চেয়ার থেকে ধীরে উঠে দাঁড়ায় মেয়েটি, লে’ মি হেলপ ইউ!
বুকের ভিতরে আর্তস্বরে কথা বলে শ্যাম, না। আমাকে ছুঁয়ো না। মুখে কথা ফোটে না, তাই সে কেবল মাথা নাড়ে না। তারপর এক-পা এক-পা করে পিছু হেঁটে যায় শ্যাম। কাচের পাল্লায় হাত রাখে। সাদা মুখে ঘাবড়ে যাওয়া মেয়েটি তার দিকে চেয়ে থাকে।
পাল্লা ঠেলে বোদ আর লোকজনের ভিতরে বেরিয়ে আসে শ্যাম। ফুটপাথে দাঁড়িয়েও সে বিড়বিড় করে বলে, প্রশ্ন কোরো না আমি কে! আমি জানি না।
তারপর শ্যাম হঠাৎ ‘ইয়াঃ’ বলে হেসে ওঠে। মাথা নাড়ে–না, কোনওখানেই নেই লুকিয়ে থাকবার নিরাপদ জায়গা, কিংবা পালিয়ে যাওয়ার সহজ পথ। সব জায়গাতেই তার জন্য অপেক্ষা করছে ওই প্রশ্ন, তুমি কে!
না, শ্যাম জানে না। শ্যাম সত্যিই জানে না।
.
অনেকক্ষণ বাদে তার ফেরানো পিঠে হাত রাখল অরুণ, কী ব্যাপার! বাইরে কেন?
এমনিতেই! শ্যাম ম্লান হাসে।
ভিতরে তোকে খুঁজে না পেয়ে চমকে গিয়েছিলুম। শেষে রিসেপশনের মেয়েটি দেখিয়ে দিল যে, তুই বাইরে দাঁড়িয়ে আছিস। বলে সুন্দর ঠোঁটের কোনায় একটু হাসি সঁতে কামড়ে ধরল অরুণ, দেখলি!
কী?
অরুণ বড় চোখে তাকায়, তোমাকে আমি চিনি না শালা! আমি ইচ্ছে করেই দেরি করছিলুম, ঠিক জানতুম তোর এক্স-রে আই, এ-ফেঁড় ও-ফেঁড় করে দেখে নিবি! তবে এটা তেমন নয়, বুঝলি! মিস দত্ত আরও হট! এ নতুন। বলতে বলতে চিকমিক করে ওঠে অরুণ, আলাপ করবি? আমার সঙ্গে কয়েকদিনের যাতায়াতেই খুব খাতির। নাম— লীলা ভট্টাচার্য। কবি আলাপ?
না। শ্যাম মৃদু হেসে মাথা নাড়েনা।
শ্যাম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল দরজার কাচের পাল্লা দিয়ে রাস্তা থেকেও মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে। মেয়েটির কৌতুহলী চোখ আবার তার চোখে পড়ল। শ্যাম ঘাড় ফিরিয়ে নেয়।
কী হল তোর শ্যাম! জিভ দিয়ে চিকচিক একটা শব্দ করে অরুণ।
কী জানি! হাঁটতে হাঁটতে শ্যাম বলল, কোনওখানে কিছু একটা গোলমাল হয়ে গেছে আমার।
ভ্রূ কুঁচকে অরুণ বলে, কী রকম?
হাইস্কুলে পড়ার সময় মেয়ে দেখলে যেমন হত, অনেকটা সেরকম নার্ভাস বোধ করছিলুম। মেয়েটি জিজ্ঞেস করল আমি কাউকে চাই কি না। অমনি মনে হল ওখানে বসে থেকে আমি অন্যায় করছি, চোরের মতো উঠে এলুম। অথচ এর চেয়েও কত তুখোড় কেওয়ালা জায়গায় আমি অনায়াসে গেছি সেদিনও, কাউন্টারের ওপর ঝুঁকে এরকম মেয়েদের বলেছি ‘হেল্লো’…
জিজ্ঞাসার চোখে শ্যামের দিকে তাকায় অরুণ।
গোলমাল হয়ে গেছে। শ্যাম মাথা নাড়ে, অনেক দিন বাদে আমি টের পেলুম যে, আমি প্রেমে পড়ে যেতে পারি।
লীলার?
