সোমনাথ বললো, “চেষ্টা চালিয়ে যাও—প্রতিদিন দু ঘণ্টা ধরে ঘ্যান ঘ্যান করে দাদার লাইফ মিজারেবল করো।”
বিছানায় উঠে বসে ভীষণ বল মনে হচ্ছে সোমনাথের। এই বাড়ির সে কেউ নয়। যেন কিছুদিনের অতিথি হয়ে সে যোধপর পার্কে এসেছিল। নির্ধারিত সময়ের পরও অতিথি বিদায় নিচ্ছে না। এই ঘর, এই খাট, এই বিছানা, এই টেবিল, এই ফলকাটা চায়ের কাপ—এসবের কোনো কিছুতেই তার অধিকার নেই। ভদ্রতা করে গহস্বামী এখনও অতিথি আপ্যায়ন করছেন। সবাইকে সন্দেহ করছে সোমনাথ। ভয় হচ্ছে, কমলা বউদিও বোধহয় এবার ক্লান্ত হয়ে পড়বেন।
দরজা খুলে সোমনাথ বাড়ির বাইরের বারান্দায় দাঁড়াতে যাচ্ছিল। এমন সময় রোগা পাকানো চেহারার এক বড়ো ভদ্রলোককে পুরানো অস্টিন গাড়ি থেকে নামতে দেখা গেলো। দ্বৈপায়নবাবর খোঁজ করলেন ভদ্রলোক। বাবার সঙ্গে আলাপের জন্যে ওপরে উঠে যাবার আগে ভদ্রলোক আড়চোখে সোমনাথকে বেশ খুটিয়ে দেখে নিলেন।
ভদ্রলোক গত এক সপ্তাহের মধ্যে দু-তিনবার এলেন। বাবার সঙ্গে অনেকক্ষণ ধরে কীসব কথাবার্তা বলেন।
বুলবুল মেজদার অফিস-টিফিনের জন্যে স্যান্ডউইচ তৈরি করছিল। সোমনাথ জিজ্ঞেস করলো, “লোকটা কে?”
স্যান্ডউইচগুলো অ্যালুমিনিয়াম ফয়েলে মড়তে মড়তে বুলবুল ঠোঁট উল্টোলো। ওর মাথায় যে কোনো দুষ্টমি আছে তা সোমনাথ সন্দেহ করলো।
সোমনাথ বললো, “ঠোঁট উল্টোচ্ছ যে?”
আরও একপ্রস্থ ঠোঁট উল্টে বুলবুল বললো, “বারে! আমার ঠোঁট আমি উল্টোতে পারবো না?”
সোমনাথের এসব ভালো লাগছে না। বুলবুল বললো, “অধৈর্য হচ্ছো কেন? সময় মতো সব জানতে পারবে।”
সোমনাথ যে আরও রেগে উঠবে বুলবুল তা ভাবতে পারেনি। বেশ বিরক্ত হয়ে বলল এবার খবরটা ফাঁস করে দিলো। “অর্ধেক রাজত্ব যাতে পাও তার জন্যে বাবা কথাবার্তা চালাচ্ছেন, সেই সঙ্গে…বুঝতেই পারছো।” এই বলে বুলবুল রাগে গনগন করতে করতে নিজের শোবার ঘরে ঢুকে পড়লো।
রোগা বড়ো ভদ্রলোক আধঘণ্টা পরে বিদায় নিলেন। তারপরেই ওপরে বড় বউমর ডাক পড়লো। মিনিট দশেক পরে বাবার সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা করে কমলা বউদি একতলায় নেমে এলেন। মেজদার সঙ্গে আড়ালে তাঁর কী সব কথাবার্তা হলো। বউদি আবার ওপরে উঠে গেলেন।
সোমনাথ বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে মেজদা ও বুলবুলের দাম্পত্য আলোচনা শুনতে পেলো। বুলবুল ফোঁসফোঁস করতে করতে বলছে, “তুমি কিন্তু এসবের মধ্যে একদম থাকবে না। বাবার যা ইচ্ছে করুন। ছেলে তো আর কচি খোকাটি নেই।”
