অস্থিরভাবে চোখ সরিয়ে নেয় শ্যাম। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে সে শুনতে পায় দূরের রাস্তায় বাঁক নিয়ে ছুটে আসছে একটা মোটরসাইকেল, তারপর তার গতি ক. সে, ধীরে ধীরে মোটর-সাইকেলটা তার ঠিক পিছনে ফুটপাথ ঘেঁষে দাঁড়ায়। নিথর হয়ে যায় শ্যাম। অবশ চোখে চেয়ে দেখে, তার পাশ দিয়ে চটপট পায়ে একটি ছেলে চলে গেল কাচের দরজাটার দিকে। চাপা কালো প্যান্ট আর সাদা পুল-ওভার পরা, ছোট করে ছাটা মাথার চুল, একটু বেঁটে কিন্তু মজবুত চেহারার ছেলেটি দরজার দিকে হাত বাড়াতেই যেন মন্ত্রবলে দরজা খুলে গেল। সেই প্রথম দিন শোনা একটু তীক্ষ্ণ কিন্তু মিষ্টি গলাটি শুনতে পেল শ্যাম, এত দেরি! কখন টেলিফোন করে বসে আছি…
ছেলেটি হাসে, এই বিশ্রী ট্রাফিকে আসা যায়? ঘুরে আসতে হল, তাও ক্লিয়ার রাস্তা পেলুম না…কী ব্যাপার?
কই! কিছু না।
কিছু না?
না।
দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে এল শ্যামের দিকেই। নড়ল না শ্যাম। লীলা ছেলেটির বাঁ পাশে ছিল, যে-পাশে শ্যাম। কয়েক পা হাঁটার মধ্যেই লীলা কৌশলে ছেলেটির ডান পাশে সরে গেল। তারপর তাকে পেরিয়ে গেল তারা। শ্যাম ঘাড় ঘোরাল না। শুনতে পেল স্টার্টারে লাথি মারার শব্দ, তারপর গুর গুর করে ডেকে উঠল মোটরসাইকেল। দূরের দিকে ছুটে গেল। সরল একটি গাছের মতো সে দাঁড়িয়ে রইল। বাতাসে পেট্রলের গন্ধের সঙ্গে আর-একটি মিষ্টি মৃদু গন্ধ, বোধহয় পাউডারের। আগে অনেক পাউডারের গন্ধ চেনা ছিল শ্যামের। এখন ভুলে গেছে, মৃদু হেসে সে মাথা নাড়লনা, সে এ-গন্ধটা চেনে না।
তোমার কি অনেক প্রেমিক? ভাল, কিন্তু দেখো, একদিন পৃথিবী খুব নির্জন হয়ে যাবে। তখন তোমার লুকিয়ে থাকার নিরাপদ জায়গা থাকবে না, থাকবে না পালিয়ে যাওয়ার সহজ পথ।
ভিড়ের ভিতরে পথ করে ধীরে হাঁটছিল শ্যাম। হাঁটতে হাঁটতে বলছিল, আমি জানি না কী করে ভয় দেখাতে হয় চোয়াড়ে চেহারার বিশ্রী স্বভাবের লোকদের, আমি জানি কীভাবে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে হয় মোটর-সাইক্লিস্টদের। তুমি কেন দেখিয়ে দাওনি আমাকে! কেন ছেলেটিকে বলোনি যে, এই লোকটার জন্যই আমি রাস্তায় একা বেরোতে পারছিলুম না। কিংবা তুমি সেই চোয়াড়ে চেহারার লোকটাকেও বলতে পারতে–আমাকে বাঁচাও।
হাঁটতে হাঁটতে অভিভূতের মতো হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে শ্যাম। কেন? পিছন থেকে চলন্ত একটা লোক তার গায়ে ধাক্কা খায়। শ্যাম টাল খেয়ে হেসে ওঠে-কেন ধরিয়ে দাওনি আমাকে? তারপর আবার হেঁটে যায়।
