আজ বেরোবার মুখে শ্যাম খুদে টেবিলটার সামনে একটু দাঁড়াল। বাইরের দিকে চেয়ে দেখল, কুকুর—অনেক কুকুর বসে আছে। রোজ যেমন থাকে। অকারণে শ্যাম মৃদু হেসে বলল, আঃ, কুকুর! তারপর এক দুই তিন করে গুনে গেল। এগারোটা।
এত কুকুর! শ্যাম মৃদু হেসে শান্ত লোকটির দিকে তাকাল, এত কুকুরকে আপনি রোজ ভাত দেন?
দিই। বড় বিনয়ে হাসল লোকটি। চোখ বুজে গেল হাসিতে।
এগারোটা কুকুরকে? শ্যাম চোখ বড় করে তাকাল—আপনার খুব বেশি পুণ্য জমে যাচ্ছে! খুব তাড়াতাড়িই পুণ্য করে নিচ্ছেন আপনি, সময় থাকতেই!
বড় বিনয়ে লোকটি ঘাড় কাত করল, বলল, এগারোটার বেশি কমও হয়।
হয়?
হয়। লোকটা বিষণ্ণ চোখে কুকুরগুলোর দিকে তাকাল, বলল, দিনে দিনে বাড়ছে। আরও বাড়বে।
কেন?
কেন! লোকটি চিন্তিত মুখে শ্যামের দিকে তাকাল, খাবার পাচ্ছে না কোথাও। দেশের যা অবস্থা, ক্রমে ক্রমে এখানে এসে জুটছে।
ঠিক। শ্যাম বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়ে। বস্তুত দেশের খাদ্যাবস্থা বহুকাল হয় শ্যামের আর জানা নেই। তবু লোকটার এত কথা বলা শুনতে তার ভাল লাগছিল।
সব কটাই বাজে কুকুর নয়। লোকটা বলল, লক্ষ করে দেখুন, মাঝখানের সাদা কুকুরটা—ওর গায়ে অনেক বড় বড় লোম এখনও আছে, প্রকাণ্ড ঝোলানো কান, ওটা স্প্যানিয়েলের ক্রস-ব্রিড। আর ওই যে একটা ছাইরঙা, দেখলে আর বোঝা যায় না, ওটা বোসেদের কুকুর ছিল—অ্যালসেশিয়ান। গায়ে ঘা। হয়ে পচে-টচে রাস্তার কুকুর হয়ে গেছে। খুঁজলে মশাই, ওদের মধ্যেও বলতে বলতে হাসল লোকটি, একজন খদ্দেরকে এতক্ষণ দাড় করিয়ে রেখেছিল, তাকে পয়সা গুনে দিতে টেবিলের ওপরটা ডালার মতো তুলে ফেলল।
একটু অপেক্ষা করল শ্যাম, তারপর মুখ তুলতেই বলল, মিত্রকে দেখেননি আজ! সুবোধ মিত্রকে?
অমায়িক হাসল লোকটি; মাথা নাড়ল, না। এখনও আসেননি। বলে সস্নেহে কুকুরগুলির দিকে চেয়ে রইল। শ্যাম লক্ষ করল, কুকুরগুলি বড় স্নেহে এবং ভালবাসায় শান্ত লোকটির দিকে চেয়ে আছে।
আর কথা না বলে বেরিয়ে এল শ্যাম। সে কুকুরগুলির ভিতর দিয়ে হেঁটে গেল, তারা একটু সরে পথ করে দিল। সন্দেহজনক স্প্যানিয়েলটির দিকে একবার আদরের হাত বাড়িয়েও হাতটা টেনে নিল শ্যাম। তাতেই খুশি হয়ে কুকুরটা ল্যাজ নেড়ে দিল। ভিখিরি ব্যাটা-শ্যাম মনে মনে গাল দিল তাকে।
শ্যামের মাথার মধ্যে বিদ্যুতের মতো চমকে ওঠে একটা সন্দেহ। কাছেই সুবোধ মিত্রর বাসা। ইচ্ছে করলে একবার ঘুরে আসতে পারে শ্যাম। কিন্তু ইচ্ছে হয় না। যদি তেমন কোনও ঘটনাই ঘটে থাকে, তবে তার গিয়ে কী লাভ? বরং এখন গেলে পুলিশ-টুলিশের ঝামেলায় জড়িয়ে পড়াই স্বাভাবিক। ভাবতেই ভয়ংকর অলস লাগল শরীর। শ্যাম হাঁটতে হাঁটতে একটু দাঁড়াল। হাই তুলল। যদি ঘটনাটা ঘটেই থাকে তবে বলতেই হয় যে, মিত্র কথা রাখেনি। সতেরোটা ঘুমের বড়ির অর্ধেক বখরা শ্যামের পাওনা ছিল।
