“এর থেকে অপমানের আমি কিছু ভাবতে পারছি না, বউদি!” সোমনাথের সামনে কমলা ছাড়া অন্য কেউ থাকলে সে এতোক্ষণ রাগে ফেটে পড়তো।
বউদির মুখে একটও উদ্বেগের চিহ্ন নেই। দেবরের পিঠে হাত দিয়ে বললেন, “কিছু, মনে কোরো না ভাই–বাবার ধারণা, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার এইটাই তোমার শেষ সুযোগ।”
মোমনাথ বউদির চোখের দিকে তাকালো না। মুখ ফিরিয়ে নিলো। বউদি বললো, “কে আর জানতে পারছে, কেন তোমার এখানে বিয়ে হচ্ছে। এরপর বাবা যা বলতে বলেছেন, কমলা বউদি তা মখে আনতে পারলেন না। বাবা ইকুম করেছেন, “ওকে জানিয়ে দিও, এরকম সুযোেগ রোজ আসে না। এবং কথার বাধ্য না হলে এরপর এ-বাড়ির কেউ আর তার জন্যে দায়ী থাকবে না।”
এ-কথা না শুনলেও বাবা যে বউদির মাধ্যমে চরমপত্র পাঠিয়েছেন তা সোমনাথ আন্দাজ করতে পারলো। বউদির হাত ধরে সোমনাথ বললো, “তুমি অন্তত আমাকে নিজের কাছে ছোট হতে বোললা না।”
কমলা বউদি বেচারা উভয় সঙ্কটে পড়লেন। পাত্রীর ছবিখানা তাঁর হাতে রয়েছে। বাবার নির্দেশ, সোমের সঙ্গে আজই এসপার-ওসপার করতে হবে।
কমলা বউদি আবার ওপরে ছুটলেন বাবাকে সামলাবার জন্যে। বললেন, “হাজার হোক বিয়ে বলে কথা। দু-একদিন ভেবে দেখুক সোম।”
বাবা সন্তুষ্ট হতে পারলেন না। বললেন, “যেসব পাত্রের চাকরি-বাকরি আছে তাদের মুখে এসব কথা মানায়, বউমা। নগেনবাবর হাতে আরও দুটো সম্বন্ধ ঝলছে। আমাদের ফ্যামিলি সম্বন্ধে এতো শুনেছেন বলেই ওঁর একটু বেশি আগ্রহ।”
বেচারা কমলা বউদি! সংসারের সবাইকে সখে রাখবার জন্যে কীভাবে নিজের আনন্দটুকু নষ্ট করছেন।
খাওয়া-দাওয়া শেষ করে জামা-প্যান্ট পরে, ব্যাগটা নিয়ে তৈরি হয়েছে সোমনাথ। মেজদা অনেক আগেই বেরিয়ে পড়েছেন। কমলা বউদি এবার সোমনাথের ঘরে কে পড়লেন। কী মিষ্টি হাসি কমলা বউদির।
সোমনাথের দিকে তাকিয়ে কমলা বউদি সস্নেহে বললেন, “আমার ওপর রাগ করলে, খোকন?”
সোমনাথ অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিলো। তারপর মনে মনে বললো, “পাপিঠ হলে তো তোমার ওপর রাগ করতে পারবো না, বউদি।”
বউদি এবার ডান হাতটা বাড়িয়ে দিলেন। “আড়ি করতে নেই, ভাব করো—আজ তোমার জন্মদিন। মনে আছে, মা তোমাকে কী বলতেন? জন্মদিনে সবাইকে ভালোবাসতে হয়, কারুর ক্ষতি করতে নেই, নিজে খুউব ভালো হতে হয়, সবার মুখে হাসি ফোটাতে হয়।” সোমনাথ পাথরের মতো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
বউদি এবার আঁচলের আড়াল থেকে একটা ঘড়ির বাক্স বার করলেন। একটা দামী সুইস রিস্টওয়াচ দেবরের হাতে পরিয়ে দিলেন কমলা বউদি। “অমর যখন সুইজারল্যান্ড থেকে এলো তোমার জন্যে আনিয়েছিলাম—জন্মদিনে দেবো বলে কাউকে জানাইনি।” বউদির ছোট ভায়ের নাম অমর।