বস্তুত পৃথিবী খুব নির্জন হয়েই গেছে। খুব জীবন্ত মানুষজন শ্যামের চোখে পড়ে না। ব্র্যাকেটে ঝোলানো জামাকাপড় হেঁটে যাচ্ছে, ট্যাক্সিডার্মি করা মুখ কিংবা শরীর তার চোখে পড়ে। এলোমেলো আলোয় পড়ছে চলন্ত ছায়া, ভেঙে যাচ্ছে। নানা রাস্তায় ঘুরে বেড়াল শ্যাম। একটিও চেনা মুখ চোখে পড়ে না, একটিও প্রিয় মুখ চোখে পড়ে না। হঠাৎ মনে হয়, একশো বছর একটানা ঘুমিয়ে হঠাৎ জেগে উঠে সে আর কিছুই চিনতে পারছে না। একশো বছর ধরে পচে গলে ঝরে গেছে চেনা-পরিচয়, একশো বছর ধরে বিস্ফোরিত হয়ে গেছে প্রিয় মুখগুলি। অল্প কুয়াশা জমে আছে চার দিকে, বেশি দূরে চোখ যায় না। মনে হয় কুয়াশা কেটে গেলেই দেখা যাবে বিদেশ। দেখা যাবে, লীলা একা নির্জন রাস্তার শেষে কাচের দরজার ওপাশে তার অপেক্ষায় আছে। তাকে দেখলেই দরজা ঠেলে বেরিয়ে আসবে, তারপর তাবা দু’জন পরিত্যক্ত জনহীন শহরের রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াবে পরস্পরকে না-ছুঁয়ে। যে-কোনও বাড়িতেই তাদের জন্য সুন্দর বিছানা পাতা থাকবে, দোকানে দোকানে সাজানো থাকবে জিনিস, তারা একবার স্পর্শ করবে বলে গাছে গাছে ফুল ফুটে ফল ফলে থাকবে। তাদের দু’জনের উদ্দেশেই তখন রোদ বা বৃষ্টিপাত ঘটবে পৃথিবীতে।
না, শ্যাম মাথা নাড়ে। পৃথিবীতে এরকম কিছুই ঘটে না। সে জানে। তাই পৃথিবী এখনও মেন সুন্দর নয়। এখনও এখানে রয়ে গেছে কিছু অহংকারী মোটর-সাইক্লিস্ট আর কিছু চোয়াড়ে লোক।
.
হোটেলে আজ মিত্রকে না দেখে সামান্য চমকে গেল শ্যাম। রোজ যে দেখা হয় তা নয়। তবু আজ খেতে বসে বড় একা লাগল শ্যামের। সামনের উলটো দিকের শূন্য চেয়ারটার দিকে চোরা চোখে চেয়ে দেখল অনেকবার। সামান্য সন্দেহে তার মন দুলে গেল। খাবারের তেমন কোনও স্পষ্ট স্বাদ পেল না শ্যাম। খেয়ে গেল।
হোটেলের ম্যানেজার লোকটার সঙ্গে কোনও দিনই প্রায় কথা বলে না শ্যাম। দরজার কাছে একটা খুদে টেবিল কোলে করে বসে থাকে বিনয়ি এবং মোটা থলথলে লোকটি, দুটি ঢুলুঢুলু চোখ, দেখলে মনে হয়, সন্ধের দিকে এক-আধ ছিলিম গাঁজা খায় ম্যানেজার। কথা কম বলে, হাসে অনেক বেশি কিন্তু শব্দ হয় না, কখনও শ্যাম শোনেনি যে লোকটা ছোকরা চাকর কিংবা ঠাকুরকে চেঁচিয়ে বকছে। বস্তুত বকাঝকা করার জন্য আলাদা একজন লোক রাখা আছে—সে-লোকটা চাকরদের ওপরওয়ালা। ম্যানেজার শুধু চুপচাপ বসে থাকে শান্তভাবে। শ্যাম লক্ষ করেছে, দিনে দিনে লোকটা আরও শান্ত হয়ে যাচ্ছে, নড়াচড়া কমে যাচ্ছে আরও। মুখের হাসিতে আরও বিনয় ও উদাসীনতা ফুটে উঠছে, মুখের কথা কমে গেছে অনেক। লোকটার মাথার ওপরে পিছনের দেয়ালে লোকটার মৃত বাবার একটা ছবি টাঙানো আছে, ছবির চারধারে একটা গত বছরের শুকনো বেলফুলের মালা। মাঝে মাঝে শ্যামের সন্দেহ হয় যে, হয়তো খুব শিগগিরই এ-লোকটাও তার ছেলেকে খুদে টেবিলের কাছে নিজের পুরনো জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে একলাফে উঠে যাবে ওপরের দেয়ালে তার বাবার ছবির পাশে। তারপর ওরকমই একটা শুকনো বেলফুলের মালা পরে ছবি হয়ে যাবে একদিন, খুব শিগগিরই! নয়তো যেখানে বসে আছে। সেখানেই বসে থেকে আস্তে আস্তে একদিন সিমেন্ট কংক্রিটের মতোই জমে যাবে লোকটা ঠান্ডা পাথর হয়ে যাবে, আর নড়বেই না কোনও দিন।
