তুমি একখান আজব মাইয়ালোক। অত ডরাও ক্যান?
ভয় কি সাধে পাই! আমাকে বিয়ে করে তোমারও তো কত ঝাট গেল। আমার দাদারা তোমার পেছনে গুণ্ডা লাগিয়েছিল, ধান চাল চুরি করত, গাঁয়ের লোককে তোমার পিছনে লাগাত। আমি যে কী ভয় পেতুম!
আরে ওইসব কথা বাদ দেও তো! মাইর আমি অনেক খাইছি।
কিন্তু সবচেয়ে বড় ভয়ের কথাটা সে মুখ ফুটে বলতে পারে না।
সে কি বাঙালের সত্যিকারের বউ, না রক্ষিতা?
হ্যাঁ, তাদের পুরুত ডেকে বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু সে শুনেছে, আইনে নাকি ও বিয়ে গেরাহ্যি হয় না। তা হলে কি ইহজন্মে সে বাঙালের বউ হবে না?
এই চিন্তাটা ছাইচাপা আগুনের মতো তার বুকের মধ্যে সবসময়ে থাকে। মাঝমাঝে তার মা এসে সেটাকে ফুঁ দিয়ে গনগনে করে দিয়ে যায়। ঝাঁপিতে যেমন সাপ নিশ্চিন্তে ঘুমোয়, সাপুড়ে তাকে খুঁচিয়ে জাগায়।
চোখের জল আজ বড় উথলে পড়েছে। জমি-বাড়ি-গাড়ি-গয়না ছেলেমেয়ে সব মিথ্যে মনে হচ্ছে। পায়ের তলায় বুঝি ধরণী নেই তার। ওই একটা লোককে ঘিরে তার লতিয়ে ওঠা জীবন যে মিথ্যে হয়ে যায় তা হলে। সেই মিথ্যে নিয়ে বাঁচবে কী করে বাসন্তী?
ফুলে ফুলে কাঁদছিল বাসন্তী। কাণ্ডজ্ঞান লুপ্ত হয়ে আকুল কান্নার নদী হয়ে যাচ্ছিল সে। তরকারি পুড়ল, কড়াই পুড়ল, তপ্ত লোহার গন্ধে ঘর ভরে গেল।
ও বউদি! ও কী গো! ঘরে যে অগ্নিকাণ্ড হবে! ইঃ বাবা…।
দৌড়ে এসে উনুন থেকে কড়াই নামিয়ে তাতে ফাস করে জল ঢেলে দিল হিমি, পাশের বাড়ির অক্ষয়বাবুর মেয়ে। সুমন আসার পর থেকে এ মেয়েটার যাতায়াত বেড়েছে। নানা ছুতোয় এসে হানা দেয়। একদম পছন্দ করে না বাসন্তী।
একটা উলের ডিজাইন দেখাতে এসেছিলাম। এসে দেখি কী কাণ্ড! কী হয়েছে বউদি, কাঁদছ কেন?
বাসন্তীর চেতনা ফিরল। আঁচলে ঢাকা মুখ সহজে তুলল না। মাথা নেড়ে ধরা গলায় বলে, কিছু না।
ঝগড়া হয়েছে বুঝি? তোমাদের তো কখনও ঝগড়া হয় না।
ফোঁপানিটা কিছুতেই লুকোনো যায় না। হেঁচকির মতোই বেসামাল জিনিস।
কড়াইটা ঝামা হয়ে গেছে বউদি। ওঠো তো, মুখেচোখে জল দাও।
লজ্জা করছিল বাসন্তীর। এই কান্না নিয়ে পাঁচটা কথা উঠবে। এমনিতেই সে একজনের দুনম্বর বউ বলে দুটো চারটে উড়ো কথা কানে আসে তার। গাঁ হচ্ছে কূটকচালির এঁদো পুকুর। চোখ মুছে বাসন্তী বলে, তুই এখন যা হিমি। আমার মনটা আজ ভাল নেই।
খুব ভাল মানুষের মতো হিমি রাজি হয়ে বলে, আচ্ছা বউদি, পরে আসবখন ডিজাইনটা দেখিয়ে নিতে।
ডিজাইন না ছাই। এসে নানা ফাঁকে সুমনের দিকে চেয়ে থাকে। ইশারা ইঙ্গিতের চেষ্টা করে। সুমন অবশ্য আনমনা ছেলে। কিন্তু বয়সটা খারাপ, কখন কী হয়ে যায়। বদনাম যা হওয়ার বাসন্তীরই হবে। বড়গিন্নি বলে বেড়াবে, ছেলেটার মাথা খাওয়ার মূলে এই হতভাগী বাসন্তী। তারই ষড়যন্ত্র।
কড়াই বের করে নিয়ে ফের নতুন করে রাঁধতে বসল বাসন্তী। জলখাবার দিতে আজ দেরি হয়ে যাবে একটু।
.
