.
এসপ্ল্যানেডে ফুটপাথে সঁডিয়ে হাত তুলে ‘হেঃ ট্যাক্সি…’ বলে ট্যাক্সি দাড় করায় অরুণ। শ্যামকে বলে, চ তোকে পৌঁছে দি।
হাই তোলে শ্যাম, বলে, না। বাসায় ফেরার তাড়া নেই। আমি একটু ঘুরে-ফিরে যাব। তুই যা।
ট্যাক্সির দরজা বন্ধ করার আগে অরুণ নিচু গলায় বলল, যদি মনে ধরে থাকে তো লেগে যা। আমি দেখব।…চাকরির জন্য ভাবিস না শ্যাম, আমার শ্বশুরের ফার্ম, আমি যাওয়ার আগে বুড়োকে পগিয়ে যাব, তোর ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বলতে বলতে ভীষণ বদমাশের মতো হাসে অরুণ, শরীরটা কেমন দেখছিস আমার? ভাল না?
আঃ ফাইন! শ্যাম হাসে।
ফর অ্যামেরিকা, দি ল্যান্ড অব ফ্রি সেক্স! দেখিস, ষাট বছর বয়সেও আমি শরীর রেখে দেব। চিয়ারিও…
চলন্ত ট্যাক্সি থেকে হাত দেখায় অরুণ। বিদেশি এক অরুণ, যাকে ঠিক ঠিক চেনে না শ্যাম, অথচ চেনা বলে মনে হয়!
শূন্য মনে হেঁটে যায় শ্যাম। তার মাথার মধ্যে ভ্রমরের শব্দের মতো দূরাগত এক মোটর-সাইকেলের আওয়াজ ঘুরে বেড়ায়। অস্থির বোধ করে সে। খ্রিসমাসের জন্য সাজানো দোকানপাট, রঙিন কাগজের শেকল, বুড়ো সান্টা ক্লস আর নকল পাইন গাছ চোখের পাশ দিয়ে সরে যায়। হ্যান্ডবিলে বিজ্ঞাপন বিলি করছে একটা লোক, শ্যামের হাতেও সে একটা কাগজ গুঁজে দেয়। তাতে ইংরিজিতে বড় হরফে লেখা, আপনার বিপদ কেটে গেছে…তারপর একটা ওষুধের গুণ-বর্ণনা। মৃদু হেসে কাগজটা দুমড়ে ফেলে দেয় শ্যাম। মনে মনে গুনগুন করে শাম, আঃ আমার বিপদ কেটে গেছে! বিপদ আর নেই!
০৮. সেকেন্ড ক্লাস ট্রামের জানালার
ফিরবার সময়ে সেকেন্ড ক্লাস ট্রামের জানালার ধার ঘেঁষে বসা একটা লোক মাথা নিচু করে তাকে আদাব দিল। পরনে পায়জামা, লক্ষৌ-এর কাজ করা পাঞ্জাবি আর মাথায় মোটা সুতোয় বোনা নেট-এর একটা গোল টুপি, যা মাথার সঙ্গে চেপে বসেছে। চোখে সুর্মা। ইরফান!
ইরফান! কেমন আছ!
শ্যাম ট্রামে উঠতেই লোকটা খুব বিনয়ের সঙ্গে হেসে উঠে দাঁড়িয়ে জায়গা ছেড়ে দিল, বসুন চক্রবর্তীবাবু।
শ্যাম বসল না, ইরফানের কাধে আলতো করে হাত ছুঁইয়ে বলল, আরে তুমি বোসো।
বোসো। ইরফান মৃদু হেসে বলে, আপনি বসুন, আমি পার্ক স্ট্রিটে নেমে যাব।
শ্যাম ক্লান্তভাবে বসে হেসে বলল, কী খবর?
