লোকটাকে শ্যামের চেনা মনে হয়। অনেকক্ষণ সে দেখে। সেই লোকটা কি, শ্যাম যার পিছু নিয়েছিল। লোকটা, ওই বদমাশ লোকটা এখানে কেন তা বুঝল না শ্যাম, সে শুধু মনে মনে আর্তনাদ করে উঠলকথা বোলো না। ওর সঙ্গে কথা বোলো না। কী কথা ওর সাথে? মুখ ফিরিয়ে নাও, কাজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ো। অনেকক্ষণ ধরে তোমার টেলিফোন বেজে যাচ্ছে, উত্তর দাও। বাইরে সন্ধে হয়ে এল, তুমি কাজ সেরে নাও। ওর দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে বলল, আচ্ছা, আপনি এখন আসুন…! কিংবা আরও কোনও কর্কশ কথা বলো লীলা, ওকে বের করে দাও। কিংবা আমাকে চোখের ইশারায় ডাকো, আমি ভিতরে গিয়ে ওকে বের করে আনছি। আমি ওকে চিনি, ও ভিড়ের মধ্যে লোকের পকেট হাতড়ে দেখে, মেয়েদের বুক ছুঁয়ে আসে ওর লোভী হাত। কথা বোলো না আর। লীলা, চুপ করো। কী কথা ওর সাথে! তুমি কি জানো না যে, একজন তোমাকে দেখছে?
বোধহয় টেলিফোন বাজল। লীলা একটু হেলে কানে চেপে ধরল টেলিফোন, ডান হাতে সে হলুদ পেনসিলটা ঠুকতে লাগল ডেস্কের ওপর, তবু লোকটার দিকে চেয়ে আছে সে, মৃদু হাছে। লোকটা সোয়েটারটা দু হাত দিয়ে একটু টেনে নামায়, ডেস্কের ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়ায় টেলিফোনটার দিকে। লীলা মাথা নাড়ে, পিছনে একটু হেলে সরে যায়। হাসে।
ওরা খেলছে–শ্যাম টের পায়। সমস্ত শরীর রি-রি করে ওঠে শ্যামের। আত্মবিস্মৃতি ঘটে যেতে থাকে। কী সাহস ওই লোটার! কেবল কাছে দাঁড়িয়ে থেকে, কেবল কথা বলে বা কেবল চোখের দৃষ্টিতে ও নষ্ট করে দিচ্ছে লীলার পবিত্রতা।
আর লীলা জানে যে শ্যাম তাকে দেখছে। তবু তার হৃক্ষেপ নেই। কিংবা কে জানে, লীলা তার ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে কি না!
এক-পা এক-পা করে এগিয়ে যায় শ্যাম। কী করছে তা বুঝতে পারে না। দরজার খুব কাছে এসে সে দাঁড়ায়। কাচের পাল্লায় তার লম্বা, শীর্ণ, এলোমেলো পোশাক পরা চেহারাব ছায়া ভেসে ওঠে। তার নিশ্বাসের ভাপ লেগে আবছা হয়ে যায় খানিকটা কাচ। তীব্র চোখে সে ভিতরের দিকে চেয়ে থাকে।
টেলিফোন রেখে সোজা হয়ে বসেই হঠাৎ শিউরে ওঠে লীলা, চিৎকার করে উঠতে গিয়েও মুখে হাত চাপা দেয়, অসহায় দুটি চোখ বিশাল হয়ে যায়। চোয়াড়ে চেহারার লোকটা বিদ্যুদবেগে চিতাবাঘের মতো ঘুরে দাঁড়ায়। শ্যাম দেখে, তার দুটো হাত মুঠো পাকানো, কিন্তু হতভম্বের মতো শ্যামের দিকে চেয়ে আছে।
শ্যাম মৃদু হাসে। তারপর এক-পা এক-পা করে পিছিয়ে আসে আবার। ল্যাম্পপোস্টে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় নিশ্চিন্ত মনে। শান্তচোখে চেয়ে থাকে হতভম্ব বিব্রত লোকটার দিকে চোখ দিয়েই বুঝিয়ে দেয়–সাবধান! আমি পাহারায় আছি।