স্নানের শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে সোমনাথ নিজেকে শান্ত করবার চেষ্টা করছে। অনেকগুলো ১লা আষাঢ়ের সঙ্গে সোমনাথের তো পরিচয় হয়েছে-কিন্তু কোনো ১লা আষাঢ়কেই আজকের মতো নিরর্থক মনে হয়নি সোমনাথের। সোমনাথ এবার ছেলেমানুষী করে ফেললো। জলের ধারার মধ্যে চোখ খুলে হঠাৎ সে জিজ্ঞেস করে বসলো, “আমি কী দোষ করেছি? তোমরা বলো। আমি তো কোনো অপরাধ করিনি-আমি শুধু একটা চাকরি যোগাড় করতে পারিনি।”
কিন্তু এসব প্রশ্ন সোমনাথ কাকে জিজ্ঞেস করছে? সোমনাথ তো এখন নাবালক নেই। এ-ধরনের প্রশ্ন করবার আধিকার তো একমাত্র বাচ্চা ছেলেদের থাকে। এর উত্তর কার কাছ থেকে সে প্রত্যাশা করে? ওপরের বারান্দায় মতদার দল যে-বন্ধটি বসে আছেন, তিনি উত্তর দেবেন? না আকাশের ওধার থেকে কোনো এক ইন্দ্রজালে মা কিছুক্ষণের জন্যে ফিরে এসে সোমনাথের সমস্যা সমাধান করবেন? কেউ তো এসব প্রশ্ন শুনবেও না। উত্তর দেবার দায়িত্ব তাঁর নয় জেনেও, বেচারা কমলা বউদি কেবল সোমনাথের হাত চেপে ধরবেন এবং ওর তপ্ত কপালে ঠাণ্ডা হাত বুলিয়ে দেবেন।
সোমনাথ বাথরুম থেকে বেরোতেই কমলা বউদি খবর দিলেন, “বাবা তোমায় ডাকছেন।”
বাবা ঠিক যেভাবে ইজিচেয়ারের পূর্বদিকে মুখ করে ব্যালকনিতে বসে থাকেন সেইভাবেই বসেছিলেন। কোনোরকম গৌরচন্দ্রিকা না করেই তিনি বললেন, “তোমার নিজের পায়ে দাঁড়াবার একটা সুযোগ এসেছে। নগেনবাব এসেছিলেন—-ভদ্রলোকের অবস্থা ভালো। নিজের একটা সিমেন্টের দোকান আছে, ওঁর ছেলে নেই—তিনটি মেয়ে। তোমাকেই দোকানটা দেবেন—যদি ছোট মেয়ের সঙ্গে সম্বন্ধ হয়।”
বাবার সামনে কথা বলার, বিশেষ করে প্রতিবাদের অভ্যাস, এ-বাড়ির কারার নেই। তবু সোমনাথ বললো, “নিজের পায়ে দাঁড়ানো হলো কই?”
বাবা এবার মুখ তুলে অবাধ্য পত্রের চোখের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, “ওদের ফ্যামিলি ভালো। আমাদের পাটি ঘর। মেয়ের বাঁ-হাতে সামান্য ফিজিক্যাল ডিফেক্ট আছে। দেখতে খারাপ নয়। সলক্ষণা। ক্লাস সেভেন পর্যন্ত পড়েছে। আমি ভেবে দেখলাম তোমার সমস্যা এতেই সমাধান হবে। বউমার কাছে মেয়ের ছবি আছে, তুমি দেখতে পারো।”
কোনো উত্তর না দিয়েই সোমনাথ নেমে এলো। বুলবুল জিজ্ঞেস করলো, “ছবিটা দেখবে?”।
এক বকুনি লাগালো সোমনাথ’। “তোমাকে পাকামো করতে হবে না।”
ছেলের মতিগতি যে সুবিধের নয়, বাবা বোধহয় আন্দাজ করতে পেরেছেন। তাই আবার বড় বউমাকে ডেকে পরামর্শ করলেন।
এই ধরনের প্রস্তাবে দ্বৈপায়ন যে সন্তুষ্ট নন, তা কমলা জানে। প্রথমে বাবার মোটেই ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু কোনোদিকে কোনো আশার আলো না দেখতে পেয়ে নিরপায় দ্বৈপায়ন মনস্থির করেছেন। এদেশে সোমনাথের যে চাকরি হবে না তা অনেক চেষ্টার পর এবার দ্বৈপায়ন বুঝতে পেরেছেন।
বড় বউমা ফিরে এসে সোমনাথকে আড়ালে ডেকে নিয়ে গেলেন। তারপর সস্নেহে দেবরকে বললেন, “রাজী হয়ে যাও ঠাকুরপো-বাবার যখন এতো ইচ্ছে।”