সোমনাথের চোখে জল আসছে। সে একবার বলতে গেলে, “কেন দিচ্ছো? এসব আমাকে মানায় না। কিন্তু বউদির অসীম স্নেহভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সে কিছুই বলতে পারলো না। সোমনাথের বলতে ইচ্ছে করলো, “আগের জন্মে তুমি আমার কে ছিলে গে?” কিন্তু সোমনাথের গলা দিয়ে স্বর বেরুলো না।
কমলা বউদি বোধহয় অন্তর্যামী। মুহূর্তে সব বুঝে গেলেন। বললেন, “তোমার দেরি হয়ে যাচ্ছে, খোকন।”
২২. যোধপুর পার্ক বাস স্ট্যান্ডের কাছে
যোধপুর পার্ক বাস স্ট্যান্ডের কাছে সোমনাথের সঙ্গে এক ভদ্রলোকের দেখা হয়ে গেলো। ভদ্রলোক নিজেই পরিচয় দিলেন, “সোমনাথ না? তোমার বন্ধ, সুকুমারের বাবা আমি। বদ্ধ পাগল হয়ে গেছে সুকুমার। দিনরাত জেনারেল নলেজের কোশ্চেন বলে যাচ্ছে। বোনদের মাররোর করেছে দু-একদিন। দড়ি দিয়ে হাত-পা বেধে রাখতে হয়েছিল ক’দিন। মাথায় ইলেকট্রিক শক দিতে বলছে—কিন্তু এক-একবারে ষোলো টাকা খরচ।
“লুম্বিনী পার্ক হাসপাতালে কাউকে চেনো নাকি? ওখানে ফ্রি দ্যাখে শুনেছি। সুকুমারের বাবা বীরেনবাব জিজ্ঞেস করলেন। ভদ্রলোক রিটায়ার করেছেন। স্ত্রীর গরতর অসুখ—ওঁর আবার ফিটের রোগ আছে। মেয়েরাই সংসার চালাচ্ছে। মেজ মেয়ে একটা ছোটখাট কাজ পেয়েছে। না হলে কী যে হতো।
“আমি খোঁজ করে দেখবো,” এই বলে সোমনাথ গোলপার্কের দিকে হাঁটতে আরম্ভ করলো। বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়াতে ভালো লাগলো না।
তাহলে পৃথিবীটা ভালোই চলছে। শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির কেন্দ্রমণি অসভ্য এই নগর কলকাতার চলমান জনস্রোতের দিকে তাকিয়ে আছে সোমনাথ। অভিজাত দক্ষিণ কলকাতার নতুন তৈরি উন্নাসিক প্রাসাদগুলো ভোরের সোনালী আলোয় ঝলমল করছে। চাকরি-চাকরি করে একটা নিরপরাধ সুস্থ ছেলে পাগল হয়ে গেলো—এই সসভ্য সমাজতান্ত্রিক সমাজে তার জন্যে কারও মনে কোনো দুঃখ নেই, কোনো চিন্তা নেই, কোনো লজ্জা নেই।
চোখের কোণে বোধহয় জল আসছিল সোমনাথের। নিষ্ঠুরভাবে নিজেকে সংযত করলো সোমনাথ। “আমাকে ক্ষমা কর, সুকুমার। আমি তোর জন্যে চোখের জল পর্যন্ত ফেলতে পারছি না। আমি নিজেকে বাঁচাবার জন্যে প্রাণপণে সাঁতার কাটছি। আমার ভয় হচ্ছে, তোর মতো আমিও বোধহয় ক্রমশ ড়ুবে যাচ্ছি।”
কে বলে সোমনাথের মনোবল নেই? সব মানসিক দুর্বলতাকে সে কেমন নির্মমভাবে মন থেকে সরিয়ে দিয়ে ব্যবসার কথা ভাবছে।
হীরালাল সাহার কাছ থেকে লাভের টাকা আদায় করতে যাওয়ার পথে একটা কাপড়ের দোকান সসামনাথের নজরে পড়লো। জন্মদিনে বউদিকে সে কিছু, দেবে বলে ঠিক করে রেখেছে। ওখান থেকে একটা তাঁতের শাড়ি কিনলো সোমনাথ। হীরালালবাবুর আগেকার দেড়শ’ টাকা পকেটে পকেটেই ঘুরছে। কী ভেবে আর একটা শাড়ি কিনলো সোমনাথ। বুলবুল হয়তো এতো কমদামী শাড়ি পরবেই না। লুকিয়ে বাপের বাড়ির ঝিকে দিয়ে দেবে। কিন্তু বড় বউদির যা স্বভাব, ওঁকে একলা দিলে নেবেনই না।
