কী অলুক্ষুনে কথা! শাস্ত্রে যা বলা নেই মেয়েটা দেখি তা-ই বলছে! শোভা রানী বিরক্ত হয়। ভগবানের অশেষ কৃপায় তার পেটে সন্তান এসেছে। শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে সেই সন্তান এখন লকলকিয়ে বাড়ছে। তা না হলে বাজা-বিধবার দুর্নাম নিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে হতো। শ্বশুরের ভিটেয় বাতি জ্বালানোরও কেউ থাকত না। পুত্র-সন্তানের জন্য কত দুঃখী নারীর দেবতার শরণাপন্ন হওয়ার কথা শাস্ত্রে বলা আছে! যে নিয়মে সত্যবতী, কুন্তী সতী, শোভা রানীও সেই নিয়মে সতী। অনুরাধার হাতটা পেটের ওপর থেকে আলগোছে সরিয়ে দেয় সে।
কিন্তু অনুরাধার কথায় মরিয়মের ভয় বাড়ে। বহু বছর আগে জসিমুল হক শুধু তার হাত ধরেছিল। তাতেই যদি অপরাধ হয়, এখন তবে কী? দিনের পর দিন তাকে যারা ধর্ষণ করছে, তাদের নাম কী, বাড়ি কোথায়, বংশ কেমন, লেখাপড়া কর, বিবাহিত না অবিবাহিত কিছুই তো সে জানে না। মুখগুলোও প্রত্যেকের একই রকম, আচার-ব্যবহারেও কোনো ফারাক নেই। তাই তারা একশ’, পঞ্চাশ, বিশ–কতগুলো। সংখ্যা। এর মধ্যে কেবল লাল সোফায় বসা সেই আর্মি অফিসারের চেহারা তার মনে আছে, যার নাম ইশতিয়াক। লোকটি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা তাকে বলতে চেয়েছিল, যদিও মাতাল অবস্থায়।
‘মাতাল তো খালি মদ খেয়ে হয় না,’ অনুরাধা বলে, ‘যুদ্ধটাই পুরুষের সবচেয়ে বড় মাতলামি।’
‘তা হতে পারে।’
‘তাইলে ভয় পাইছিলা ক্যান সেইদিন? লোকটার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা উচিত ছিল তোমার। দেখতে–কী বলে?’
‘ওর কথা শুনে আমার লাভ?’
‘তোমার লাভ মানে? লোকটার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নিজের আখের গোছাতে!’
‘তা কি বাস্তবিকই সম্ভব যুদ্ধের দিনে? যে আবার তোমার শত্রু?’
‘শ্যামলীকে তোমার কী মনে হয়?’
‘আমার মনে হয় বিশ্বাসঘাতক।’
‘বিশ্বাসঘাতকতা কার প্রতি?’
‘নিজের দেশের প্রতি।’
‘কোন দেশ? যে দেশ তোমার ওপর শত্রুর নির্যাতনকে নির্যাতন বলে দেখবে না, দেখবে নিজের বেইজ্জতি হিসেবে, তারপর হয় আমাদের লুকিয়ে ফেলবে, না-হয় বেশ্যালয়ের দিকে ঠেলে দেবে–সেই দেশের প্রতি?’
অনুরাধার কথাগুলো মরিয়মের হৃৎপিণ্ডে বঁড়শির মতো গেঁথে যায়। যন্ত্রণায় ছটফট করে সে। জীবন যদি এমন হয়, এর শেষ কোথায়? অনুরাধা তখনো আপন মনে কথা ভাজছে। তারপর বলে, ‘মেরি, তুমি যদি মেজর ইশতিয়াকের সঙ্গে পাকিস্তান যাও, তা বিশ্বাসঘাতকতা হবে না।’
‘কী হবে?’
