কাক বককে আর কে খাওয়ায় আজকাল!
খুড়া নাকি? আরে আহেন আহেন। বহেন জুইত কইর্যা। আরে কে আছস, খুড়ারে একখান চেয়ার দে।
মুনিশ কামলার অভাব নেই। একজন দৌড়ে কেঠো চেয়ারখানা এনে পেতে দেয় আতাগাছের তলায়।
কাক রুটি খাচ্ছে–এই দৃশ্যটা হাসিমুখে খুব মন দিয়ে দেখে ধীরেন।
কাউয়ারা যে কথা কয় তা বোঝেন খুড়া?
ধীরেন হেসে বলে, না হে বাপু, কাকের ভাষা কি কেউ বোঝে? কিন্তু কিছু কয়, নাকি?
কাউয়ারা কথা কয় খুড়া, কান্দে, নালিশ করে।
সে কি তুমি বোঝো?
না খুড়া, তবে বুঝনের চেষ্টা করি। দুই একখানা কথা বুইঝ্যাও ফালাই।
সত্যি? কী বোঝ বলো তো!
ক্ষুধার কথা কয়, আহ্লাদের কথা কয়।
ধীরেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শুনেছি, আগে নাকি এসব নিয়ে চর্চা হত। আজকাল গাঁজাখুরি বলে সবাই উড়িয়ে দেয়।
উড়াইয়া দিলে সবই উইড়া যায়। থাকে কী কন তো!
কাকের ভাষা ধীরেন কাষ্ঠ বুঝতে পারে না ঠিকই। কিন্তু বাঙালের ভাষাটা বুঝতে পারে। শুধু মুখের ভাষা নয়, বাঙালের ওই যে মায়াদয়া, কাক কুকুর খাওয়ানো, দরাজ হাবভাব ওরও একটা ভাষা আছে। ওসব দিয়ে ভিতরের মানুষটাকে দেখা যায়। হাবভাব, আচার-আচরণেরও একটা ভাষা আছে। মুখের বুলি অনেক সময় সত্যি কথা কয় না। কিন্তু হাবভাব আসল মানুষটাকে ঠিক চিনিয়ে দেয়। একখানা মুচকি হাসি কখন যে লক্ষ কথাকে ছাড়িয়ে যায়, একখানা চোখের চাউনি যে কখন শত ছুরিকাঘাতের চেয়েও বেশি মারক হয়ে ওঠে। কী বলে যেন ব্যাপারটাকে আজকাল? বডি ল্যাংগুয়েজ না কী যেন!
বেহানবেলা কী খাইয়া আইছেন খুড়া?
হ-হ-হ করে লজ্জার হাসি হাসে ধীরেন। ভারী অপ্রস্তুত হয়ে বলে, কী আর খাব! সকালে বিশেষ খাই-টাই না। ওই একটু চা-বিস্কুট।
গরম রুটি-ব্যঞ্জন খাইবেন? আহেন, আহেন, আমার বউ রুটিটা বড় ভাল বানায়। পাতলা, নরম লাহান। আহেন।
ঘটনাটা নতুন কিছু নয়। বাঙালের বাড়িতে বাঙাল থাকলে এরকম প্রায়ই ঘটে। তবু ধীরেন আজও খুব লজ্জা পায়। এই লজ্জাবোধটুকুই যা এখনও আছে অবশিষ্ট। লোভ কি আর বশ মানতে চায়?
উঠোনে পা দিয়েই বাঙাল হাঁক মারল, কই গো, তোমার রুটি-মুটি হইছে নাকি? কয়েকখান বেশি কইরো। খুড়া আর আমি খামু।
রান্নাঘর থেকে বাসন্তী বলল, রুটি হচ্ছে। একটু দেরি হবে। বোসো।
ক্যান গো, আইজ দেরি ক্যান?
তরকারিটা পুড়ে গিয়েছিল। আবার চাপিয়েছি নতুন করে।
শোনো কথা! বলে বাঙাল খুব হাসল, শোনলেন খুড়া, ব্যঞ্জন নাকি পুইড়া গেছে। বহেন, জুইত কইরা রৌদ্রে বহেন। হইয়া যাইব। আমার বউ খুব কর্মিষ্ঠা রমণী।
একজন মুনিশ দৌড়ে গিয়ে কাঠের চেয়ারটা এনে উঠোনের রোদে পেতে দিল। রসিক বাঙাল কোলের মেয়েটাকে উঠোনে হামা দিতে ছেড়ে দিয়ে বলল, খেজুরের রস খাইবেন খুড়া?