ভাবতে ভাবতে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল শ্যাম। তার ক’টা বড়ি পাওনা ছিল? হিসেব করলে কটা দাঁড়ায়। আটটা না ন’টা! অর্ধেক নেওয়ার কথা বলেছিল মিত্র, কিন্তু ঠিক ক’টা তা বলেনি। শ্যাম ভেবে দেখল, আর-একজনকে দলে নিলেও ঠিক ঠিক তিন ভাগ করা যাচ্ছে না। ভাবতে ভাবতে বড় সমস্যায় পড়ে গেল শ্যাম। সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছোল যে, ভাগ-বাঁটোয়ারার ক্ষেত্রে সতেরো সংখ্যা বিশ্রী। তারপর আবার হাঁটতে লাগল।
পৃথিবী অনেক নির্জন হয়ে গেছে। ক্রমে ক্রমে আরও যাবে। আস্তে আস্তে তার একার হয়ে যাবে সবকিছু। মিত্রকে দিয়ে শুরু হল হয়তো বা। কিংবা ঠিক তা নয়—আরও আগে থেকে—
তার মাথার ভিতরে অমনি বগরী পাখির মতো গুরু গুরু করে ডেকে উঠল একটি প্রায়-ভুলে-যাওয়া মোটরসাইকেলের আওয়াজ। মৃত্যুকূপে সেই খেলার মতো ঘুরে ঘুরে উপরে উঠে আবার নীচে নেমে যেতে লাগল। শ্যাম দ্রুত হাঁটতে থাকে।
১২. হয়তো একদিন পৃথিবীতে
হয়তো একদিন পৃথিবীতে খুব সুসময় এসেছিল। তখন শ্যাম ছিল না। হয়তো একদিন পৃথিবীতে খুব সুসময় এসে যাবে। তখন শ্যাম থাকবে না। কেমন ছিল সেই সুসময় কে জানে! কিংবা কে জানে কেমন হবে সেই সুসময়! শ্যাম জানে না। মাঝে মাঝে সে কেবল তার চারধারে দেখতে পায় সেইসব সুসময়ের অনেক চিহ্ন ছড়ানো রয়েছে। যেমন পাখির মুখ থেকে খসে পড়া ফসলের বীজ দেখে বোঝা যায় যে, কাছাকাছি এইখানে কোথাও ফসল ফলেছিল, যেমন আকাশের মেঘ দেখলে বোঝা যায় আমাদের বীজক্ষেত্রে বৃষ্টি হবে।
কিংবা কে জানে এইটাই সেই সবচেয়ে সুসময় কি না যা শ্যাম পেরিয়ে যাচ্ছে!
দুপুর রোদ মাথায় করে শ্যাম তার রোজকার পরিচিত থামটায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এত আলোর মধ্যেও তার মনে হচ্ছিল যে, চারধারে ছায়ার মতো অলীক অনর্থক মানুষেরা অকাজে হেঁটে যাচ্ছে। সবকিছুই বস্তুত অবাস্তব, একমাত্র সামনের ওই কাচের দরজাটা ছাড়া। ওপাশে লীলা বসে আছে। ব্যস্ত কর্মঠ তার দুটি সাদা সুন্দর হাত, অল্প গম্ভীর ও বিষণ্ণ তার মুখ। শ্যাম জানে লীলা এখনও কোনও সিদ্ধান্তে আসেনি। এখনও বড় দয়ালু ওর মন, আঘাত করার আগে তাকে সতর্ক হওয়ার সময় দিচ্ছে। শ্যাম জানে, খুব শিগগিরই একদিন রাস্তার লোকেরাই তাকে ঘিরে ধরবে, চোখ পাকিয়ে তাকে সরে পড়তে বলবে। শুধু যতদিন তা না ঘটবে ততদিনই বড় সুসময়। সবচেয়ে সুসময়।
