মহাভারতের অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্রের পুরো যুদ্ধটা দেখতে হয়েছিল। দেখিয়েছিলেন সঞ্জয়–এক অন্ধ পিতাকে পুত্রদের হত্যাদৃশ্য, কৃষ্ণের কূটচাল, ধর্মপুত্রের মিথ্যাচারণ, বালক অভিমন্যুর চক্রব্যুহে প্রবেশ। সে ছিল আঠারো দিনের যুদ্ধ। দু’পক্ষের উত্থান-পতন আর জয়-পরাজয়ের জটিল কাহিনি। অত বড় হত্যাযজ্ঞের পর যারা জয়ী হয়েছিলেন, তারা রূপকথার রাজা-রানির মতো সুখী হলেন না। গভীর মর্মপীড়া অহর্নিশি খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে তাদের আত্মহত্যার সবচেয়ে প্রলম্বিত পথ মহাপ্রস্থানের দিকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়েছিল। আজকের এই দর্শকদের হিসাবটা শুধু এক রাতের। তাদের পক্ষ একতরফা মারবে। বাকি নয় মাস হিসাব করেনি। তাই তাদের যুদ্ধ দেখার কাজটা হয়ে ওঠে বায়স্কোপ দেখার মতন। নিরুদ্বেগ, ভয়হীন, বিনোদনমূলক। যা নিদ্রাসুখ পরিত্যাগ না করেই দেখা সম্ভব। তা ছাড়া সঞ্জয় যেমন অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে কুরু-পাণ্ডবের যুদ্ধের খবরাখবর দিচ্ছিলেন, এখন এ কাজের জন্য বেতারযন্ত্রটি তো রয়েছেই।
রাত ১১টা ৩০ মিনিটে সেনাদের পদভারে পর্দাটা কেঁপে ওঠে। তারা সেনানিবাস ছেড়ে শহরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে নির্ধারিত সময়ের দেড় ঘণ্টা আগে। তাদের চলার গতিতে আত্মবিশ্বাসটা প্রবল। যেন যুদ্ধ নয়, এপাড়া থেকে ওপাড়ায় পাতানো খেলা খেলতে চলেছে। সামনে শত্রু আছে ঠিকই, তবে নিরস্ত্র। সৈন্যদের সামনে এখন ফার্মগেটের ব্যারিকেড। পর্দাজুড়ে বড় বড় গাছের গুঁড়ি, নষ্ট গাড়ির খোল, পরিত্যক্ত স্টিমরোলার। প্রতিবন্ধকতার ওপাশে মানুষ দেখা যায় না। কিন্তু অগ্রগামী সেনাদের হকচকিত করে স্লোগান ওঠে–জয় বাংলা!
দর্শকরা স্প্রিংয়ের মতো লাফিয়ে ওঠে। তাদের ঘুম ঘুম আমেজ ছুটে যায়। নিজেদের আক্রান্ত হওয়ার কথাই হয়তো ভাবে তখন। কারণ অপারেশন সার্চলাইট শুরু হতে তখনো দেড় ঘণ্টা বাকি। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া তখনো শূন্যে। পাকিস্তানের পাকভূমি স্পর্শ না-করা তক তার নিরাপত্তার দিকটি তাদের খেয়াল রাখতে হবে। কারণ ভারতীয়দের বিশ্বাস নেই। ফকার ছিনতাই, লাহোরে তা ধ্বংস করার প্রতিশোধ তারা নিতেই পারে। তা ছাড়া ঢাকা আক্রমণের সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে প্লেনসুদ্ধ প্রেসিডেন্টকে আকাশ থেকে নামিয়ে ফেলতে পারে ভোকাট্টা ঘুড়ির মতন। হয়তো নামাল না, তোপ মেরে পাঠিয়ে দিল বেহেশতে-এখন শরাব আর হুরি সহযোগে তিনি যার কাছাকাছিই আছেন। দর্শকরা আকাশের দিকে তাকায়ভুলবশত। তারপর পর্দায়। তাদের চোখ পড়ে। ততক্ষণে শ্লোগান নিশানা করে মারণাস্ত্রের মুখ খুলে গেছে। বাতাসে শিস দিচ্ছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। পর্দাটা ঢেকে যায় ধোঁয়ায়। জয় বাংলার কণ্ঠগুলো বুলেটবিদ্ধ হয়। আর স্লোগান শোনা যায় না। সৈন্যরা শহরে ঢোকে। দর্শকরা কফির পেয়ালা হাতে ফের আসন গ্রহণ করে।