ধীরেন কাষ্ঠ ওঠে সেই কাকভোরে। ওঠা বলতে শয্যাত্যাগ। নইলে ঘুমও কি আর তেমন হয় আজকাল। মাঝরাত্তিরেই চটকা ভেঙে এপাশ ওপাশ। ঘড়ি ঘড়ি পেচ্ছাপও পায় এই শীতকালটায়। ঘুমের জো কী?
কাকভোরে উঠে লোকে ইষ্টনাম-টাম করে। ধীরেনের ইষ্ট-টিস্ট নেই। যৌবনকাল পেরিয়ে আধবুড়ো বয়স অবধি ধর্মে মতি ছিল না। আর এখন বুড়ো বয়সে মনে হয় ওসব করে আর হবেটা কী? তার যা পাহাড়প্রমাণ পাপ জমা হয়ে আছে তা ক্ষয় হওয়ার নয়। মাথায় তাই ভগবানকে আর ঢোকায়নি কাষ্ঠ, তাতে মনের জ্বালা আরও বাড়বে। পাপ নিয়ে নরক নিয়ে চিন্তা বাড়বে। তার চেয়ে নাস্তিক হওয়া ভাল। তা হলে আর ওসব ল্যাঠা থাকে না।
আলো ফুটি-ফুটি হলেই বেরিয়ে পড়ে ধীরেন। তার গরম জামাকাপড় বিশেষ নেই। যা আছে তাই চাপিয়ে নেয় গায়ে। মোটা গেঞ্জি, জামা, একটা আড়েবহরে ধুতি, মোজা, চটি। শীতটাও ওখানেই বেশি লাগে।
ঘরে চা জোটে না তা নয়। তবে বেলা হয়। আর সে অখাদ্য চায়ের জন্য বসে থাকার মানে হয় না। যে বাড়িতে হানা দেবে সে বাড়িতেই একটু চা জুটেই যায় সকালবেলাটায়।
এ-গাঁয়ে বাঙালের বাড়িটাই তার সবচেয়ে পছন্দের। বাঙাল থাকলে তো কথাই নেই। দিলদরিয়া লোক। গিয়ে দুদণ্ড বসলে চা জোটে, খাবার-দাবারও জুটে যায়। বাঙাল বলে, খান খুড়া, খান। দুনিয়ায় খাওনের মতো বস্তু নাই।
তা খাওয়ার পরিপাটি আছে বাঙালের। সেজন্য খরচও করে দেদার।
এই সকালবেলায় বাঙাল কাককে রুটি-টুটি খাওয়ায়। ধীরেন প্রথমটায় যায় মহিম রায়ের বাড়ি। মহিমা ওঠে খুব সকালে। পুজোপাঠ সেরে উঠোনের রোদে বসে চা খায়। মহিমদার বাড়ির চা-টি বড় ভাল। ঘন লিকার, ভাল দুধের চা। সঙ্গে বিস্কুট। পুরনো কথাটথা হয় কিছুক্ষণ।
গৌরহরি চাটুজ্জে বেঁচে থাকতে সেখানেও একটা ঠেক ছিল বটে ধীরেনের। গৌরহরিদা পগারপার হওয়ায় সেখানকার পাট একরকম উঠেছে। ক্রমে ক্রমে ঠেক কমে আসছে।
বেলা একটু গড়ালে ধীরেন কাষ্ঠ এ-পাড়া ও-পাড়া ঘুরে নানা ছোটখাটো দৃশ্য দেখে তারপর বাঙালবাড়িতে হানা দেয়।
দৃশ্যটা বড় ভাল। বাগানের এক কোণে বাঙাল জলচৌকিতে সেঁটে বসে রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে শূন্যে তুলে ছুঁড়ে দিচ্ছে আর কাকেরা একটা অন্যকে এড়িয়ে কপাকপ তুলে নিচ্ছে ঠোঁটে।
ভারী আহ্লাদ হয় ধীরেনের। সব দৃশ্যেরই একটা সৌন্দর্য আছে। কাকেঁদের উড়ে উড়ে উড়ন্ত রুটির টুকরো ছিনতাই করাটার মধ্যেও একটু আর্ট থাকে।
