একটুও নড়ল না শ্যাম। সে মৃদু হাসল। শরীরের ভিতরে চালু কারখানার শব্দ। সে বড় বেঁচে আছে। বুকে হাত রাখে শ্যাম। একটি রহস্যময় রেলগাড়ি বহু দূরের এক অচেনা পুল পেরিয়ে যাচ্ছে।
লীলার হাতে আর সাবলীলতা ছিল না। আড়ষ্ট ভঙ্গিতে সে টেলিফোন রেখে দিল, ঝুঁকে পড়ল কাউন্টারের ওপর। জোর করে নামিয়ে রাখা মুখ, ঘাড়ের তেজি বাঁকের ওপর অহংকার আর অবহেলা ফুটে আছে। শ্যাম লক্ষ করল। তার দুঃখ হচ্ছিল যে, সে আজও নিজেকে সাজায়নি। সাজলে আজ লীলা তাকে চিনতই না। গালে রুক্ষ দাড়ি, গায়ে এন্ডির চাদর, ধুতি আর স্যান্ডেল পরা এই চেহারা তার। নিয়তির মতো, লীলার কাছে তাকে এভাবেই আসতে হবে, শ্যাম জানো নইলে লীলা তাকে আর পাঁচটা লোকের সঙ্গে মিশিয়ে ফেলবে, পেনসিল চেপে ধরবে না প্রাণপণে, চোখ বুজে ফেলবে না, নামিয়ে নেবে না মুখ, শ্যাম জানে।
আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হয়ে গেল লীলার ভঙ্গি। কিন্তু তার অলস ভাব রইল না, সে আর হাসল না এবং আর একবারও তাকাল না শ্যামের দিকে। সে শুধু মাঝে মাঝে আড়চোখে দরজাটা দেখে নিচ্ছিল বোধহয় এই ভয়ে যে, শ্যাম যে-কোনও সময়ে দরজা ঠেলে ঢুকে পড়তে পারে।
শ্যাম মৃদু হাসে। দাঁড়িয়েই থাকে। মাঝে মাঝে শুধু শরীরের ভর এ পা থেকে ও পায়ে সরিয়ে নেয়।
অন্ধকার হয়ে এল। শ্যামের মাথার উপর টুক করে জ্বলে উঠল রাস্তার আলো। শ্যামের সামনে দাঁড়িয়ে একটা বেঁটে লোক, সে একটা দামি চোরাই কলম, কিনবে কি না তা বিনীতভাবে জিজ্ঞেস করল। শ্যাম মাথা নাড়ল। না। বস্তুত কলম শব্দটাই সে ধরতে পারল না।
ক্রমশ সে বুঝতে পারছিল তার চার ধারে লোকজনের ভিড় বেড়ে যাচ্ছে, অফিস-ছুটির ভিড়। এবার অনেকেই তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হবে। কে জানে এদের মধ্যে সেদিন বৃষ্টির বিকেলের দু-একজন লোক আছে কি না, যারা তাকে আর লীলাকে চিনতে পারবে। মৃদু হাসল শ্যাম। তবু দাঁড়িয়েই রইল।
সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল, আস্তে আস্তে হাতের কাজ শেষ করে ফেলল লীলা। গুছিয়ে রাখল তার কাগজ। তারপর চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। দ্বিধা। এবার সে বেরিয়ে আসবে। সে উঠে দাঁড়াল। হঠাৎ ঝলমল করে উঠল তার হলুদ শাড়ি, শাড়ির সবুজ পাড়, সবুজ ব্লাউজ, উঁচু চেয়ার থেকে নামতেই তাকে ছোটখাটো দেখাচ্ছিল। সে ক্লান্ত ভঙ্গিতে কপালের চুল সরিয়ে কাউন্টারের ভিতর থেকে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেল। তারপর আর তাকে দেখা গেল না।
কিছুক্ষণ পরে কাচের দরজা ঠেলে ছায়ামূর্তির মতো বেরিয়ে এল রাস্তায়। শ্যাম দেখল তার সঙ্গে খাকি পোশাক পরা পিয়ন গাছের একজন লোক রয়েছে। সতর্কতা। লোকটা লীলার পাশাপাশি হেঁটে গেল। পিছু নিল শ্যাম। একটু দূরে থেকে দেখল বড় দ্রুত হাঁটছে তারা। লোকটাই একটা ট্যাক্সির সামনে দু’হাত তুলে দাঁড়িয়ে ট্যাক্সিটাকে দাড় করাল। একবারও ফিরে তাকাল না লীলা। চকিতে ট্যাক্সির ভিতরের অন্ধকারে ঢুকে গেল। এত দ্রুত ঘটল এসব ঘটনা যে, শ্যাম তার ঘোর কাটিয়ে উঠতে না-পেরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে দেখল। দাঁড়িয়েই রইল। মুখে সেই মৃদু হাসি, সমস্ত শরীরে শক্ত ঋজুভাব।
.
