তুমি চুপ করো তো মা। তার ইচ্ছে হয়, তাই খাওয়ায়। ভূতভূজ্যি বলেও তো একটা কথা আছে, নাকি?
তুই আর বাঙালের পোঁ ধরিসনি তো! দশ বারোখানা আটার রুটি কি কম কিছু হল? দুটো মনিষ্যির খোরাক। তোর ভালর জন্যই বলি। নইলে দিক না সব উড়িয়ে পুড়িয়ে, আমার তাতে কী?
দুধ খেতে এসেছ চুপচাপ বসে দুধ খাও। এ-সংসারের ব্যাপারে তোমার অত নাক গলানোর দরকার কী?
ওলো আমার সংসারী লো! দুদিনের বৈরিগী ভাতকে বলে মালসাভোগ। বলি সংসারটার সুসার হয় কীসে তা বুঝি দেখার দরকার নেই?
আমার সংসারে সুসারের অভাব কবে দেখলে? ওসব বোলো না তো! ভাল লাগে না। ও মানুষ সবাইকে খাওয়াতে ভালবাসে।
খেয়ে খেয়েই তো বাঙালগুলো গেল। পেছনের কাপড় তুলে দিনরাত কেবল গিলছে। অমন রাক্ষুসে খাঁই দেখিনি বাপু। আড়াইটি লোকের সংসার, তা বাপু ফি শনিবারে দেখি গন্ধমাদন বয়ে নিয়ে আসছে। মাছ রে, মাংস রে, ঘি রে, তেল রে…যেন মচ্ছব লেগেছে। এই বলে দিচ্ছি এখন থেকে একটু লাগামে টান দে, নইলে তোর দশাও শেষে আমার মতো হবে। সেই মিনসে আমাকে যে দশায় ফেলে গেছে এখন সামনে পেলে তার মুখে নুড়ো জ্বেলে দিতুম।
বাসন্তী ঝাঁঝিয়ে উঠে বলে, খাওয়া নিয়ে খোঁটা দেবে না তো মা! তোমাদের মতো স্বার্থপর মানুষ তো নয়। খেতে জানে, খাওয়াতেও জানে।
খাওয়াতে জানে ওই কাকবক শ্যালকুকুরকে। দুটো শালা, শাউড়ি এদের যে পেটে পাটকেল সিদিকে খেয়াল আছে? কত বড় দাতাকর্ণ এলেন রে? আবার বলে খেতে জানে, খাওয়াতেও জানে!
দেখো মা, সোজা বলে দিচ্ছি কাল থেকে আর এসো না। আমি আর তোমার আফিং-এর দুধ। জোগাতে পারব না। যারটা খাবে তারই নিন্দে করে বেড়াবে সেটা আমি আর সহ্য করব না।
জিজিবুড়ি একটু মিইয়ে গেল। জুল জুল করে মেয়ের মুখপানে একটু চেয়ে দেখল। হাতের গেলাস থেকে চায়ের লিকার মেশানো দুধ সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে কয়েক চুমুক খেয়ে গলাটা মোলায়েম করে বলল, বাব্বা, কী এমন বললুম যে, তোর আঁতে লাগল। ভালর জন্যই বলা। বাঙাল কি আর মনিষ্যি খারাপ! হাতটাই যা একটু দরাজ। তাই তো বললুম, নাকি?
যা বলেছ সে আমি বুঝেছি। কাল থেকে তোমার দুধ বন্ধ রইল।
জিজিবুড়ি একটু তোম্বা মুখ করে বসে থেকে বলে, আফিং খাই বলেই আতান্তরে পড়েছি মা, নইলে কি আর মান খোয়াতে আসি। তা সেই আফিংটাই বা জোটে কোথায়? কানাই আফিং-এর খোসা এনে দেয়, তাই জলে সেদ্ধ করে খাওয়া। বাঙালকে বলে পো টাক আফিং-ও তো আনিয়ে দিতে পারিস। দশ মাস গর্ভে ধরেছিলুম, সে কথা কি ভুলে গেলি যে, খুঁড়ছিস!