ইরফানের মুখে আবার সেই বিনয়ের হাসি, আজকাল আসেন না আর।
না, অনেককাল শ্যাম আর যায় না রাজাবাজারের ইরফানের কাছে। যাওয়ার দরকার হয় না। আগে প্রতি মাসে যেতে হত। আড়াইশো টাকা জমা দিলে ইরফান তার ঢাকার এক আত্মীয়কে চিঠি লিখে দিত–”আমাদের দক্ষিণের বাগানে এবার খুব আম হইয়াছে। বানিখাড়ার কমলাক্ষ চক্রবর্তীকে দুইশত আম পাঠাইয়া দিবেন।” আর বাবা ঠিকঠাক দুই শ’ টাকা পেয়ে যেত ওখানে।
কাজ-কারবার কেমন! শ্যাম জিজ্ঞেস করে।
মন্দা। হুন্ডি ধরে ফেলেছে। নিচু গলায় বলে ইরফান। হাসে, এখন কারবার সাহাবাবুদের হাতে আর ঢাকার মাড়োয়ারি।
কোনও কথাই ভাল করে শুনছিল না শ্যাম। একটা অন্ধকার মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছে ট্রাম, হু হু করে হাওয়া লাগে। শ্যাম বয়স্ক ইরফানের সুর্মা-টানা সঙের চোখের মতো চোখে চোখ রেখে চেয়ে থাকে। ভদ্রতার হাসি হাসে।
পার্ক স্ট্রিটে নেমে গেল ইরফান। নামার আগে হঠাৎ কানের কাছে মুখ এনে বলল, যদি পাকিস্তানে যাওয়ার দরকার পড়ে তো বলবেন। হাতে ভাল এজেন্ট আছে, বর্ডার পার করে দেবে, আবার দশদিনের মাথায় ফিরিয়ে আনবে। কোনও ভয়-ডর নেই। বলবেন।
পার্ক স্ট্রিটে নেমে গেল ইরফান। যাওয়ার সময়ে আবার আদাব দিল রাস্তা থেকে।
ইরফান নেমে গেলে হঠাৎ শ্যামের মনে পড়ল যে, লোকটা মুসলমান। মনে পড়ল যে, সে হিন্দু। আশ্চর্য! সে যে হিন্দু এ-কথাটা অনেক দিন হয় তার খেয়ালই ছিল না। মনে পড়েনি-আমি হিন্দু। মনে পড়তেই শ্যাম সামান্য হেসে ওঠে—আশ্চর্য, আমি হিন্দু! কেমন হিন্দু আমি! হিন্দু হয়ে আমি কেমন আছি।
অনেক ভেবেও শ্যাম শব্দটার কোনও অর্থ খুঁজে পেল না। অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, সে হিন্দু। সে ভারতীয়। কিংবা সে বাঙালি। অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, সে কমলাক্ষ চক্রবর্তীর ছেলে, সাকিন-বানিখাড়া, ঢাকা জেলা। অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, শ্যাম চক্রবর্তী নামে কেউ সেইন্ট মিলারের প্রাক্তন ছোটসাহেব, কিংবা…ক্লাবের এককালের লেফট আউট! অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, এইসব নাম-পরিচয়ের মধ্যে সে বাঁধা আছে। অবিশ্বাস্য মনে হয় যে, এইসব নাম-পরিচয়ের বাইরে তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই!
.
কুয়াশার ভিতর দিয়ে ভেসে যাচ্ছে ট্রাম, ময়দান পেরিয়ে যাচ্ছে অস্পষ্ট চাঁদের আলোয়। শ্যাম জানালার কাঠে মাথা হেলিয়ে দেয়। তারপর ক্রমে লক্ষ্য ভুলে গিয়ে তার ট্রামগাড়ি অচেনা অজানায় পাড়ি দেয়। চারদিকে চাঁদ আর কুয়াশার মায়া, হু হু করে কেঁদে ওঠে প্রকাণ্ড নিষ্ফলা মাঠ, গাছের ভুতুড়ে ছায়া পাথরের মতো জমে আছে।
টিকিট!
বিরক্ত শ্যাম হাত তুলে কন্ডাক্টরকে সরে যেতে বলে। কন্ডাক্টর সরে যায়।
মায়াবী ট্রামগাড়ি চেনা পথ ছেড়ে দিয়ে বেঁকে যায়, ঘুরে যায় অচেনায়। গাছপালা ডেকে ওঠে, এসো শ্যাম! বাতাস ফিস ফিস করে বলে, এসো শ্যাম! তারপর তাকে ছুঁয়ে আনন্দে বাতাস ছুটে যায় গভীরতর রাজ্যের ভিতরে পাহাড়ে, গুহায়, নদী কিংবা সমুদ্রের ওপর দিয়ে সুগন্ধের মতো ভেসে যায় সুসংবাদ–শ্যাম, আমাদের শ্যাম। মাটিতে পা রাখতেই মায়ের মতো মাটি ডেকে ওঠে, শ্যাম! পাখির চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া জলের মতো শিশির জমে আছে ঘাসে। কালকাসুন্দির ঝোপে, কুলবড়ই গাছের তলায়, কুয়োর পাড়ে আতাবনে বাদুড়ের মতো ঝুলছে অন্ধকার, চকমক করে ঘুরে বেড়াচ্ছে জোনাকি পোকা। নোনাপুকুরের আঁশটে গন্ধ পায় শ্যাম, শাপলার গায়ের গন্ধ, নিথর রাতকে চমকে দিয়ে জলে ঘাই দেয় বড় মাছ, তারপর শান্ত জলের নীচে পরিদের গভীর রাজ্যে চলে যায় তার অতিকায় নিঃশব্দ গতিময় ছায়া।
