কিংবা যদি আরও নির্জন হয়ে যায় পৃথিবী! যদি ক্রমে ক্রমে জনশূন্য হয়ে যায় শহর, প্রান্তর, মহাদেশ! সমস্ত পৃথিবীতে আর একটিও মানুষ বেঁচে নেই একমাত্র শ্যাম ছাড়া!
ভাবতে ভাবতে শ্যাম ঘরের মেঝেয় ছড়ানো সিগারেটের টুকরোর ওপর পা ফেলে দ্রুত পায়চারি করে, লাথি মেরে সরিয়ে দেয় একটা বই, জ্বরো রুগির মতো নিজের লম্বা জট-পাকানো চুল চেপে ধরে ‘উঃ’ বলে হেসে ওঠে, আয়না তুলে ধরে নিজের খেপাটে অচেনা মুখের সামনে। তঁা, তখন? মানুষের তৈরি কলকারখানাগুলি গভীর ঘাসের সবুজে ড়ুবে যাবে, রেল-ইঞ্জিনগুলি জং ধরে আস্তে আস্তে মিশে যাবে মাটিতে, জাহাজ গলে জল হয়ে যাবে, এরোপ্লেনের গা জড়িয়ে উঠবে মাধবীলতা, উঁচু উঁচু বাড়িগুলির মাথায় জাতীয় পতাকার মতো উড়বে অশ্বথের পাত, আমাদের কাঠের আসবাবগুলি আবার উদ্ভিদ হয়ে যাবে। একটি মানুষের জন্য থাকবে একটি সূর্য, একটি চাঁদ, এক-আকাশ নক্ষত্র, একটি পৃথিবীময় জল-স্থল-শূন্যময় খোলা জায়গা।
নিজেকেই বিড় বিড় করে প্রশ্ন করে শ্যাম। নিজেই উত্তর দেয়।
তখন কি তোমার খুব একা লাগবে না শ্যাম?
না! শ্যাম মাথা নাড়ে, না।
তখন কাউকেই কি তোমার দরকার হবে না শ্যাম! মায়ের মতো কেউ, কিংবা বৃন্দা, মাধবী, ইতুর মতো কেউ? শিশু সন্তানের মতো কেউ? ভাইয়ের মতো কেউ?
না! শ্যাম মাথা নাড়ে, না।
যদি তুমি তখন কথা বলতে ভুলে যাও! যদি ভুলে যাও গান গাইতে। কিংবা ভুলে যাও ভাষার ব্যবহার! রতিক্রিয়া ভুলে যাবে? চিঠি লেখা? তোমাকে প্রশংসা করার লোক থাকবে না? এমন কেউ থাকবে না যে তোমাকে সুন্দর দেখে? তোমার কাছে থেকে দূরে যাওয়ার কেউ থাকবে না? থাকবে না কাছে আসার কেউ?
না! শ্যাম মাথা নাড়ে, না।
তারপর শ্যাম আস্তে হেসে ওঠে। আয়নায় নিজের মুখের দিকে চেয়ে নিজেকে একটি ধাঁধা জিজ্ঞেস করে–
বলো তো এমন একা কে? জল স্থল শুন্যময় যার অখণ্ড পরিসর! যে আত্মজনহীন! যার নেই দুরে যাওয়ার বা কাছে আসার কেউ? কে এমন স্বয়ংসম্পূর্ণ, শ্যাম?