রাতে খাওয়ার সময় আবার মুখোমুখি মিত্রর সঙ্গে দেখা। বলল, অটোমেশন এসে যাচ্ছে মশাই। আমাদের অপশন দিচ্ছে, সময়ের আগেই অবসর নিয়ে নিন, কোম্পানি কমপেনসেশন দেবে মোটা টাকার। তা ভাবছি এবার বসেই পড়ি মশাই, এত খাটাখাটনি যে কার জন্য তা বুঝতেই পারি না।
শ্যাম অন্যমনস্কভাবে হাসে।
পনেরো বছরের ওপর চাকরি হয়ে গেল বয়সের কথাটা বোধহয় খেয়াল ছিল না মিত্রর, তাই বলেই চকিতে একটু হাসল, সার্টিফিকেটে যা-ই থাক মশাই, আমার প্রায় চল্লিশ এখন, কিন্তু এখনই কেমন বুড়ো বুড়ো লাগে নিজেকে। অফিসে যতক্ষণ কাজকর্মে থাকি ততক্ষণ মনে হয় বাইরে বোধহয় খুব আলো বাতাস, হইহল্লা আনন্দের মচ্ছব চলছে, আবার বাইরে এসে সময় কাটতে চায় না। আগে ফুটবল খেলা দেখার ঝোঁক ছিল, একটু-আধটু তাস-দাবা খেলতুম, এখন আর তাও পরিশ্রম বলে মনে হয়। বইপত্রও ঘাঁটি না কতদিন! মাঝে মাঝে শুধু জ্যোতিষের বই খুলে নিজের হাত দেখি আর হাসি। বলতে বলতেই একটু ঝুঁকে পড়ল মিত্র, সামান্য চাপা গলায় বলল, বিশ্বাস করুন মশাই, আমার হাতে অনেক ভাল সাইন ছিল, সুন্দর সান লাইন আর বৃহস্পতির মাউন্ট বলতে বলতে মিত্র তার এঁটো ডান হাতটাই প্লেটের কানায় একটু চেঁছে নিয়ে খুলে দেখাল-দেখুন না!
শ্যাম দেখল মিত্রর এবড়োখেবড়ো হাত, ভোঁতা নখ আর মাছের ঝোল লাগা কালচে একটা হাতের চেটো। বলল, বাঃ!
মিত্র হাসে, হাতের জন্যই কনফিডেন্স ছিল আমার, ভেবেছিলুম এর জোরে বেরিয়ে যাব। তা ছাড়া দেখুন, কুমপৃষ্ঠের মতো আমার লাইন অব হেড। শুক্রস্থান ভাল। হাতে প্রেমের চিহ্ন আছে-লাভ ম্যারেজ। কিন্তু ঠোঁট উলটে হাসল মিত্র, কিছুতেই কিছু হয় না মশাই! চল্লিশে আমি রিটায়ারমেন্টের কথা ভাবছি! ছুটি নিয়ে গ্রামে-টামে চলে যাব, খুলব একটা পোলট্রি, ডিম মুরগি বেচব। কী বলেন?
শ্যাম হাসে।
মিত্র মাথা নাড়ে, কিংবা রমতা যোগীও হয়ে যেতে পাবি। ঠিক নেই। কোরবদ্রী কাশীধাম ঘুরে ঘুরে বেড়াব। বড় ইচ্ছে ছিল মশাই, ঘুরে বেড়াবার, কিন্তু কেমন যেন মন হয়নি, হাওড়া ব্রিজ পেরোবার কথা হলেই আলিস্যি ধরে, কতকাল যে রেলগাড়িতে চড়িনি!