অনুরাধার জবাব, ‘তা হবে প্রতিশোধ।’
১২. মাঝখানে বিরতি
১৯৭২ সালে যুদ্ধজয়ের পর যখন পাকিস্তানি বন্দিরা ভারতের উদ্দেশ্যে এ ভূখণ্ড ত্যাগ করে, তখন আমি জানতে পারি প্রায় ত্রিশ-চল্লিশজন ধর্ষিতা নারী এ বন্দিদের সঙ্গে দেশ ত্যাগ করছেন। অবিলম্বে আমি ভারতীয় দূতাবাসের সামরিক অফিসার ব্রিগেডিয়ার অশোক ভোরা এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে নিয়োজিত মরহুম নুরুল মোমেন খান যাকে আমরা মিহির নামে জানতাম তাঁদের শরণাপন্ন হই। উভয়েই একান্ত সহানুভূতির মনোভাব নিয়ে এসব মেয়েদের সাক্ষাৎকার নেবার সুযোগ আমাদের করে দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা নওসাবা শরাফী, ড. শরীফা খাতুন ও আমি সেনানিবাসে যাই এবং মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা লাভ করি।
–নীলিমা ইব্রাহিম, আমি বীরাঙ্গনা বলছি
.
‘প্রতিশোধ! কার প্রতি?’ মহিলা সমাজকর্মী একজন তো আকাশ থেকে পড়লেন। অথচ তারা ঘোষণা দিতে দিতে ব্যারাকে ঢুকেছিলেন যে, তোমরা চলে যেয়ো না। আমরা তোমাদের জন্য কিছু করতে এসেছি, আমরা তোমাদের সাহায্য করতে এসেছি। হাত বাড়িয়ে সাহায্য নেওয়ার বদলে সামনের মেয়েটি বারুদের মতো জ্বলে ওঠে, ‘শুনবেন কার ওপর প্রতিশোধ? এই সোনার বাংলার ওপর, এর সোনার টুকরো ছেলেদের ওপর আর…’
‘ব্যস ব্যস তোমাকে আর ব্যাখ্যা করতে হবে না। কী কথা-প্রতিশোধ!’ তিনি দু’কদম পিছিয়ে যান। ওখানে তখন ভয়ানক অরাজকতা। একজনের বাবা এসেছে মেয়েকে নিতে, সে কিছুতেই যাবে না। আরেকজন সমাজকর্মী তাকে আগ বাড়িয়ে বলছেন, ‘বেশ তো বাবার সঙ্গে যেতে না চাও, আমার বাড়ি চলো!’
‘আপনার বাড়ি? কেন?’ এ মেয়েটি আরেক কাঠি সরেস। গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে ওস্তাদ। সে চেঁচিয়ে বলে, আমরা কি চিড়িয়াখানার জন্তু যে, আপনার বাড়ির দরজা খুলে রোজ দর্শনার্থীদের দেখাবেন আর নিজে বাহবা নিবেন?
‘যদি বাহবা নিই তোমার অসুবিধা আছে?’ এবার সমাজকর্মীও রেগে আগুন। ‘পাকিস্তানে গিয়ে তুমি কী করবে? ওখানে তো পতিতালয়ে বিক্রিই হবে?’
‘হলে হব। আপনার অসুবিধা আছে কোনো?’ এ জবাবটা আসে আরেকজনের কাছ থেকে।
‘বাপ রে বাপ, কারা এরা?’ মুক্তির প্রশ্নের জবাবে সেদিনের এক সমাজকর্মী জানান-ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সব ধরনের মেয়েই ছিল ওখানে। তবে পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের ভুল হয়েছিল। কারণ এটাই ছিল আমাদের জীবনের প্রথম যুদ্ধ। মুক্তিকে তিনি আরো বলেন, এখন একা বসে বসে ভাবি, ওখানে গিয়ে হয়তো তারা বিক্রি হয়ে যাবে, তাদের দিয়ে ব্যবসা করানো হবে, এসব জেনেও এখানে থাকার চাইতে পাকিস্তানে চলে যাওয়াটা তারা প্রেফার করেছিল কেন?
সেদিন সংবাদ পেয়ে কারো কারো বাপ-ভাইয়েরা ক্যান্টনমেন্টে ছুটে আসেন। বিশেষত বাবারা। মেয়ের একগুয়েমি দেখে চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বাড়ি ফিরে যান। স্বামীরাও এসেছিল-বউদের নিতে নয়, শাড়ি উপহার দিতে। এটা ছিল তাদের বৈবাহিক ভরণপোষণের শেষকৃত্যানুষ্ঠান।