শ্যাম বিড় বিড় করে বলে, আমি।
আবার খবরের কাগজ তুলে নেয় শ্যাম। হতাশভাবে মাথা নাড়ে। না, লোকটা মরেনি। হয়তো কিছু হয়নি লোকটার। সে হয়তো আড়াল থেকে শ্যামকে লক্ষ করে যাচ্ছে, অপেক্ষা করছে একটি মুহূর্তের যখন শ্যাম কোনও রাস্তার বাঁকে মোড় নেবে, তখন তার হাতের আয়নায় রোদ ঝলসে উঠে পড়বে শ্যামের মুখে।
না, লোকটা মরেনি। শ্যাম নিশ্চিত। সে জানালার কাছে এসে দাঁড়ায়। রাস্তাটা ভাল করে দেখে নেয়। ওই তো চেনা পেট-মোটা বেঁটে লাল ডাকবাক্সটা রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, ল্যাম্পপোস্টে লাগানো চৌকো বাক্সের গায়ে সিনেমার বিজ্ঞাপন, চেনা লাল হলুদ সাদা কয়েকটা বাড়ি, দত্তদের বাগানে খেলছে কাক আর সিঁড়িতে শুয়ে আছে পাঁচটা বেড়াল, দুটো ট্যাক্সি গেল পর পর, পিছনে মন্থরগতি এক ঠেলাওয়ালা, একটি-দুটি মেয়ে আর কয়েকজন শান্ত নিরীহ চেহারার লোক, সকালের রোদ চারদিকে ফসলের মতো ফলে আছে। কোনওখানেই সন্দেহের কিছু নেই, তবু শ্যাম টের পায়, এই সব কিছুর আড়াল থেকে দুটি চোখ তাকে চোখে চোখে রাখছে।
কেমন সেই লোক যার মুখে শ্যাম আলো ফেলেছিল? মিনুর মতোই নিষ্ঠুর কেউ কি? তার মুখ দেখেনি শ্যাম, লক্ষ করেনি তার গায়ের রং, জানে না সে কতটা লম্বা কিংবা তার বাড়িতে কে কে আছে, কে জানে সে সুবোধ মিত্রর অফিসের সেই কুমারী বিধবা মেয়েটির প্রেমিক কি না। কিংবা কে বলতে পারে যে লোকটা মিনু নয়! বিধবা নয় তার সঙ্গীদের একজন!
শ্যাম মনে মনে বলে, তবু পৃথিবী থেকে লোকজন ঢের কমে যাওয়া ভাল। আরও শালিক আরও চড়াই আরও উদ্ভিদের, আরও ভালবাসা, রহস্য ও স্বপ্নের বড় প্রয়োজন আমাদের।
একদিন এসপ্ল্যানেডের খোলা রাস্তায় হঠাৎ অসময়ে বৃষ্টি নামল। অকালে। গোপনে মেঘ জমেছিল আকাশে, শ্যাম টের পায়নি। হঠাৎ খেয়াল করল তার চার পাশে হরিণের খুরের শব্দ। চরাচর জুড়ে ছুটে আসছে অজস্র অসংখ্য হরিণ। হাওয়ার সামান্য গতিতে ছুটে যাচ্ছে তার চারপাশ দিয়ে।
শ্যাম ছুটে গিয়ে দাঁড়াল একটা গাড়ি বারান্দার তলায় এক পাল লোকের ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যে। ময়লা, ভ্যাপসা গন্ধওয়ালা রুমালটা পকেট থেকে বের করে বহুদিন পর কাজে লাগাল শ্যাম, চুল আর দাড়িতে জল মুছে নিল। ঠান্ডা হাওয়ায় বড় শীত করে উঠল তার। সে ভিড়ের ভিতরে একজন মোটাসোটা লোক খুঁজে দেখল যার পিছনে দাঁড়ানো যায়। নেই। পকেটে হাত দিল সিগারেটের জন্য। নেই। আর্কেডের তলায় খুঁজল একটা সিগারেটের দোকান। পেয়ে গেল। মন্থর পায়ে ভিড় ঠেলে দোকানটার সামনে এসে দাঁড়াতেই ভয়ংকর চমকে গেল শ্যাম। প্রায় চার ফুট চওড়া একটা দোকান-জোড়া আয়না—অজস্র মাথা ও মুখের ভগ্নাংশ দেখা যাচ্ছে, সে নিজের সম্পূর্ণ অচেনা ভিখিরির মতো কাঙাল মুখ দেখতে পাচ্ছিল, আর দেখল পিছনের ভিড় থেকে একটি আবো-চেনা মুখ ঘাড় ঘুরিয়ে সামান্য কৌতূহলী চোখে তাকে দেখছে। একটি মেয়ে। সিগারেটের জন্য খুচরো পয়সা-ধরা বাড়ানো হাত থেমে রইল, শ্যামের বুকের ভিতরটায় হঠাৎ শূন্যতার মধ্যে চমকে ওঠে তার হৃৎপিণ্ড, রেলগাড়ির আওয়াজ শুরু হয়ে যায়।
মুখ ফিরিয়ে শ্যাম মেয়েটির দিকে তাকাতেই মেয়েটি কৌশলে অন্যমনস্কতার ভান করে সরিয়ে নিল চোখ, তারপর খুব সাবধানে, যেন বিশ্রী না দেখায় এমনভাবে, ধীরে মুখ ফিরিয়ে নিল।