গলা উঁচুতে তোলা যাচ্ছে না, তবু তার মধ্যেই যতটা সম্ভব দ্বেষ মিশিয়ে বাসন্তী বলে, তোমাকে হাড়ে হাড়ে চিনি মা। ছেলেরা লাথিঝাঁটা মারলেও তুমি তাদের দোর ধরে পড়ে থাকবে। তাদের খোঁট ছাড়বে না। তা এনে দিক না তারা তোমার আফিং। তার বেলা আমার বাঙাল বরকে দরকার হয় কেন? তাও তিন-চার মাস আগে দু ভরি আফিং আনিয়ে দিয়েছিলাম। অত মুখ মুছে ফেল কী করে বলল তো! বেইমান আর কাকে বলে?
জিজিবুড়ি দুধ-লিকারের শেষটুকু গিলে ধপাৎ করে গেলাসটা মেঝেতে রেখে বলল, ইঃ, বড় যে বেউলো হলি। বলি বাঙাল কি তোর আর জন্মের স্বামী নাকি লা? বে বসেছিল তোক দেখাতে। ও মোটে বে-ই নয়। রাঁড়ের মতো আছিস, তাই থাকবি। ও তোকে বউ বলে বড় গেরাহ্যি করে কি না। তুই বোকার বেহদ্দ বলে দুধের বদলে পিটুলিগোলা খেয়ে নাচছিস। চোখ থাকলে সব দেখতে পেতিস। ভারী তো এক পো দুধ খাওয়াস তার জন্য এত কথা!
বাসন্তী জিজিবুড়ির দিকে এমনভাবে তাকাল যেন ভস্ম করে ফেলবে। তারপর দাঁতে দাঁত পিষে বলল, তোমাকে মা বলে ডাকতে আজকাল ঘেন্না হয়। যাও তো, এখন বিদেয় হও। আর এ-মুখো হয়ো না।
তোম্বো মুখ করে জিজিবুড়ি উঠে পড়ল। বলল, আমাকে তাড়ালে কি আর দাগ উঠে যাবে? যা বললুম ভাল করে ভেবে দেখিস। দুটো পয়সার মুখ দেখেছিস বলে বড় অহংকার তোর।
জিজিবুড়ি বিদেয় হওয়ার পর বাসন্তী চুপ করে বসে রইল। তার দু চোখের জলের ধারায় ভেসে যাচ্ছিল গাল। কড়াইয়ে তরকারি পোড়া গন্ধ ছাড়তে লাগল। খেয়ালই করল না সে।
তার বুকের মধ্যে ঝুলকালির মতো ভয়টা তো আছেই। সত্যিই সে রসিক সাহার কতখানি বউ? কতখানি অধিকার তার ওই মানুষটার ওপর? টাকাপয়সার অভাব রাখেনি, বাড়িঘর জমি-জমা সব তার নামে। কিন্তু সেটাই তো আর স্বামীত্ব প্রমাণ করে না। লম্পট লোকেরা তাদের রক্ষিতাদের তো কত কিছু দেয়, তাতে তো রক্ষিতা বউ হয়ে যায় না। সে ভাবতে চায় না, তবু মাঝেমাঝে প্রশ্নটা হঠাৎ ছোবল তোলে মনের মধ্যে, আমি ওর কতখানি বউ?
তার মায়ের বুকে গরল, মুখে গরল। ঠিক কথা। কিন্তু কখনও কখনও এমন কথা কয় যে বড় চমকে যায় বাসন্তীর ভিতরটা। নিশ্চিন্ত, সুখী মনটা যেন কাচের গেলাসের মতো ঝনঝন করে ভেঙে শতখান হয়ে পড়ে। তখন বড় দিশাহারা লাগে। এখন বড় পাগল-পাগল লাগে। এখন ইচ্ছে হয়, ছুটে কোথাও পালিয়ে যায়।
মাঝে মাঝে আদর সোহাগের সময় সে রসিকের বুক ঘেঁষে মাথাটা সাপটে দিয়ে বলে, এত সুখে রেখেছ কেন আমায় বলো তো! এত সুখ কিন্তু ভাল নয়।
ক্যান গো, তোমারে কি সুখে থাকতে ভূতে কিলায়?
হুঁ, কিলোয়। আমার বড় ভয়-ভয় করে যে! ছেলেবেলা থেকে আদর-সোহাগ পাইনি তো কখনও। অভাবের সংসার, নিত্যি খিটিমিটি, কথায় কথায় চড়চাপড়, আধপেটা খাওয়া এইসব নিয়েই বড় হয়েছি। তাই মনে হয় ভগবান আবার সব কেড়ে না নেন। বড্ড ভয় যে!
