বাইরে এসেও শ্যামের সঙ্গ ছাড়ল না মিত্র। বলল, চলুন, অনেককাল পর আজ মনটা হালকা আছে, একটু ঘুরে বেড়াই রাস্তায়। খাওয়ার পর হাঁটা ভাল।
হাঁটতে হাঁটতে মিত্র কথা বলে, জীবনটাকে দেখতে হলে ঘরে আগুন লাগিয়ে দিতে হয় মশাই। ঘরে থাকলেই কেবল ভার-ভার ভয়-ভয় লাগে, কেবলই ট্রাঙ্ক বাক্সে হাত বুলোই, জানালা দরজা নেড়ে দেখি, অকাজের চিন্তায় বুকে গর্ত খুঁড়ে ফেলি। অথচ আমার ভাবনার কিছু নেইঝাড়া হাত-পা, ভাই চাকরিতে, বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, বুড়ো বাপ-মা নেই, কিন্তু ওই একটুখানি একখানা ঘরই আমাকে মেরে রেখেছে মশাই, ওইটুকুরই বড় মায়া! বড় করে শ্বাস ছাড়ে মিত্র, ভাল করে চাদর জড়ায় গায়ে। বলে, ইচ্ছে ছিল ঘরটাকে অমন অনাবাদী ফেলে রাখব না…হাঃ হাঃ…ফুলে-ফুলে ভরে তুলব।
গোল পার্ক থেকে গড়িয়াহাটার দিকে ফিরে আসে দুজন। পাশাপাশি হাঁটে। মিত্ৰই কথা বলে যায়, অটোমেশন এসে গেল, যন্ত্রপাতির হাতে কাজ কর্ম বুঝিয়ে দিয়ে এবার আয়েসি মানুষদের ছুটি। এতদিনে বুঝি মশাই, কাজকর্ম আসলে যন্ত্রপাতিরই, মানুষের নয়।
শ্যাম হাসে। অন্যমনে হাঁটে।
বিধবাতেও আমার আপত্তি ছিল না মশাই, আমি শুধু শান্তশিষ্ট একজনকে চেয়েছিলুম, বয়স জাত রূপ কোনওটাই আমার দেখার ছিল না। কিন্তু কেবল মুখ ফুটে কাউকেই বলতে পারলুম না। বড় লজ্জা করে। একটু বেশি বয়সেই বিয়ের কথা ভেবেছিলুম, বয়স থাকার সময়ে ভাবতুম কেবল তার কথা, যে আমাকে দিব্যি দিয়ে নিজে সরে পড়েছে।…আয়ুটা বড় লম্বা, কী বলেন?…তা ঠিক বয়সে যখন বিয়ে করিনি, এই বয়সে আর লোককে নিজের বিয়ের কথা কী করে বলা যায়!…বলি বলি করেও শেষ পর্যন্ত কোথায় যেন আটকে যায়। বলতে পারি না। লজ্জা করে।
গড়িয়াহাটার কাছে মিত্রকে ছেড়ে দিল শ্যাম। মিত্রকে একই সঙ্গে খুশি আর বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও পিছু হটে এল মিত্র, বলল, আমাকে খুব অসহায় মনে করবেন না মশাই, আমি নিরস্ত্র নই। অনেক দিন থেকে নিজেকে সশস্ত্র রেখেছি আমি…হাঃ হাঃ…সময় থাকতেই জোগাড় করে রেখেছি পরিমাণ মতো ঘুমের ওষুধ…সতেরোটা ট্যাবলেট আছে আমার, হ মশাই, সতেরোটা। মায়ের ছিল না-ঘুমোনোর অসুখ, তখন থেকে চুরি করে জমিয়ে রাখা…জানতুম একদিন না একদিন কাজে লাগতে পারে…মাঝে মাঝে শিশিটা বের করে নেড়েচেড়ে দেখি…হাতে নিলেই মশাই, কেমন একটু জোর পাই, মনে বল-ভরসা এসে যায়, আর ভয় লাগে না…হাঃ হাঃ…
তারপর গলা নামিয়ে বলল, দরকার হলে বলবেন। যা ট্যাবলেট আছে তাতে দু’জনের ঢের হয়ে যাবে। ইচ্ছে করলে আরও এক-আধজনকে বলে দেখবেন। অনেকেই রাজি হবে। আমি ফ্রি দেব…হাঃ হাঃ…
শ্যাম মৃদু হেসে বলল, নেব। আমার দরকার হবে।
আচ্ছা, বলে গম্ভীর মুখে মিত্র চলে গেল।
দূর থেকে শ্যাম দেখল খয়েরি তুস চাদর গায়ে মাতাল একটা ভল্লুকের মতো মিত্র আলো-ছায়ায় হেঁটে যাচ্ছে তার জমিয়ে রাখা সতেরোটা ঘুমের বড়ির দিকে। তাকে পিছু ডাকতে ইচ্ছে হয় না। তাকে শ্যাম চলে যেতে দিল।
