দূরে গঙ্গায় বেজে ওঠে জাহাজের ভোঁ। মাথার ওপর উড়োজাহাজের বিষণ্ণ শব্দ। শ্যাম অন্যমনে সাড়া দেয়, যাই।
ময়দানের পাশ ঘেঁষে যেতে যেতে মাত্র কয়েক পলকের জন্য স্বপ্নের সেই দেশ শ্যামের চেতনাকে ছুঁয়ে গেল।
ক্লান্ত শ্যাম ট্রাম থেকে নেমে ধীর পায়ে পেরিয়ে গেল গড়িয়াহাটার মোড়। তার গা ঘেঁষে বুড়ো গেঞ্জিওয়ালা উলটো দিকে হেঁটে যায়, ধীর গম্ভীর স্বরে হাঁকে, গেঞ্জি…!
কয়েক পা হেঁটে যায় শ্যাম, তারপর শোনে হতাশ এক গেঞ্জিওয়ালা স্বর টেনে চলেছে—গেঞ্জি…! দূরে চলে যাচ্ছে সেই ডাক। মাথার ভিতরে হঠাৎ আবার টলমল করে ওঠে ঘোলা জল, কিন্তু মনে পড়ে না, মনে পড়ে না–
আবার কয়েক পা হেঁটে যায় শ্যাম, তারপর ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ে, অস্ফুট গলায় বলে ওঠে, সোনাকাকা!
ঘুরে দাঁড়িয়ে ভিড় ঠেলে উজিয়ে আসতে চেষ্টা করে শ্যাম। কিন্তু ততক্ষণে বহুদূরে চলে গেছে। গেঞ্জিওয়ালার ওই ডাক। শ্যাম মাথা নেড়ে আপনমনে বলে, আঃ, সোনাকাকা!
তার মনের মধ্যে বুড়ো মুখ তুলে ছানি-পড়া চোখে বে-ভুল চেয়ে থাকে সোনাকাকা, অঃ মনু! মাথা নেড়ে বলে, মনু রে!
তার কাঁধে হাত রাখে শ্যাম, সোনাকাকা, বাইচ্যা থাইকো। আরও কিছুদিন বাইচ্যা থাইকো। বিড় বিড় করে কথা বলে শ্যাম, আমি নিয়ে আসব সুদিন। অপেক্ষা করো।
হোটেলে মিত্রর সঙ্গে দেখা হলে মিত্র চোখ কপালে তুলে বলল, আজ একটা কাণ্ড হয়ে গেল মশাই, ভালবাসার ব্যাপার, খুব ইন্টারেস্টিং…
শ্যাম ভ্রূ তুলে হাসল, বটে!
মিত্র ঝুঁকে বলল, মেয়েটা কুমারী থেকে এক লাফে বিধবা হয়ে গেছে। ডবল প্রমোশন।…মাঝখানে মাসখানেক আসেনি, আজ এল, পরনে সাদা থান, হাতে চুড়ি নেই, কানে দুল, গলায় হার নেই, মুখ-চোখ থমথম করছে। আমরা তো প্রথমে কিছু জিজ্ঞেসই করতে পারি না, এ ওর মুখ চাই—এই সেদিনকার কুমারী মেয়ে, বিয়ে হয়নি, হঠাৎ এ কী? জিজ্ঞেস করতেই প্রথমে কেঁদে ভাসাল, বলল, আমি বিধবা। আমার স্বামী মারা গেছে।…কিন্তু বিয়ে হল কবে? জিজ্ঞেস করলে কেবল মাথা নেড়ে বলে, হয়েছিল।…কিন্তু কবে? অনেক কষ্টে তারপর মুখ ফুটল মেয়ের, বিয়ে হয়নি, কিন্তু হয়ে যেত। আমি মনে মনে ওকে স্বামী বলে জানতুম, আর কেউ কখনও কোনও দিন আমার স্বামী হবে না…শুনলুম ছোকরা অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে মশাই…।
বলতে বলতে মিত্র গম্ভীর হয়ে গেল হঠাৎ, বলল, অদ্ভুত ব্যাপার মশাই, এই ভালবাসা! কী বলেন?
শ্যাম হাসে। হঠাৎ তার মাথার ভিতরে আস্তে জেগে ওঠে ভ্রমরের শব্দের মতো মোটর সাইকেলের আওয়াজ। অ্যাকসিডেন্ট! কীরকম অ্যাকসিডেন্ট?