লোকটা একটুক্ষণ তাকে দেখে, তারপর অস্বস্তিতে চোখ ফিরিয়ে নেয়। লীলা মুখ নিচু করে বসে আছে। দু’জন সুট পরা সাহেব ভিতরে ঢুকে গেল। তারা লীলার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলল। শ্যাম লক্ষ করে যে লীলার মুখ অল্প লাল, সে অনায়াসে হাসছে না আর, মাথা নেড়ে থমথমে মুখে প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিল। ঘর খালি হয়ে গেল আবার। চোয়াড়ে চেহারার লোকটা লীলার দিকে ফিরে কী যেন জিজ্ঞেস করল। লীলা মাথা নাড়লনা। চোখ নিচু করে রইল। লোকটার মুখে সামান্য হতাশা ফুটে উঠছে। শ্যাম দেখে। লোকটা একটু ইতস্তত করে, তারপর কাউন্টারের ওপরে রাখা ফোলিও ব্যাগটা নিয়ে বেরিয়ে আসে। দরজার বাইরে এসে লোকটা থমকে শ্যামের দিকে এক পলক তাকায়। শ্যাম গ্রাহ্য করে না। লোকটা বাঁ দিকে হেঁটে চলে গেল।
নিশ্চিন্ত মনে দাঁড়িয়ে থাকে শ্যাম। নড়ে না।
আস্তে আস্তে তার চারদিক অন্ধকার হয়ে আসে। ঘরের মধ্যে লীলাকে উজ্জ্বল দেখায়। বাচ্চা মেয়ের মতো অভিমানী গম্ভীর তার মুখ। শ্যাম হাসে। তার ঠোঁট নড়ে ওঠে—তোমাকে ওখানে মানায় না। এত ভিড়ের মধ্যে আর এত লোকজনের চোখের সামনে তোমাকে মানায় না। ভেবো না, আমি তোমার জন্যেই একদিন পৃথিবীকে খুব নির্জন করে দেব, চুপ করিয়ে দেব সবাইকে। গভীর শরবনের জঙ্গলে। ড়ুবিয়ে দিয়ে যাব সমস্ত শহর।…কে ওই লোক যার সঙ্গে তুমি কথা বলছিলে? ওরকম হৃদয়হীন চেহারার লোক পৃথিবী থেকে যত কমে যায় তত ভাল। তুমি কখনও ওই লোকের সঙ্গে দূরে যেয়ো না।
কাজ শেষ হয়ে গেলে লীলা সতর্কভাবে একবার দরজার দিকে চেয়ে দেখল। তারপর একটা টেলিফোন করল। পিছনে হেলান দিয়ে বসে রইল চুপচাপ। ঘরের মধ্যে দিয়ে যাওয়া-আসা করল অনেক লোক, শ্যাম তাদের লক্ষ করল না। লীলার বসে থাকার ভঙ্গি দেখে বুঝতে পারল যে, সে কারও অপেক্ষায় আছে। মৃদু হাসল শ্যাম, কেননা সে জানে যে, তাতে লীলার কোনও লাভ নেই।
কিন্তু অনেকক্ষণ কেউ এল না। লীলা উঠে ভিতরে গেল, আবার ঘুরে এল, কাউন্টারের উপর ঝুঁকে দরজার দিকে পিঠ করে কিছু একটা দেখার ভান করে অপেক্ষা করল। আবার অস্থিরভাবে ঘরের মধ্যে একটু হেঁটে বেড়াল। তারপর ধীরে ধীরে দরজার কাছে এসে পঁাড়াল লীলা। পিছনে আলো, তাই লীলাকে ছায়ার মতো দেখায়। কাচের খুব কাছ ঘেঁষে দাঁড়াল লীলা। শ্যাম স্পষ্ট বুঝতে পারে, ওই অন্ধকার মুখ থেকে দুটি অদৃশ্য চোখ তাকে লক্ষ করছে, বলছে, কী চাও রাস্তার লোক? কী চাও অচেনা?
সে দুটি প্রশ্নই শুনতে পায় যেন। অমনি কেঁপে ওঠে তার শরীর, ভুল পেয়ে বসে তাকে। সে বিড় বিড় করে বলে, আমি জানি না আমি কী চাই। আমি জানি না।