পর্দায় তখন রকেট লঞ্চার ছুঁড়ে ৩২ নম্বরের প্রবেশপথের ব্যারিকেড ভাঙা হচ্ছে। অদূরে একটি বিবর্ণ হলদে বাড়ি। পর্দায় যা ধূসর সাদা দেখায়। বাড়িটা গার্ডহীন, অরক্ষিত। সৈন্যরা সেদিকে চলেছে ট্যাংক, ভারী অস্ত্রশস্ত্রের বিশাল লটবহর নিয়ে। রাস্তার প্রতিবন্ধকতা সরানোর পর বাড়ির চার ফুট উঁচু দেয়াল কমান্ডো বাহিনীর গতিরোধ করে। তারা তা অনায়াসে ডিঙিয়ে যায়। স্টেনগান থেকে ব্রাশফায়ার হয়। বুটের দুপদাপ শব্দ বারান্দা অতিক্রম করে সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় ওঠে। পর্দাজুড়ে একটি তালাবন্ধ ঘরের দরজা। ঝুলন্ত ইস্পাতখণ্ডটি বুলেটে বিদীর্ণ হয়। দরজা খুলে যায়। মুজিব বেরিয়ে এসে জানতে চান, ‘তোমরা গুলি ছুড়তাছো ক্যান?’
কমান্ডো আক্রমণের কয়েক মিনিট পর সেকেন্ড ক্যাপিটালের দর্শকরা বেতারযন্ত্রটির কোঁকানো শুনল। তারপর একজনের কাঁপা কাঁপা কণ্ঠস্বর, ‘বড় পাখিটা খাঁচার ভেতর…অন্যগুলো নীড়ে নেই…ওভার।’
ততক্ষণে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল ইয়াহিয়া নিরাপদে করাচি বিমানবন্দরে অবতরণ করেছেন। বেতারযোগে ফরমান আসে, ‘সর্ট দেম আউট।’ বাছাই করো… খতম করো বাঙালিদের।
দর্শকদের সামনের কালো পর্দাটা লোহিতবর্ণ ধারণ করে। লকলকে অগ্নিশিখা লাফিয়ে ছুঁতে চায় আকাশটাকে। বিশাল ধূম্রকুণ্ডলী এর গতিরোধ করে। খানিক আকাশযুদ্ধ চলে ধোঁয়া আর অগ্নির। হঠাৎ আকাশজুড়ে ট্রেসার বুলেটের আতশবাজি-দর্শকরা চমৎকৃত হয়। তাদের আনন্দদানের জন্য তা চলতে থাকে খানিক বিরতি দিয়ে দিয়ে। যেন অগ্নি আর ধূমের একঘেয়ে প্রদর্শনীর মাঝখানে ঝটিকা বিজ্ঞাপন-ঝলমলে, স্মার্ট।
রাত তখন দুটো। কড়কড়িয়ে বেজে ওঠে বেতারযন্ত্রটি। সবাই ছোটে সেদিকে। তবে মাউথ পিসটি মুখের কাছে টেনে নেয় সেই ব্যক্তি, যে এ কাজে দায়িত্বপ্রাপ্ত।
ধৃতরাষ্ট্র কহিলেন ‘হে সঞ্জয়! আমার সৈন্যগণ মহাবল-পরাক্রান্ত লঘু ও আয়তকলেবর, ব্যাধিশূন্য, বর্ম্মসমাচ্ছন্ন, বহু শস্ত্র ও পরিচ্ছদসম্পন্ন, শস্ত্র গ্রহণে সুনিপুণ এবং ন্যায়ানুসারে ব্যূহিত। তাহারা অতিশয় বৃদ্ধও নয়, বালকও নয় এবং কৃশ নয় ও স্কুলও নয়। তাহারা আমাদিগের নিকট সৎকৃত হইয়া আমাদেরই অভিলাষানুসারে সতত কার্য নির্বাহ করিয়া থাকে। তাহারা আরোহণ, অধিরোহণ, প্ৰসরণ, সম্যক প্রহার, প্রবেশ ও নির্গম বিষয়ে সুদক্ষ এবং হস্তী, অশ্ব ও রথচৰ্য্যায় পরীক্ষিত।’