মিত্র অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, কী জানি, আজকাল লোকে বলে ভালবাসা-টাসা আর নেই, সব অ্যাডজাস্টমেন্ট! আমারও সেইরকম বিশ্বাস এসে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ আজ পুরনো ঘায়ে খোঁচা। লেগেছে মশাই! খুব মজা করলুম বটে অফিসে ব্যাপারটা নিয়ে, কিন্তু মনটা ভার হয়ে আছে। ভিতরে ভিতরে একটা হেমারেজ টের পাচ্ছি।
আবার অনেকক্ষণ চুপচাপ কেটে যায়। খাওয়া হয়ে গেলে আঁচিয়ে এসে একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ে দু’জনে। চলে যাওয়ার আগে মিত্র হঠাৎ বলল, দেখুন, আমাকেও কীরকম বিধবা করে রেখে গেছে একজন। পুরুষ বলে থানটা পরিনি, কিন্তু ভিতরে ভিতরে…না মশাই, হাসবেন না, কিন্তু এক-একদিন নিরালা ঘরে বসে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে।
.
অনেক রাতে ঘুম ভেঙে শ্যাম টের পেল রাস্তা দিয়ে একজন হকার গেঞ্জি’ হাঁকতে হাঁকতে চলে যাচ্ছে।
এত রাতে? মনে হতেই লেপ সরিয়ে জানালার কাছে এসে দাঁড়াল শ্যাম। বাঁ দিকে চেয়ে দেখল— রাস্তা শূন্য। ডান দিকে চেয়ে দেখল-রাস্তা শূন্য। তবু বহু দূর দূর থেকে দূরে রাতের গভীরে চলে যাচ্ছে ওই ডাক—গেঞ্জি…গেঞ্জি…।
সোনাকাকা! নিজের কান চেপে অভিভূত শ্যাম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর আস্তে আস্তে আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখল শ্যাম। নিথর কালপুরুষ, ছায়াপথ, নক্ষত্রমণ্ডলী। আর সেই হিম আকাশে, নক্ষত্রে, তারা থেকে তারায়, ছায়াপথ পেরিয়ে রোগা, বুড়ো, প্রায়-অন্ধ সোকাকা ফেরি করতে করতে চলে যাচ্ছে তার সওদা-গেঞ্জি…গেঞ্জি…!
০৯. মোটর-সাইকেল দুর্ঘটনা
তেইশ ডিসেম্বর মোটর-সাইকেল দুর্ঘটনায় আহত এক ব্যক্তি আজ হাসপাতালে মারা গেছেন—এ-রকম একটা খবর পর পর কিছুদিন পত্রিকায় খুঁজে দেখল শ্যাম। নেই। নেই। অথচ প্রতিদিন খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠা থেকে দুর্ঘটনার খবর থাকে। কতভাবে যে মরে যাচ্ছে মানুষ ইঁদুর আরশোলা কিংবা রোজ জল-না-পাওয়া চারাগাছের মতো তা দেখলে আশ্চর্য হতে হয়। এইভাবে মরে মরে যদি পৃথিবীর ভিড় কমে যায়! যদি আস্তে আস্তে নির্জন হয়ে আসে পৃথিবী! ভাবতেই শ্যামের চোখে-মুখে আনন্দে। রক্তোচ্ছাসের ঝাপটা এসে লাগে। তখন বড় সুন্দর হবে এই শহর, আরও রহস্যময়ি হবে পৃথিবী। তখন সব মানুষই হয়ে যাবে সব মানুষের চেনা পরিচিত আত্মজন। ভালবাসায় ভরে উঠবে পৃথিবী। থাকবে না প্রতিযোগিতা, আক্রমণ লোপ পাবে, তখন মানুষের ভাষা থেকে লুপ্ত হবে গালাগাল, অশ্লীল কিংবা কঠিন শব্দ। তখন দূরের মহাদেশ নিয়ে রূপকথার গল্প জমবে খুব। তখন আরও পাখি, প্রজাপতি ও উদ্ভিদের জন্ম হবে পৃথিবীতে। পরিষ্কার সুগন্ধি বাতাস বয়ে যাবে। তখন পাওয়া যাবে দূরের শব্দ কিংবা গন্ধ, আর নিজেকে পাওয়া যাবে হাতের মুঠিতে। অল্প কিছু লোকের ভিতর থেকে সহজেই বেছে নেওয়া যাবে কয়েকটি বন্ধু, কিংবা নিজের স্ত্রীকে, আলাদা করে চেনা যাবে ভাড় কিংবা শয়তানকে, এখনকার মতো সব গোলমেলে মনে হবে না।