না। লীলা বলে নয়। যে-কোনও মেয়ের। আশ্চর্য! এতকাল যখন বৃন্দা মাধবী কিংবা ইতুর সঙ্গে ঘুরেছি, শুয়েছি এক বিছানায়, আগাপাশতলা তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি ভাল লাগার মতো কিছু পাওয়া যায় কি না, তখনও আমার বুকের মধ্যে রেলগাড়ির শব্দ হয়নি কখনও। মনে হয়নি যে, এর মধ্যে কোনও রহস্য আছে আর। মনে হয়, কোনও কিছুই বাকি রাখিনি বলে আমার ঠিক তৃপ্তি কখনও হয়নি। বুকের কাছে কোথাও একটা দুঃখ চাপ বেঁধে আছে।
কী-সব বলছিস রে?
ঠিক বলছি। শ্যাম মাথা নিচু রেখে বলে, কে যেন বলেছিল, ঈশ্বরজ্ঞান না হলে মেয়েদের ঠিকমতো চেনা যায় না! কে বলেছিল বল তো!
কী জানি! ঠোঁট ওলটায় অরুণ, রামকৃষ্ণ-কৃষ্ণ কেউ হবে!
হবে।
একটু চিন্তিতভাবে মৃদু হাসে অরুণ, এক লীলা ভটচাযই তোকে ঈশ্বরজ্ঞান দিয়ে দিল আধ ঘণ্টায়!
না। শ্যাম হাসে, আমি শুধু এটুকু বুঝলুম যে, আমার ভিতরে এখনও এত আশ্চর্য রেলগাড়ির শব্দ আছে, আর আছে অতৃপ্তি। মনে হয় মেয়েরাই আমাকে ঠকিয়েছে সবচেয়ে বেশি। সবকিছু নিয়েও আসল রহস্যটুকু আঁচলে বেঁধে নিয়ে গেছে। কিবা কী জানি, হয়তো সে-রহস্যও আমার সামনে খোলা চিঠির মতো মেলে-ধরা ছিল। আমি ধরতে পারিনি। তাই মেয়েটা যখন প্রশ্ন করল আমি কাউকে চাই কি না তখন হঠাৎ নিজেকে ভিখিরি বলে মনে হল, মনে হল আমার নাম-পরিচয় নেই। আমি এত তুচ্ছ ইনসিগনিফিক্যান্ট যে, আমার জন্ম না-হলেও কোনও ক্ষতিবৃদ্ধি ছিল না। আমি বুঝতে পারছিলুম না, আমি গাছ হয়ে কেন জন্মাইনি, আমি কেন হইনি জলের মাছ?
ধীরে ধীরে দাঁড়িয়ে পড়ল অরুণ, শ্যাম!
কথা বলিস না অরুণ। শ্যাম আস্তে বলল, আমি নিজেকে এতকাল ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট ভেবে এসেছি। আমার সবকিছুই খুব সহজে পাওয়ার কথা–আমি ভেবেছিলুম। শ্যাম মৃদু হেসে মাথা নাড়ে, যা পেয়েছিলুম তা ভুল। আমাকে এতকাল সবাই ঠকিয়ে এসেছে। নইলে কেন আমার বুকের ভিতরে এখনও রেলগাড়ির শব্দ? আমি কেন মাঝে মাঝে দরজা খুঁজে পাই না? গাছের ছায়া খুঁজে পাই না? কোথায় ভুল হচ্ছে? এতকাল তো আমার সব দরজাই ছিল চেনা, সহজে খুলেছি…হঠাৎ ভালবাসার জন্য আবার আমার হাঁটু গেড়ে বসতে ইচ্ছে করছে।
চোখ কপালে তোলে অরুণ, কী ব্যাপার বল তো!
ক্লান্তভাবে হাসে শ্যাম, কিছু না।
ধুস শালা! অরুণ হো হো করে হাসে, হাসতে হাসতে নিজের পেটের দিকে আঙুল দেখায়, সবকিছুর মূলে ওই পেট! বায়ু থেকেই তোর সবকিছু হচ্ছে। রোজ রাতে ইসবগুলের ভূষি খাবি, সকালে উঠে গরমজলে লেবুর রস। আমি যখন ব্যাচেলর ছিলুম তখন আমার পেটের কমপ্লেনই ছিল এগারো রকমের…লীলা ভটচাযকে আমি বলে রাখব যে, তুই সেইন্ট অ্যান্ড মিলারের এক্স-ছোটসাহেব। ভাল খেলোয়াড়— উভয়ার্থে। বলে রাখব যে, তুই দাড়ি না কামিয়ে এভির চাদর গায়ে ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছিস, ভুল করে যেন তোকে ছেড়ে না দেয়।…