কিছু খেতেই আপত্তি নেই ধীরেনের। এই বয়সে নাকি খাওয়া-দাওয়ার কাটছাঁট করে লোকে। তারা নমস্য মানুষ। ধীরেনের কাটছাঁট করার কিছু নেই। খিদে সেই যে খাপ পেতে বসে থাকে পেটের মধ্যে, সারাদিন তার নট নড়ন, নট চড়ন। তবু লাজুক মুখে বলে, তা খেতে পারি একটু।
কই রে, খেজুর রসের পাতিলটা লইয়া আয় দেখি। দেইখেন, ঘৎ কইরা গিল্যা ফালাইয়েন না। সারা রাইত গাছে ঝুইল্যা পাতিল এক্কেবারে ঠান্ডা কাল হইয়া আছে।
এক মুনিশ রসের হাঁড়ি নিয়ে এল।
দু গেলাস চোঁ চোঁ করে মেরে দিল ধীরেন। বুক পেট যেন জুড়িয়ে গেল একেবারে। হ্যাঁ, ঠান্ডা বটে। গলায় আর বুকে যেন চিড়িক মেরে গেল। তা হোক, ধীরেনের এতে কিছু হবে না।
.
হাম্মি হামা দিয়ে তকতকে উঠোনে খানিক দূর যায়, আবার ফিরে এসে বাঙালের হাঁটু ধরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। ওই যে ঝুব্দুস চেহারার একটা লোকের সঙ্গে তার বাবা কথা কইছে এটা তার পছন্দ নয়। লোকটা মাঝে মাঝে তাকে একটু আদর করার চেষ্টা করে। হাম্মি তাতে মোটেই খুশি হয় না। ছিটকে সরে যায়।
কাজের মেয়েরা উঠোনে চাটাই পেতে লেপ, কম্বল-বালিশ রোদে দিচ্ছে। হাম্মি গিয়ে ছড়ানো একটা লেপের ওপর উঠে বসল।
রান্নাঘর থেকে বাসন্তী চেঁচিয়ে বলল, ওরে, মুতে দেবে লেপের ওপর। হাম্মিকে নামা।
রসিক হাঁ-হাঁ করে ওঠে, আহা, মুতুক, মুতুক। অর মুত তো গঙ্গাজল।
আহা, কীসব কথা। মা গঙ্গার অভক্তি হয় না বুঝি?
বাঙাল দরাজ একখানা হাসি হেসে বলে, তোমাগো গঙ্গার কথা আর কইও না গো, নিত্যি তিরিশদিন মাইনষে গুয়েমুতে গঙ্গারে নান্দিভাস্যি করতাছে। হাম্মির মুত আর কী দোষ করল?
ওসব কথা বলতে নেই। পাপ হয়।
দক্ষিণের বারান্দায় চারজন মুনিশ খেতে বসেছে। কোনও দিন ভাত, কোনও দিন মুড়ি। আজ মুড়ি। কাজের মেয়ে শীতলা ধামা ভর্তি মুড়ি নিয়ে এল ভাঁড়ারঘর থেকে। অ্যালুমিনিয়ামের থালায় ঢেলে দিচ্ছে দেদার পরিমাণে। মুনিশদের পাশে ঘটি ভর্তি জল। মুড়ি পাতে পড়তেই দু মুঠো মুখসই করে ঘটির জল ঘিঁচে মেরে মুড়ি নরম করে ফেলতে লাগল।
বাসন্তী রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, আজ তরকারি পুড়ে গেছে গো বাবারা, গরম চপ আনিয়েছি বটতলা থেকে, পেঁয়াজ লঙ্কা দিয়ে খেয়ে নাও আজ।
বুড়ো মুনিশ হারাধন একগাল হেসে বলল, চপ কি কিছু খারাপ জিনিস মা? ও মেরে দেবোখন, চিন্তা কোরো না। পোড়া তরকারি থাকলে তাও একটু দিও। আমাদের সব চলে।
না বাবা, সে খাওয়ার জো নেই। পুড়ে ঝামা।
