙ্গে চপ।
সবাই কথা থামিয়ে চারটে লোকের খাওয়া দেখছে।
রসিক ভারী আহ্লাদের গলায় বলল, খাও হে, ভাল কইর্যা খাও।
বুড়ো মুনিশ শীতলার দিকে চেয়ে বলে, আরও দুধামা নিয়ে এসো তো। ওরে, তোরা থামিস না। বাবুরা দেখছে।
তা খেলও মুড়ি চারজনে। অবিশ্বাস্য। জল মেরে মেরে মুড়ি ভিজিয়ে চপ দিয়ে এক একজন মুড়ির গন্ধমাদন তুলে ফেলল। বাসন্তীর তরকারিও নেমে গেছে। তাই শেষ পাতে মুলো-পালং-বেগুনবাড়ির চচ্চড়িও দু হাতা করে জুটে গেল তাদের।
রসিক বাঙাল হেসে বলে, মাল অন্যের হইলে কী হইব, নৌকা তত তোমাগর। এই যে ঠাইস্যা খাইলা, শ্যাষে ক্ষ্যাতের কামে গিয়া গাছতলায় গামছা পাইত্যা ঘুমাইবা না তো!
বুড়ো মুনিশ বলে, না কর্তা, মুড়ি হালকা জিনিস, নেমে যাবে। খোরাকটা একটু দেখিয়ে রাখলাম আর কী।
ভাল ভাল।
চারদিকে সম্পন্নতার চেহারাটা দুচোখ ভরে দেখছিল ধীরেন কাষ্ঠ। চারদিকে লক্ষ্মীর অদৃশ্য পায়ের ছাপ। সম্পদ উথলে উঠছে। ভারী খুশি-খুশি ভাব সকলের মুখে। নাঃ, বাঙালের বাড়িতে মনটা ভাল হয়ে যায়।
দুখানা করে গরম ধোঁয়া ওঠা রুটি আর গরম চচ্চড়ির এক খাবলা। স্টিলের রেকাবে সাজিয়ে নিয়ে এল বাসন্তী।
ধীরেন খুড়ো, এই নিন।
ধীরেন খুশিতে লজ্জায় গলে গিয়ে বলে, দিলি আমাকে?
ওমা! দেবো না কেন? আমরা তো রান্নায় একটু মিষ্টি খাই, কিন্তু ওঁরা পছন্দ করেন না। তাই চচ্চড়ির হয়তো স্বাদ পাবেন না।
হ্যাঁ, ধীরেন শুনেছে বটে, বাঙালরা রান্নায় চিনি বা গুড় দেওয়া পছন্দ করে না। তাতে রান্নাটা একটু তাহা-তাহা লাগে বটে, কিন্তু ধীরেনের বাছাবাছি নেই। আজকাল তার সবই অমৃত বলে মনে হয়। একটু ধনেপাতা ছড়ানো চচ্চড়িটার দিব্যি বাস বেরিয়েছে।
কী খুড়া, কেমন খান?
আহা, বড় চমৎকার স্বাদ হয়েছে।
সুমন মরণের জানালাটার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে একটু হেসে বলল, পড়ছিস না হাঁ করে তাকিয়ে আছিস?
মরণ এক গাল হেসে বলে, বাইরে আসব দাদা?
আয়।
বাবা বকবে না তো!
না বোধহয়। মুড ভাল আছে। আয়।
মরণ এক লম্ফে বেরিয়ে এল।
ঠিক তক্ষুনি বাঁশের আগল ঠেলে হিমি এসে ঢুকল। হাতে উলের কাটা। সুমনের দিকে চোখ হেনে মুচকি একটু হেসে রান্নাঘরে গিয়ে ঢুকে পড়ল। সুমন একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। গাঁয়ের মেয়েগুলো বড্ড বোকা হয়।
.
২৩.
গরম ডাইল নাই? গরম ডাইল?
রান্নাঘরের দরজায় এসে বাসন্তী বলে, ডাল ফুটছে। দেব?
আরে আমারে না। খুড়ারে এক বাটি দ্যাও।
এখনও ভাল সেদ্ধ হয়নি যে, ফোড়ন দিতে দেরি হবে।
আরে ফোড়নের কাম কী? এক খাবলা ঘি ঢাইল্যা দিলেই হয়।
ধীরেন কাষ্ঠ আহ্লাদে হাসল। গরম ডালে ঘি হল অমৃত। স্বর্গীয় জিনিস। কিন্তু মুখে ভদ্রতা করতে হয় বলে বলল, না না, এই তো চচ্চড়ি দিয়েই বেশ খাচ্ছি।
রসিক বলে, আরে একটু ডাইলই তো। লজ্জা পান ক্যান? ডাইলটা খুব খাইবেন। ডাইলের মইধ্যে মেলা ভিটামিন আর প্রোটিন।
কথা থামিয়ে রান্নাঘরের দিকে চেয়ে আবার হাঁক মারে রসিক, আগো, আইজ কী ডাইল রানতে আছ?
বাসন্তী বলল, মুসুরি।
তা হইলে তো কথাই নাই। মুসুরি হইল ডাইলের রাজা। ফুটার ডাইল খাইতেও চমৎকার।
ধীরেন কাষ্ঠ খুব হাসে, বাঙাল হল রাজা লোক। এমন দরাজ দিল এ তল্লাটে কখনও দেখেনি ধীরেন। বাঙাল দেশটা কেমন সেটা ভাল জানে না ধীরেন। তবে শুনেছে, সেটা প্রায় মগের মুলুক। বানভাসি, জলকাদার দেশ। সেখানকার লোকগুলো একটু কাটখোট্টা বটে, কিন্তু মনটি খুব সরেস।