১১. ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্যাম
ঠিক দুপুরবেলায় ঘরে তালা দিয়ে বেরিয়ে পড়ল শ্যাম। সিঁড়ির মাথায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের প্যাকেট খুলে দেখল-শেষ সিগারেট। সেটা ধরিয়ে নিয়ে প্যাকেটটা শূন্যে ছুড়ে দিয়ে বাঁ পায়ে নিখুঁত একটা শট করল সে। প্যাকেটটা রেলিং টপকে গিয়ে দেয়ালে লেগে পড়ল সিঁড়ির বাঁক ঘুরবার চাতালে, শ্যাম আপনমনে হাসল—গো-ও-ও-ল! রেলিঙে ঝুঁকে ভারসাম্য রাখল, তারপর মসৃণ রেলিঙে হাত ছুঁইয়ে তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেল। পায়ে করে আবার সিগারেটের প্যাকেটটা টেনে নেয় সে। তারপর পায়ে পায়ে সেটাকে নিয়ে খেলতে খেলতে সিঁড়ি ভাঙতে থাকে—ইন আউট…ইন আউট…ইন আউট–আপনমনে বলে সে। অনেক স্মৃতি অনেক কথা ও দৃশ্য, ভাঙা শব্দ বুকের ভিতরে, মাথার ভিতরে ঝিলমিল করে ওঠে তার। কচ্ছপের পিঠের মতো এক ঢাল সবুজ মাঠ, একটা সাদা বল, আর সে ছুটছে আর ছুটছে…সামান্য হাসে সে, খাস টানে, তারপর আবার নামতে থাকে।
বড় রাস্তায় এসে এসপ্ল্যানেডের বাস ধরল শ্যাম।
নির্দিষ্ট জায়গায় ল্যাম্পপোস্টের তলায় দাঁড়াল শ্যাম। চোখের রোদ-চশমা খুলে নিল। মৃদু হাসল।
আবছা দেখা যেতে লাগল লীলার অবয়ব। তারপর জলের গভীর থেকে যেভাবে আস্তে আস্তে মাছ উঠে আসে জলের ওপরে, তেমনি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে লাগল সেই দুখানি সাদা ব্যস্ত হাত, গোল সুন্দর মুখখানা, কপাল-ঢাকা চুল। আজ তার সাদা ব্লাউজ। মাথায় উঁচু করে বাঁধা মস্ত খোঁপা।
দাঁড়াতেই চোখাচোখি হয়ে গেল। চমকে উঠল না লীলা, মুখ ফাঁক হয়ে গেল না। বরং জুড়ে গেল ঠোঁটে ঠোঁট, ভ্রূ কুঁচকে উঠল, দৃঢ় হয়ে গেল চোয়ালের হাড়। এক পলক দেখা হতেই সে তার চোখ সরিয়ে নিল। ব্যস্ত হয়ে গেল কাজে।
শ্যাম জানত এরকমই হবে। এরকমই হয়। মৃদু হেসে সে দাঁড়িয়ে রইল। ক্রমে অলীক এক আবছায়ার মধ্যে চলে যেতে লাগল তার চারপাশ, পথ-চলতি লোকজন, লুপ্ত হয়ে গেল সময়ের বোধ। আর কেবলই রেলগাড়ির শব্দ, হরিণের খুরের আওয়াজ, নিঃশব্দ এক বৃষ্টিপাতে ভরে আসে তার বুক, শরীরের ভিতরে ধীর গম্ভীর মেঘ ডেকে ওঠে।
চোয়াড়ে চেহারার একটা নোক লীলার সঙ্গে কথা বলছে। লোকটার পরনে গাঢ় গরম প্যান্ট, গায়ে সাদা সোয়েটার। লোকটা খুব ভদ্রভাবে হাসছে, কিন্তু তার মতলব শ্যাম পরিষ্কার বুঝতে পারে। সে নানা কথায় ভোলাচ্ছে লীলাকে। ওই তো লীলার মুখ-চোখ কোমল হয়ে এল, স্বপ্ন দেখার মতো অলস হয়ে এল চোখ, দু’টি ব্যস্ত হাত কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে আছে কাউন্টারের ওপর। লীলার ঠোঁটে চাপা আনন্দের হাসি! বোধহয় ঘরে আর কেউ নেই, কিছুক্ষণের অবসর পেয়ে গেছে লীলা। টেলিফোনটাও বোধহয় বাজছে না, কিংবা বাজলেও উত্তর দিচ্ছে না লীলা।
